সোহেল উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন

আগের সংবাদ

সংখ্যালঘু-আদিবাসী এমপিদের সংবর্ধনা এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

পরের সংবাদ

কুটিরশিল্পীদের পণ্য বিপণনের সুযোগ প্রসঙ্গে

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ৯, ২০১৯ , ৯:২৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০১৯, ৯:২৫ অপরাহ্ণ

মজিবর রহমান

কলাম লেখক।

ঢাকায় দুচার জায়গায় কয়েকদিনের জন্য মেলা অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলোতে গরিষ্ঠ অংশের স্থান সংকুলান হয় না। ভগ্নহৃদয়ে ফিরে যেতে হয় বাড়িতে তাদের। কিছুদিনের মধ্যে পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে কুটিরশিল্পীরা যাতে তাদের পণ্য বিপণনের পর্যাপ্ত সুযোগ পান সেদিকে বিশেষ দৃষ্টিদানের জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান থাকল।

দেখতে দেখতে ১৪২৫ গত হতে চলল, ১৪২৬ সমাগত। বছরের ১ম দিন ১ বৈশাখ আমাদের দেশে এখন বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপিত হয়। তবে শহরে যতটা, ততটা গ্রামে নয়। অথচ অতীতের পরিস্থিতি ছিল ঠিক তার উল্টো; শহরের তুলনায় গ্রাম জমজমাট থাকত এই দিনে বেশি। কাছে-দূরের বিপুল মানুষের অংশগ্রহণে ‘মেলা’ অনুষ্ঠিত হতো, হতো মিষ্টিমিঠাই সহযোগে ‘হালখাতা’র অনুষ্ঠান স্থানে স্থানে।

বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানের একটি উজ্জ্বল দিক হলো এর সর্বজনীনতা। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। দিন দিন এর ব্যাপকতা শহরাঞ্চলে যে পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে মনে হয় অদূর ভবিষ্যতে গ্রামাঞ্চলেও এর ঢেউ আছড়ে পড়বে। গান কবিতা নাটক মেলা শোভাযাত্রার এমন আনন্দঘন পরিবেশ আমাদের জাতীয় জীবনে আর কোথাও দেখা যায় না।

অনুষ্ঠানমালায় ইদানীং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বাঙালি শিল্পীদেরও অংশগ্রহণ চোখে পড়ছে যা একই সঙ্গে প্রীতিকর ও গর্বের। আমাদের ‘একুশে’ ও ‘১ বৈশাখ’-এর জমজমাট আবহ তাদেরও গভীরভাবে আকৃষ্ট করছে এ কথা ভাবতেও ভালো লাগে। গত বছর বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে ভারতীয় শিল্পী, বিশেষত লোকগানের শিল্পীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির পীঠস্থান হবে বাংলাদেশ- পূর্বসূরিদের এ রকম মন্তব্য বোধকরি সত্য হতে চলেছে।

দুই.
পয়লা বৈশাখের আবেদন শুধু অনুষ্ঠান ঘিরে নয়, এর একটা বাণিজ্যিক গুরুত্ব আছে যেটি দিন দিন প্রধান হতে শুরু করেছে। দিবসটিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে সাজপোশাকের যে কেনাবেচা হয় তা এক কথায় বিস্ময়কর। কিছুদিন আগেও কল্পনাতে আনা যেত না এমনটি। কাপড় ও সাজপোশাকের ব্যবসায়ীরা ঈদের মতোই সমান গুরুত্ব দেয়া শুরু করেছেন পয়লা বৈশাখকে। উল্লেখ্য, এ উপলক্ষে বিক্রীত পোশাকাদির অধিকাংশই দেশীয় এবং সাশ্রয়ীমূল্যের; যে কারণে গরিব মানুষও তদের সন্তানদের আবদার মিটাতে পারছেন।

পয়লা বৈশাখকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানাদির একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। প্রায় সর্বত্রই লৌকিক ঐতিহ্যের প্রাধান্য দৃষ্ট। লোকশিল্পী ও লোকজ গান এ দিনে যেমন কদর পায়, তেমনই কদর পায় লৌকিক শিল্প। শোভাযাত্রায়ও তুলে ধরা হয় আবহমান বাংলার ঐতিহ্য। নতুন প্রজন্ম তাতে শেকড়ের সন্ধান পাচ্ছে। কুটিরশিল্পীরা তাদের পণ্য বিপণনের সুযোগ পায় এ দিন এবং পরের কয়েকদিন। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা এ ব্যাপারে সুখকর নয়। বিপণনের সময় সংকুচিত হয়ে আসছে এই ক্ষুদে উদ্যোক্তাদের যা বেদনাদায়ক। সেরকম যাতে এ বছরও না হয় সেজন্যই আগেভাগে এ লেখার অবতারণা।

তিন.
আমাদের কুটিরশিল্প অতীতে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানে থাকলেও বর্তমানে ততটা নয়। একদার ভুবনজয়ী তাঁতশিল্পসহ বিভিন্ন পণ্যাদি এখন কুটিরে উৎপাদিত হয় কমই। পরিচর্যা ও মূলধন সহায়তার অভাবে মুখথুবড়ে পড়ছে একেকটি। বংশানুক্রমে শেখা কাজ বাদ দিয়ে অন্য কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার মতো বল ভরসা অনেক কারিগরেরই নেই, ফলে তারা আঁকড়ে আছে রপ্তকরা কাজটিকেই। কুটিরশিল্প পর্যায়ের যেসব পণ্য এখনো টিকে আছে সেগুলো মূলত বাঁশ-বেত-কাঠ-মাটির তৈরি। আছে স্বল্পপরিসরের তাঁত ও বুননকাজ ইত্যাদি।

কুটিরশিল্পের একটি বিশেষত্ব এই যে পুরুষের পাশাপাশি কুটিরের মহিলারাও সাধারণত উৎপাদন কাজে যুক্ত থাকেন। বাংলা নতুন বর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ তাদের জন্য মৌসুম। দিনরাতের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল কুটিরজাত পণ্য বৈশাখী বিভিন্ন মেলায় তারা বিক্রয় করবেন বলে অপেক্ষায় থাকেন। মাসের ১ম দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ঢল নামে সে দিন অনুষ্ঠানস্থল কিংবা মেলা প্রাঙ্গণে। অথচ সে দিন তারা উৎপাদিত পণ্যাদি বিক্রয় করার সুযোগই ঠিকমতো পান না, দুরদুর করে তাড়িয়ে দেয়া হয় তাদের এ জায়গায় না ও জায়গায় বলে। অন্তত মানবিক কারণে হলেও এর একটা বিহিত হওয়া দরকার।

কয়েক বছর ধরে নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের কড়াকড়ি খুব বেশি। সন্ধ্যা হতে না হতেই অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে হয় মানুষের। কুটিরশিল্পীদেরও একই দশা হয়, নিরুপায় হয়ে ভাসমান দোকান তাদের দ্রুত গোটানো ছাড়া উপায় থাকে না। মৌসুম তাদের জন্য বয়ে নিয়ে আসে আনন্দের বদলে হতাশা ও উৎপাদন জটের বিড়ম্বনা।

ঢাকায় গত বছর খুব ভালোমতো লক্ষ করে দেখেছি এসব কুটিরশিল্পীর বিড়ম্বনার স্বরূপ। সকালে ‘ছায়ানট’-এর বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগে তাদের রমনায় কিংবা পাশের রাস্তায় বসতে দেয়া হয়নি। মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য বসতে পারেননি তারা আর্ট কলেজের সামনের রাস্তায়ও। পদে পদে অপদস্ত হয়েছেন মানুষগুলো আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য দ্বারা।

মালপত্র নিয়ে এদিক-ওদিক লুকিয়ে থেকে বসতে বসতে অনেক বেলা, আবার বিকেল না গড়াতেই সময় শেষ। খেয়াল করে বোঝা গেছে মানুষগুলো ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত, অনেক দূর থেকে এসেছেন হয়তোবা রাতজেগে। আশা তাদের পরিণত হয়েছে নিরাশায়। ঢাকায় দুচার জায়গায় কয়েকদিনের জন্য মেলা অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলোতে গরিষ্ঠ অংশের স্থান সংকুলান হয় না। ভগ্নহৃদয়ে ফিরে যেতে হয় বাড়িতে তাদের।

কিছুদিনের মধ্যে পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে কুটিরশিল্পীরা যাতে তাদের পণ্য বিপণনের পর্যাপ্ত সুযোগ পান সেদিকে বিশেষ দৃষ্টিদানের জন্য সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান থাকল।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।