ফের নির্বাচিত কিরণ

আগের সংবাদ

আফগানিস্তানের প্রাথমিক স্কোয়াড ঘোষণা

পরের সংবাদ

দূষণর দখলের কবলে কীর্তনখোলা

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ৭, ২০১৯ , ৩:১৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০১৯, ৩:১৫ অপরাহ্ণ

Avatar

নদীরতীরে গড়ে ওঠা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, তেল ডিপো, মৎস্য ও কাঁচাবাজারের বর্জ্য এবং পাঁচটি ওষুধ কোম্পানীর তরল বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে কীর্তনখোলা নদীতে গিয়ে পানি দূষিত করে তুললেও বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর রূপাতলীতে কীর্তনখোলা নদীর তীর ঘেঁষে গ্লোবাল ক্যাপসুল লিমিটেডের উৎপাদন কারখানা। ওই কারখানায় বর্জ্য পরিশোধনাগার নেই। প্রতিদিন উৎপাদন হয় ৫০ লাখ পিস হার্ড জিলেটিন ক্যাপসুল ও হার্ডসেল গ্রেড জিলেটিন ১’শ কেজি। উৎপাদনের পর তরল বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে কীর্তনখোলা নদীতে যায়। নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কলেজ রোডে অবস্থিত কেমিস্ট ল্যাবরেটরি লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন হয় ক্যাপসুল, ট্যাবলেট, সিরাপ ও ইনজেকশন। তবে প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নিজস্ব ড্রেন দিয়ে সিটি করপোরেশনের ড্রেনের মাধ্যমে চলে যায় কীর্তনখোলা নদীতে। একইভাবে বগুড়া সড়কের অপসোনিন ফার্মা লিমিটেড, নতুন বাজার সড়কের রেফকো ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড ও ইন্দোবাংলা ফার্মাসিউটিক্যালসের বর্জ্য সিটি করপোরেশনের ড্রেন দিয়ে হরহামায়াশেই চলে যায় কীর্তনখোলায়। ফলে প্রতিদিন দূষিত হচ্ছে কীর্তনখোলার পানি। এছাড়া নদীতীরে গড়ে ওঠা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, তেল ডিপো, মৎস্য ও কাঁচাবাজারের বর্জ্য কীর্তনখোলার পানি দূষিত করে তুলছে। এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

অপরদিকে প্রায় তিন’শতাধিক প্রভাবশালী দখলদারের দখল সন্ত্রাসে বিপন্ন হতে চলেছে কীর্তনখোলা। ইতোমধ্যে নদীর পাড়ের প্রায় ২৮ একর জমি দখল করে নানা স্থাপনা গড়ে তুলেছে দখলদাররা। দখলদারদের উচ্ছেদে বিআইডব্লিউটিএ, জেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬০ সালে বরিশাল নদীবন্দর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কীর্তনখোলা নদীর পানির স্তর থেকে স্থলভাগের দিকে জমির ৫০গজ পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএর আওতায় থাকার কথা। সে অনুযায়ী নৌ-বন্দরের উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৩৭একর জমি বিআইডব্লিউটিএর। তবে ওই জমিতে সীমানা প্রাচীর না থাকায় বিভিন্ন সময়ে ভূমিখেকোরা এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালীরা দখলে নিয়ে গড়ে তুলেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বসতঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

বিআইডব্লিউটিএর নকশাবিদ মোঃ মনিরুজ্জামান জানান, রসুলপুর চরের ৮একরেরও অধিক জমি এবং জেলখাল থেকে এপিবিএন দপ্তর পর্যন্ত কীর্তনখোলা তীরের ২৮একর জমির মধ্যে এক তৃতীয়াংশ বেদখল হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিআইডব্লিউটিএ এবং জেলা প্রশাসনের ভূমি দপ্তর কীর্তনখোলা তীরের পাঁচ শতাধিক অবৈধ দখলদারের তালিকা করেছিলো। তখন দুটি উচ্ছেদ মামলাও করা হয়। পরে অদৃশ্য কারণে ওই উচ্ছেদ মামলার কার্যক্রম আর আলোর মুখ দেখেনি। সর্বশেষ ২০১৪ সালের শেষের দিকে বিআইডব্লিউটিএ ৩০৬ জন অবৈধ দখলদারের তালিকা তৈরি করে। ওই দখলদাররা নদীর তীরে স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে তুলেছে। দখলদারদের মধ্যে অধিকাংশরাই প্রভাবশালী। অভিযোগ রয়েছে, গত এক যুগেও নদীতীরে জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ এবং সিটি করপোরেশন নিজ নিজ জমির সীমানা পুননির্ধারণ না করায় অবৈধ দখলদাররা বহাল তবিয়তে রয়েছে। ওই তিন সংস্থা তাদের নিজস্ব জমি চিহ্নিত না করার ফলে উচ্ছেদ অভিযানে যেতে পারছে না।
বিআইডব্লিউটিএর বরিশাল বন্দর ও পরিবহন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সীমানা চূড়ান্তকরণ বা পুননির্ধারণের আগে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। সীমানা চূড়ান্তকরণ কার্যক্রমের কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিষয়টির সুরাহা করতে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছেন বলে দাবি তার।
বরিশাল নদী-খাল বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিপলু বলেন, কীর্তনখোলার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা অধিকাংশ স্থাপনাই অবৈধ। অবৈধ দখলদারদের কারণেও নদী দূষিত হচ্ছে। কীর্তনখোলা রক্ষায় অবৈধ দখল ও দূষণ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তিনি অভিযোগ করেন, কীর্তনখোলা দখল ও বিভিন্ন কারখানার বর্জে পানি দূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো কার্যক্রমই নেই। যা জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খাইরুল আলম বলেন, বিআইডব্লিউটিএর সাথে জমি নিয়ে করপোরেশনের মামলা চলছে। উভয় প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে নিজ নিজ জমির সীমানা নির্ধারণ করা একান্ত প্রয়োজন। এটা না হওয়ায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশালের সহকারী পরিচালক এইচ এম রাসেদ বলেন, নদীতীরের মালিকানা যে দপ্তরের, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের তেমন কোনো নীতিমালা নেই। তবে নদীর পানি দূষণের ব্যাপারে বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তর যথেষ্ট সতর্ক। তিনি বলেন, নিয়মিত কীর্তনখোলার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পানি সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করা হয়। তাছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান নদীর পানি দূষিত করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
কীর্তনখোলার তীর দখল প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়ার রহমান বলেন, উচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে যাদের জমি তারাই উচ্ছেদ করবেন। সেক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হলে জেলা প্রশাসন সহায়তা করবে। সীমানা পুননির্ধারণের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর কোনো চিঠি তিনি হাতে পাননি বলেও উল্লেখ করেন।