ডাকসু নির্বাচন সর্বাঙ্গীণ সুষ্ঠু হয়নি: আট শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ

আগের সংবাদ

ঢাকায় থাকা, থাকার ঢাকা

পরের সংবাদ

সরকারি কাজে অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

প্রকাশিত হয়েছে: মার্চ ১১, ২০১৯ , ৯:২৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: মার্চ ১১, ২০১৯, ৯:২৪ অপরাহ্ণ

মজিবর রহমান

কলাম লেখক।

জল ও রেলপথের সম্প্রসারণ হলে যাতায়াত ও পরিবহন খরচ কমবে। তাতে জনগণ যে কী পরিমাণ লাভবান হবে সে কথা নিশ্চয়ই আর বলে বোঝাতে হবে না কাউকে। দ্বিতীয়ত, স্থলপথের বড় ধরনের সম্প্রসারণে ক্রমহ্রাসমান ফসলি জমির পরিমাণের আরো সংকোচন ঘটবে। অপরদিকে জলপথ ও রেলপথের সম্প্রসারণে নতুন করে জমির দরকার হবে না। জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের জমি খুবই কম এ কথা কখনো ভুললে চলবে না।

নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেগুলোর বাস্তবায়ন বিষয়ে একটি অগ্রাধিকার-দর্শন নিশ্চয়ই তাদের আছে। বাস্তবতার নিরিখে পরিকল্পনার রদবদল হবে সেটি স্বাভাবিক। চলমান বাস্তবতায় সেই অগ্রাধিকার কেমন হওয়া উচিত?

এক.

একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে সরকার হাত দিয়েছে, সেটি হলো : ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দুই তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী-পাড় দখলমুক্ত করারও অভিযান চলমান। বিষয়টি আশাপ্রদ। কিন্তু মানুষ এ নিয়ে যে খুব আশ্বস্ত এমন বলা যাবে না। সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট বাস্তব ভিত্তি আছে। অতীতে বহুবার এ রকম কাজে হাত দেয়া হয়েছে, কিন্তু টেকসই হয়নি। কিছুদিন যেতে না যেতেই পরিস্থিতি পূর্ববত দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

এবার মানুষ টেকসই অবস্থা দেখতে চায়। সে লক্ষ্যে কী করতে হবে তা সবারই জানা। সরকারেরও জানা আছে। গণমাধ্যম, বিশেষজ্ঞ মহল, সাধারণ মানুষ, এমনকি সরকারের মুখপাত্ররাও এ নিয়ে এক সুরে কথা বলছেন; যার সারকথা হচ্ছে নদীর সীমানা ঠিকমতো চিহ্নিত করে সংরক্ষণের পাকাপাকি ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদীন পার্ককে ‘মডেল’ হিসেবে বেছে নেয়া যায়। সেখানে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরকে পাকাপাকিভাবে কংক্রিট-মুড়িয়ে ওয়াকওয়ে ও ছোটখাটো স্থাপনা গড়ে তোলার পর বৃক্ষরাজির বাগান করা হয়েছে। এতে স্থানটি চমৎকার বিনোদন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যাচ্ছে, হাঁটাহাঁটি সম্ভব হচ্ছে তীরজুড়ে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অনুষ্ঠান করতে পারছে প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে। আরেকটি ব্যতিক্রমী কাজ পার্কটিতে করা হয়েছে, সেটি হলো পাঠাগার স্থাপন। এ রকম দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজের জন্য এই সুযোগে ধন্যবাদ জানাই মেয়রসহ স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে।

প্রস্তাবিত ময়মনসিংহ মডেল অনুসরণ করেই হোক, অথবা হোক অন্য কোনো পন্থায়- উদ্ধারকৃত ভূমি পুনরায় বেদখলের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। ঢাকায় উদ্ধারকৃত স্থানের একাংশে খনন কাজ শুরু করে নাব্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেটি আরো ভালো। জলপথের দিকে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে; তবে তারপরও সেখানকার তীর নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সুযোগ সন্ধানীরা ওঁৎ পেতে থাকবে, আগের মতোই পুনরায় সুযোগ ঘটবে ভাববে।

দুই.

সরকারের উচ্চপর্যায় সূত্রে জানান দেয়া হচ্ছে যে তারা এবার রেল ও জলপথকে গুরুত্ব দিতে চান। এর সর্বাধিক প্রয়োজনীয়তার কথা অন্য অনেকের মতো আমি নিজেও বহুবার বহু লেখায় বলেছি। ফলোদয় হয়নি। এবার শুনে আশ্চর্য হলাম। সত্যি কথা বলতে কি- অতীতে অনেকবার এসব নিষ্ফল আশার কথা শুনতে শুনতে এখন আর সত্য ভাষণও বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না। অনেকেই বলে থাকেন, কোটারি স্বার্থে জল ও রেলপথকে পঙ্গু বানিয়ে শুধু স্থলপথে টাকা ঢালা হয়েছে। এর সত্যতা থাকতে পারে। সে বিতর্কে না জড়িয়ে স্থলপথের প্রয়োজনীয়তাকে অনস্বীকার্য মেনে বলতে চাই- জল ও রেলপথের প্রয়োজনীয়তাও কোনো অংশে কম নয়; বরং বেশি। কেন?

উত্তরটি মনে হয় সবার জানা। প্রথমত, জল ও রেলপথের সম্প্রসারণ হলে যাতায়াত ও পরিবহন খরচ কমবে। তাতে জনগণÑ যে কী পরিমাণ লাভবান হবে সে কথা নিশ্চয়ই আর বলে বোঝাতে হবে না কাউকে। দ্বিতীয়ত, স্থলপথের বড় ধরনের সম্প্রসারণে ক্রমহ্রাসমান ফসলি জমির পরিমাণের আরো সংকোচন ঘটবে। অপরদিকে জলপথ ও রেলপথের সম্প্রসারণে নতুন করে জমির দরকার হবে না। জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের জমি খুবই কম এ কথা কখনো ভুললে চলবে না।

আরেকটি কথা প্রসঙ্গক্রমে না- বললেই নয়, সেটি মৎস্য চাষ ও ইটভাটার কথা। আমাদের ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে এতে। মৎস্য উৎপাদনে আমরা বিশ্বে তৃতীয় স্থানে আছি- এ নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। এর উৎপাদন বাড়ছে মূলত ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ মৎস্য খামার প্রতিষ্ঠার সুবাদে। তার জন্য মূল্যও দিতে হচ্ছে চড়া ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতির কারণে। মাছে-ভাতে বাঙালির এই দেশে মাছের উৎপাদন বাড়ুক সেটি সবাই চায়। তেমনটি হোক নদী-নালা, খাল-বিল ও হাওরের মাছ দিয়ে অতীতের মতো, অর্থাৎ প্রাকৃতিক উৎসে মাছের উৎপাদন বাড়ুক এবং সেখান থেকে মৎস্য আহরণের মাধ্যমে প্রয়োজন মিটুক এটিই বাঞ্ছিত। সে ক্ষেত্রে মৎস্য খামারের প্রয়োজনীয়তা হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে ফসলি জমির করালগ্রাস কমবে। নদীগুলো রক্ষা করা গেলে সমস্যার সুরাহা হবে অনেকখানি। জমি ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনে প্রচলিত ইটভাটা নিয়ে ভাবনারও সময় হয়েছে, ইটের বিকল্প নিয়ে গবেষণা এখন সময়ের দাবি।

তিন.

সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য বর্তমানে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। বিগত বছরে সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে সংঘটিত ছাত্রসমাজের আন্দোলন বিষয়টিকে আরো সামনে নিয়ে আসে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আছে দশ বছর হলো। স্বীকার করতে হবে, এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পরও তারা এ ক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। এবার বিফলতার জায়গা নেই। বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থার কারণে হতাহতের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। যানজটে আটকা থাকছে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পরিণতিতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বিরক্তি বাড়ছে, কর্মোদ্যম কমছে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মেগা প্রকল্পের মতো হাজার হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে না, দরকার হবে কেবল সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নে দৃঢ়তা প্রদর্শন।

গণমাধ্যমে দেখি, সড়কের এই নৈরাজ্য নিয়ে ভাবার বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের অনেক লোক আছেন দেশে। সবাইকে নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে সরকারের সীমিত সাধ্যের মধ্যেই সমাধান পাওয়া যাবে আশা করা যায়।

চার.

পুরান ঢাকার সুখ-দুঃখ- শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম প্রায় উনিশ বছর আগে। ২৭.০৩.২০০০ তারিখে সেটি এই ‘ভোরের কাগজ’-এ ছাপা হয়েছিল। লেখাটিতে পুরান ঢাকার ভিন্ন ধাঁচের সমস্যাদি তুলে ধরে তার প্রতিকার চেয়েছিলাম। কারো মনোযোগ পায়নি সেটি। চকবাজারের চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দৃষ্টি ফিরে পেয়েছে অবহেলিত সেই জনপদ। মেয়রসহ গোটা প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছেন, আগুনের উৎস কেমিক্যাল ব্যবসা অপসারণে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছেন। এর প্রয়োজন স্বীকার করে নিয়ে বলি, যে কোনো সময় বিপদ ঘটতে পারে এ রকম আরো অনেক কারণ বিদ্যমান সেখানে। পূর্বোক্ত নিবন্ধের পুনোরোক্তি বেশি না করে শুধু একটির কথা বলি। তাঁতীবাজার, শাঁখারীপট্টিসমেত আদি-পুরান ঢাকায় এমন সব দালানকোঠা আছে যেগুলো যে কোনো সময় ধসে পড়ে আরো বড় প্রাণহানির কারণ হতে পারে। সেখানে এক দালানে অনেক বসতি, জায়গা এত কম যে বসতকারীদের সবার ওখানে আলাদা করে বাড়ি করার সুযোগ নেই। সরকারি হস্তক্ষেপে অনেক বাড়ি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ দ্বারা তাদের স্থান সংকুলানের ব্যবস্থা করা যায়। কাজটি কঠিন, কিন্তু এ ছাড়া বিকল্পও দেখছি না।

পাঁচ.

‘মেগা’ প্রকল্পে মেগা অর্থের প্রয়োজন হয়, তার প্রয়োজনও স্বীকার করি। সেই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিই, মেগার খণ্ডাশ ব্যয় করে জনতুষ্টিমূলক বহু প্রকল্প ও কাজ সম্পাদন করা যায়। সেদিকে নজর দেয়া বুদ্ধিমানের পরিচায়ক হবে। তবে মানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে- যে কথা বলছেন কোনো কোনো মন্ত্রী। পুকুরচুরি না হলে যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে তা দিয়ে অতিরিক্ত অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।