শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয় বাস্তবায়ন করুন

আগের সংবাদ

পরীক্ষা না থাকলে কী হয়?

পরের সংবাদ

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সীমাবদ্ধতা

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৪, ২০১৯ , ৮:৪৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: মার্চ ১৪, ২০১৯, ৮:৪৩ অপরাহ্ণ

Avatar

এস এম নাজের হোসাইন

ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

প্রতিনিয়ত ভোক্তা স্বার্থ লঙ্ঘিত হওয়া, জনগণ প্রতারিত হওয়া ও জনভোগান্তি লাগবে দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়ে আসছিল। তবে ভোক্তা অধিকার বলতে অনেকে দ্রব্য ও খাদ্য ভেজালকে বুঝে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত অধিকার ও সেবাগুলোকে ভোক্তা অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে জাতিসংঘ। সে হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার পাশাপাশি নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইলে আর্থিক লেনদেন, জীবিকা নির্বাহ, নিরাপদ যাতায়াত, মুক্ত মত প্রকাশ, নির্মল পরিবেশ সবকিছুই ভোক্তা অধিকারের আওতাভুক্ত। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ ও ভোক্তাদের ক্ষমতায়নে নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। একই সঙ্গে দেশে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে একটা যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের জন্যও দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিভিন্নভাবে কাজ করে আসছে। ১৯৮৫ সালের ৯ এপ্রিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৩৯তম অধিবেশনে জাতিসংঘ বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকারকে ক্রেতা স্বার্থ সমুন্নত রাখার নির্দেশনা জারি করেন। এই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের ওপরও এই আইন তৈরির দায়িত্ব চলে আসে। পরবর্তী সময় ১৯৯০ সালের জুলাই মাসে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশসমূহের সভার গৃহীত প্রস্তাবের আলোকে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ক্যাবের উদ্যোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। ক্যাব ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ১৯৯৮ সালে এই আইনের প্রথম খসড়া প্রণয়ন এবং পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে। এরপর বহুবার এটার খসড়া পাল্টা খসড়া প্রণয়ন হয়েছে। বিগত বিভিন্ন সরকারের সময় খসড়া আইনটি কয়েকবার মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন হয়েছে এবং মন্ত্রিপরিষদে নীতিগত অনুমোদন হয়েছে পাসের জন্য। কিন্তু এটি আর আলোর মুখ দেখেনি। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ক্যাবের কেন্দ্রীয় ও জেলা কমিটিগুলোর ক্রমাগত চাপের পরিপ্রেক্ষিতে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে ৬ অক্টোবর ২০০৮ আইনটি অধ্যাদেশ আকারে জারি হয় এবং ১৩ অক্টোবর গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই অধ্যাদেশটি কিছু সংযোজন করে গত ১ এপ্রিল ২০০৯ মহান জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। মজার ব্যাপার হলো, এই আইনের বিলের বিপক্ষে সংসদে একটা ভোটও পড়েনি অথচ এই জনগুরুত্বপূর্ণ আইনটাকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নিয়ে যেতে ক্যাবকে ১৮ বছর ধরে রাজপথে বহু আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়েছে।

ক্যাবের দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল আইনটি পুরোপুরি ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ না করলেও এটিকে শুভ সূচনা ধরে ক্যাব এগোতে চায়। বিগত সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রীরা নিজেরাও বর্তমান আইনের কিছু সংশোধনী প্রয়োজন বলে মত দিয়েছিলেন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে যেসব বিষয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে : পণ্যের মোড়ক ইত্যাদি ব্যবহার না করা,মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করা, সেবা মূল্যের তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা, ধার্যকৃত মূল্যের অধিক মূল্যে পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি করা, ভেজাল পণ্য ও ওষুধ বিক্রি করা, নিষিদ্ধ দ্রব্যের মিশ্রণ করা, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাকে প্রতারণা করা, প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ না করা, ওজন ও পরিমাপে কারচুপি করা, নকল পণ্য উৎপাদন করা, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করা বা প্রস্তাব করা, অবহেলা ইত্যাদির মাধ্যমে সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য জীবনহানি ইত্যাদি ঘটানো। যে কোনো ব্যক্তি উপরোক্ত অপরাধগুলোর যে কোনো একটা সংঘটিত করলে এবং এই আইনের অধীনে দোষী প্রমাণ হলে অনধিক পঞ্চাশ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা এবং এক বছর থেকে সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত কারাদ-, অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করার সুযোগ আছে।

এই আইনের সীমাবদ্ধতা : এই আইনের ২নং ধারায় সংজ্ঞার আওতায় যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে তাতে কিছু কিছু সংজ্ঞা পরিষ্কারভাবে ও বিস্তৃত আকারে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘খাদ্য পণ্য’-এর সংজ্ঞা। এ ক্ষেত্রে পিওর ফুড অর্ডিনেন্স ১৯৫৯-এর আওতায় ‘ফুড’-এর সংজ্ঞা অধিক গ্রহণযোগ্য। আবার ভোক্তারা অনেকভাবে ‘মিথ্যা বিজ্ঞাপন’-এর মাধ্যমে প্রতারিত হলেও আইনে ‘মিথ্যা বিজ্ঞাপন’ (misleading advertisement)-এর সংজ্ঞা উল্লেখ করা হয়নি। এই আইনের প্রথম অধ্যায়ের ২২নং ধারায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন ব্যাংক, ফাইন্যান্সিং, ইন্সুরেন্স, মোবাইল ব্যাংকিংসহ অন্যান্য আর্থিক ‘সেবা’-এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া বোডিং, লজিং, বাসা/স্থান ভাড়া, ইন্টারনেট, ডিশ লাইন, বাসা-বাড়ি ব্যবহার্য ইলেক্ট্রনিক ও বৈদ্যুতিক আইটেম, ই-কমার্স, প্রশিক্ষণ/টিউশন/কোচিং, ডাক ও কুরিয়ার সার্ভিস অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যা একজন নাগরিককে ভোক্তা অধিকারে লাভে প্রতিনিয়তই ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

এই আইনের ৬০নং ধারা অনুযায়ী কোনো অভিযোগকারী সরাসরি আদালতে মামলা দায়ের করতে পারতে পারে না। অভিযোগকারীকে মহাপরিচালক কিংবা অধিদপ্তরের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দায়ের করতে হবে যা অভিযোগ দায়ের ক্ষেত্রে একটি প্রধান বাধা।

আইনের ৭১নং ধারা অনুযায়ী ভোক্তা অধিকার কার্যবিরোধী কাজের অভিযোগে অভিযোগকারী প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কোনো মামলা সরাসরি করা যায় না। পৃথিবীর সব দেশে ভোক্তা আইনের পৃথক আদালত ব্যবস্থা আছে। এই আইনের ৬১নং ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিচারার্থ আমলে গ্রহণ না করলে তার কারণ জানানোর বা তদন্ত রিপোর্ট সম্পর্কে অভিযোগকারীকে জানানোর বাধ্যতামূলক কোনো ব্যবস্থা নেই। এই আইনের ৭৩নং অনুযায়ী বেসরকারি খাতে পরিচালিত স্বাস্থ্য পরিষেবা খাতে পরিলক্ষিত ত্রুটি-বিচ্যুতি বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গ্রহণ করতে পারেন না যার ফলে স্বাস্থ্য খাতে পরিলক্ষিত ভোক্তা অধিকার বিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই আইনের অধীনে ছোটখাটো অভিযোগ অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতির অভিযোগ স্থানীয়ভাবে বিকল্প অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা (Alternative Dispute Resolution Mechanism) রাখা হয়নি যাতে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র বা নিরক্ষর ভোক্তারা বিচার পাওয়ার অধিকার অধিকতর সুরক্ষিত হয়। পৌর, উপজেলা, ইউপি চেয়ারম্যান, ক্যাব প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি সমন্বয়ে সালিশি কমিটির মাধ্যমে মীমাংসা করা যেতে পারে।

জনগণ যাতে সহজে অভিযোগগুলো জানাতে পারে সে জন্য জেলা পর্যায়ে নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের আদলে ভোক্তা ট্রাইব্যুনাল গঠন। যেখানে সহজে বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি করা যাবে। জেলা পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, ব্যবসায়ী ও ক্যাব প্রতিনিধি সমন্বয়ে বিচারিক পরিষদ গঠন করা। জাতীয় ভোক্তা কাউন্সিলে ভোক্তাদের প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ানো। ভোক্তা অধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটিতে ভোক্তাদের প্রতিনিধি হিসেবে ক্যাবের অন্তর্ভুক্ত করার বিধানটি কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করা। বাজার অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানার একটি অংশ ক্যাবের মাধ্যমে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক ভোক্তা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার উদ্যোগ নেয়া। বাজারদর ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ প্রশাসন, ভোক্তা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক, জেলা মার্কেটিং অফিসার, ক্যাব প্রতিনিধি, শিল্প বণিক সমিতির প্রতিনিধি ও সাংবাদিক প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি বাজার মনিটরিং কমিটি গঠন করা এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা। জনগণের বহুল প্রত্যাশিত এই আইনটি প্রচলিত আইনের সফল প্রয়োগ ও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংশোধন করে যুগোপযোগী করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার এ বিষয়ে আশু কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এগিয়ে আসবে এ প্রত্যাশা করি।

এস এম নাজের হোসাইন : ভাইস প্রেসিডেন্ট, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা