সংখ্যালঘু সমস্যা: পাকিস্তানি ভূত ঘাড় থেকে নামবে কি!

আগের সংবাদ

কোচিং বাণিজ্য চিহ্নিত করে বন্ধ করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী

পরের সংবাদ

২৮ বছরের প্রতিবন্ধকতা সরে গেছে, এটাই মূল কথা

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১৩, ২০১৯ , ৯:৪১ অপরাহ্ণ | আপডেট: মার্চ ১৩, ২০১৯, ৯:৪১ অপরাহ্ণ

ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ

কলাম লেখক ও শিক্ষাবিদ।

বাংলাদেশের প্রাচীন এই ছাত্র সংগঠনটির কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। তাই এবার নির্বাচনের নিজেদের ত্রুটিগুলো খতিয়ে দেখে আগামী ডাকসু নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবেন। মেয়েদের হলগুলোর এত বিপর্যয় কেন; নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে সংলাপ করুন, আলোচনা করুন, স্টাডি করুন, পরিকল্পনা করুন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিব্যক্তি বুঝার চেষ্টা করুন- তবেই কেটে যাবে আঁধার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন নিয়ে এক মাস ধরে আমি বেশ উদ্বিগ্ন। এ নিয়ে আমি বিভিন্ন পত্রিকায় লিখেছি। কারণ ২৮ বছরের আঁধার কাটবে এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। আমি যখন কবি জসীমউদ্দীন হলের প্রভোস্ট ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপার্চায ছিলাম তখন উপলব্ধি করেছি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ কতখানি গুরুত্বপূর্ণ! ১৯৯৮ সালে তৎকালীন আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী অত্যন্ত জোরালোভাবে চেষ্টা চালিয়েছিলেন ডাকসু নির্বাচনের জন্য।

এ জন্য তাকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল সে সময়। ২২ বছর পর অধ্যাপক আজাদের কথা আজো এ জন্য বলছি, খুব কাছ থেকে তার সংস্কারমূলক কাজগুলো আমি দেখেছি। সমানতালে অংশগ্রহণও করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে করেছিলেন গতিশীল, নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য এক উচ্চতায়। নেতৃত্ব, দক্ষতা, সাহস, জ্ঞান-গরিমা সব কিছুতে তার সমতুল্য এ দেশে মেলা ভার। যাক, অধ্যাপক আজাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবদান নিয়ে আরেক দিন বিস্তর লিখব।

১১ মার্চ সোমবার হয়ে যাওয়া ডাকসু নির্বাচন আমাকে অবাক করেছে। সবার খুব ভয়-ডর ছিল ডাকসু নির্বাচন নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই। তারা এত অল্প সময়ে তফসিল ঘোষণাসহ বেশ কঠিন কিছু কাজ করেছে। ভিসি, প্রো-ভিসি, শিক্ষক, কর্মকতা, কর্মচারী সরার সহযোগিতা, আন্তরিকতার ফসল এবারের সফল ডাকসু নির্বাচন। কিছুটা বিচ্যুতি আছে, তবে তা আলোচনাযোগ্য নয়।

২৮ বছরের প্রতিবন্ধকতা সরে গেছে, এটাই মূল কথা। লিটল পার্লামেন্টের গেট খুলল- নতুন আরেকটি সংস্কৃতি শুরু হলো এবার। কথিত আছে, ডাকসু নির্বাচন হলে লাশের পর লাশ পড়বে, রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে ক্যাম্পাসে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে সে রকম কিছুই দেখতে হয়নি আমাদের। উল্টো দেখেছি, ছাত্রলীগের ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন আলিঙ্গন করলেন নির্বাচিত ভিপি নূরুল হক নূরকে।

সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানালেন। দৃশ্যটি খুবই মনোমুগ্ধকর। টেলিভিশনে এমন দৃশ্য দেখার পর লক্ষ করলাম অনেকে আবেগে আপ্লুত হয়েছেন। কিন্তু শোভনের এই পরাজয় কেন, কাদের কারণে। আরেকটি বিষয় হলো, মেয়েদের হলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়জয়কার। নির্বাচনে বড় ব্যবধান গড়ে দিয়েছে পাঁচটি ছাত্রী হলের ভোট। যদিও ডাকসুতে পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের মধ্যে শুধু ভিপি ও একটি সম্পাদকীয় পদ ছাড়া সব পদেই জয়লাভ করেছে ছাত্রলীগ।

কিন্তু ছাত্রী হলগুলোর মধ্যে রোকেয়া হল ছাড়া অন্য সব হলে জয়লাভ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যারা কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমর্থক বলে পরিচিত। রোকেয়া হলের ওইদিনের ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এর বাইরে ছাত্র হলেও ভিপি ও জিএস পদে জয়লাভ করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। অতীতে ডাকসু নির্বাচনে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে প্রতিযোগিতা হলেও এবারই প্রথম ছাত্রলীগের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের।

এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.০৫ শতাংশ। প্রায় ৪৪ হাজার ভোটারের মধ্যে ২৫ হাজার ৭৫০ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি পদের মধ্যে ২৩টি পদেই বড় জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। শুধু ভিপি পদে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল হক নূর এবং সমাজসেবা সম্পাদক পদে একই সংগঠনের আকতার হোসেন জয়লাভ করেছেন।

এক সময়ের প্রতাপশালী ছাত্র সংগঠন এবং ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেউই এবার জয়ের দেখা পাননি। পত্রিকা পড়ে জানলাম, শুধু কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ছাত্রদলের প্রার্থী কানেতা ইয়া লাম-লাম শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছেন ছাত্রলীগের লিপি আক্তারের সঙ্গে। ডাকসুতে এক সময় আধিপত্য বিস্তারকারী বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেউই কেন্দ্রীয় সংসদে কোনো পদে জয় পাননি। দুটি হল সংসদে তাদের তিনজন প্রার্থী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এর বাইরে এক সময় ডাকসুতে প্রতিনিধিত্ব করা জাসদ ছাত্রলীগও গড়ে তুলতে পারেনি ন্যূনতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যেটা অপ্রত্যাশিত আমার কাছে।

মূলত এবার চমক দেখিয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীরা’। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ‘রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে অরাজনৈতিক’ সংগঠনের লড়াই হিসেবে দেখানো যেতে পারে। ফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ডাকসুর ভিপি পদে ১১ হাজার ৬২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফরম সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী নূরুল হক নূর।

হিসাব মতে, জিএস পদে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী থাকায় ছাত্রলীগবিরোধী ভোটারদের ভোট ভাগাভাগি হয়ে গেছে। ফলে বাড়তি সুবিধা পান ছাত্রলীগের জিএস প্রার্থী গোলাম রাব্বানী। ভিপি ও জিএস পদে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রার্থীদের কেউই পাঁচশোর বেশি ভোট টানতে পারেননি। এজিএস পদে জয়ী হয়েছেন সাদ্দাম হোসেন, পেয়েছেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট।
ছাত্রলীগের বিপরীতে অরাজনৈতিক সংগঠনের শিক্ষার্থীরা। ব্যাপারটি বেশ চিন্তার। কারণ ছাত্রলীগ কি শিক্ষার্থীবান্ধব ছাত্র সংগঠন নয়। এ সময়কার শিক্ষার্থীরা কি রাজনীতি থেকে বিমুখ। ছাত্র ইউনিয়ন, ফেডারেশন, মৈত্রী কিছুটা ক্যাম্পাসে সরব।

ছাত্রদলের প্রসঙ্গ টানছি না এখানে। কারণ তাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান নয়। এককভাবে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দাবি-দাওয়া এগুলো নিয়ে কি ছাত্রলীগের কোনো মাথাব্যথা ছিল না কখনো! অথচ যে কোনো অনুষ্ঠানে মিছিলে দেখি হাজার হাজার ছাত্রলীগ কর্মী। কেন দুটি পদ ছাড়তে হলো। কেন চারটি ছাত্রী হলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা? বিষয়টি ভাবতে হবে সংশ্লিষ্টদের।

আমার মনে হয়, গত ১০ বছরে ছাত্রলীগের ক্ষতিটা হয়েছে বেশি। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নৌকা মার্কা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। এর পর ছাত্রলীগের যে কমিটিগুলো হয়েছে তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে যেতে পারেনি, বুঝতে চায়নি তাদের অভিযোগগুলো। এ জন্য টানতেও পারেনি শিক্ষার্থীদের। পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম, ছাত্রলীগ নেতা ও তাদের অর্থ-বৈভবের পরিমাণ সম্পর্কে। এতে কেউ হন বিস্মিত আর কেউ হতাশ।

বাংলাদেশের প্রাচীন এই ছাত্র সংগঠনটির কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা অনেক। তাই এবার নির্বাচনের নিজেদের ত্রুটিগুলো খতিয়ে দেখে আগামী ডাকসু নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবেন। মেয়েদের হলগুলোর এত বিপর্যয় কেন; নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে সংলাপ করুন, আলোচনা করুন, স্টাডি করুন, পরিকল্পনা করুন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিব্যক্তি বুঝার চেষ্টা করুন- তবেই কেটে যাবে আঁধার।

ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ :কলাম লেখক ও শিক্ষাবিদ।