আর্চারদের থাইল্যান্ড মিশন

আগের সংবাদ

মালিতে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত ১৩৪

পরের সংবাদ

কাদেরকে সরতে হলো কেন?

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ২৪, ২০১৯ , ২:১৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: মার্চ ২৪, ২০১৯, ২:১৮ অপরাহ্ণ

Avatar

জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে জি এম কাদেরকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। গত শুক্রবার রাতে এরশাদের এ নির্দেশনার পর ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই গতকাল শনিবার সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকেও ছোট ভাইকে সরিয়ে স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদকে মনোনীত করেছেন সেখানে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এমন নাটকীয় ঘটনায় হতভম্ব ও নিশ্চুপ হয়ে গেছেন শীর্ষ নেতারা।
দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণার সময় বড় ভাই এরশাদের পক্ষে ছিলেন কাদের। সেবার বিএনপিবিহীন সংসদে স্বামী-দেববের বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় নেতা হন রওশন। এরশাদ হন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। পর্দার আড়ালে অবস্থান নেন জি এম কাদের। এরপর ছোট ভাইয়ের ঋণ শোধ করতে দুবছরের মাথায় পার্টিতে কো-চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করে জি এম কাদেরকে সেখানে বসান এরশাদ। সে সময় রওশনপন্থি হিসেবে চিহ্নিত পার্টির একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে ক্ষোভ সামাল দিতে এরশাদ সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করে স্ত্রী রওশনকে ভাইয়ের উপরে স্থান দিতে বাধ্য হন। সেই ঘটনার দুবছরের মাথায় গত ১ জানুয়ারি সরকার গঠনের ঠিক আগে আরেক ইতিহাস সৃষ্টি করেন এরশাদ। জি এম কাদেরকে স্ত্রী রওশন এরশাদের ওপরে স্থান দিয়ে পার্টির উত্তরসুরি হিসেবে সার্বিক দায়িত্ব অর্পণের রাজনৈতিক ‘উইল’ করেন এরশাদ।
জি এম কাদের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের অনীহাসহ নানা কারণে ঝিমিয়ে পড়ে পার্টির নেতাকর্মীরা। জাপা চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়সহ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও হয়ে পড়ে নেতাকর্মীশূন্য। এর মধ্যে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সারা দেশের এমপি প্রার্থীদের নিয়ে মতবিনিময় সভায় হাতে গোনা কয়েকজন প্রার্থীর উপস্থিতি ও তাদের ক্ষোভ নিয়ে পার্টির ভেতরে প্রবল অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। জি এম কাদেরকে অপসারণের মধ্য দিয়ে সেই অসন্তোষেরই বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ঠিক কী কারণে জি এম কাদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সে ব্যাপারে শীর্ষ নেতারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হলেও মধ্যম সারির কয়েকজন নেতা কয়েকটি কারণের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এসব কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে
কাঙ্খিত আসন না পাওয়া : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের কাছ থেকে অর্ধশত আসন পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ অবধি অর্ধেক আসন মিলেছে জাপার ভাগ্যে। সরকারের সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষেত্রে এজন্য জি এম কাদের ও মহাসচিবের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন অনেকে।
নির্বাচনে মনিটরিং না থাকা : সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের সময় কেন্দ্র থেকে সার্বক্ষণিক কোনো মনিটরিং ব্যবস্থা ছিল না। প্রার্থীরা কেন্দ্রের মনিটরিং সেলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারেননি। শীর্ষ নেতা জাপা প্রার্থীদের খোঁজখবরও নেননি। এসব কারণে অনেক কেন্দ্র সংকটে পড়তে হয়েছে প্রার্থীদের। অনেক ক্ষেত্রে ভোটযুদ্ধে তাদের পরাজিত হতেও হয়েছে।
১৭২ প্রার্থীর মধ্যে উপস্থিত ৫৮ : সংসদ নির্বাচনের প্রায় দুমাস পর প্রার্থীদের নিয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি বনানী কার্যালয়ে যে মতবিনিময় সভা করা হয়। লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সারা দেশের ১৭২ জন প্রার্থীকে সভায় আমন্ত্রণ জানালেও হাজির হয়েছিলেন মাত্র ৫৮ জনের মতো। এতে চরম ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ।
সভায় বিশৃঙ্খলা : ওই সভায় জি এম কাদের প্রধান অতিথির আসনে বসলেও তিনি নিজেই সভা পরিচালনা করেন। অনেক নেতার অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষেত্রেও তিনি বাধা হয়ে দাঁড়ান। তাছাড়া সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একটানা মতবিনিময় সভা চললেও দুপুরে কোনো খাবার আয়োজন ছিল না। একপর্যায়ে জি এম কাদের ও মহাসচিবের সঙ্গে প্রার্থীদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। সভায় অংশ নেয়া প্রার্থীরা জানিয়ে দিয়েছিলেন জি এম কাদেরের সঙ্গে তারা আর দল করবেন না।
পার্টিতে দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতা : জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ অসুস্থ হয়ে সিএমএইচ ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পার্টির সার্বিক দায়িত্বে থাকা জি এম কাদের নেতাদের মধ্যে দ্ব›দ্ব ও সমন্বয়হীনতার সংকট দূর করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অনেক তরুণ নেতাকে সিনিয়র নেতাদের টপকে পার্টিতে পদ দিয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রপদের নির্বাচনে জাপা প্রার্থীর পরাজয় নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে। জানতে চাইলে জাপা চেয়ারম্যান উপদেষ্টা রেজাউল ইসলাম ভুঁইয়া ভোরের কাগজকে বলেন, সাংগঠনিক ক্ষমতাবলে পার্টি প্রধান এমন নির্দেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো কিছু বলার নেই।
এর আগে গত বছরের ৩ ডিসেম্বর মনোনয়ন বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগে পার্টির পরীক্ষিত নেতা এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন এরশাদ। তবে পাঁচদিনের মাথায় নাটকীয়ভাবে একধাপ উপরে জাপা চেয়ারম্যানের বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তবে পদোন্নতি পাওয়ার পর থেকেই রহস্যজনক কারণে আড়ালে চলে যান সেই নেতা। এরপর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদে প্রধান বিরোধীদলের মর্যাদা লাভ করে জাপা। আর পার্টির সার্বিক দায়িত্বে থাকা জি এম কাদেরকে করা হয় সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা। তবে গতকাল তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়ার পর আবারো নতুন কোনো নাটকের অপেক্ষা করছেন অনেকেই।