সচিবালয়ে দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবে বিএনপির নেতারা

আগের সংবাদ

শর্তের বেড়াজালে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণ

পরের সংবাদ

আমার জীবন কোনো দেশেই আটকে নেই : মৌসুমি ভৌমিক

প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০১৯ , ১২:৪৫ অপরাহ্ণ আপডেট: মার্চ ৫, ২০১৯ , ১২:৪৬ অপরাহ্ণ

মৌসুমি ভৌমিক! সেই যশোর রোড, সেই ফুটপাতের মেয়ে। আমার মুগ্ধতার নাম। দূর থেকে যাকে এতোদিন ভালোবেসে গেছি। তার কণ্ঠস্বর শুনতে ছুটছি! সকালে দীর্ঘ যানজট ঠেলে তার কাছে পৌঁছলাম। ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা আর ভালোবাসার ধুকধুকানি। ধানমন্ডির ৭/এ জ্ঞান তাপস আবদুর রাজ্জাক স্মৃতি বিদ্যাপীঠ। তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখি তিনি আর শিল্পী দিলারা বেগম জলি তৃতীয় তলায় বসে মগ্ন হয়ে সিনেমা দেখছেন। পাশে বসলাম; জলি আপাকে বললাম, ভোরের কাগজের পক্ষ থেকে মৌসুমি ভৌমিকের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছি। শুনেই তিনি আমার সঙ্গে বেরিয়ে আসলেন। আলাপ পরিচয়ের পর বললেন, চলুন সিঁড়িতে বসেই কথা বলি। যার গান শুনে শুনে ঘুমিয়েছি! তিনি আমার পাশে বসে আছেন! মৌসুমি ভৌমিক। একের ভেতর অনেক! শিল্পী, সংগীত পরিচালক, গবেষক!
তার জন্ম ভারতের জলপাইগুঁড়িতে। তবে বেড়ে ওঠা উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে। বাবা ও মায়ের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল বাংলাদেশের পাবনা আর বরিশালে। দেশভাগের আগেই তাদের পরিবার চাকরিসূত্র ভারতে স্থিত হয়। মৌসুমি ভৌমিক ২০০২ সালে ‘পারাপার’ নামে একটি গানের দল গঠন করেন। কলকাতা ও লন্ডনের সদস্য নিয়ে এটি গঠিত হয়েছিল। ভারতীয় এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতে এক যথার্থ মেলবন্ধন তৈরি করাতেই এ গানের দলের সৃষ্টি। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনাও করেছিলেন তিনি। সিনেমাটি ২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে সমালোচক পুরস্কার এবং ২০০৩ সালে করাচির কারা চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা সঙ্গীতের জন্য পুরস্কৃত হয়। এ ছাড়াও তিনি বাংলা লোকগান সংগ্রহ এবং এ নিয়ে গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
আপনি তো আমাদেরই, আপনার বাবা-মা তো পাবনা বরিশালের
আমি কোনো পূর্বপুরুষের জন্য এখানকার নই। আমি আমার জন্য এখানকার। আমার জীবন কোনো দেশেই আটকে নেই। আমিই এই
জীবনটা তৈরি করেছি, হাতে করেই। উত্তরাধিকার সূত্রে পাইনি। এটা আমার কষ্টার্জিত জীবন। আমি ভালোবেসে বিশ্বাস করে রাজনৈতিকভাবে একটা বর্ডারকে অতিক্রম করে এক ধরনের জীবনযাপন করছি। আমি মনে করি এটাই একমাত্র পথ বাঁচার। এটাই আমার জীবন।
এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আপনার পরিবারের কেউ গানের সঙ্গে জড়িত নেই। তাহলে আপনার সুরের প্রেরণা কি? জবাবে কিংবদন্তি এই শিল্পী বললেন, আমাদের বাড়ির মানুষ কেউ ওভাবে হয়ত গান করত না। সুরের একটা আবহাওয়া তো ছিলই। আমার বাবা চমৎকার লিখতেন। মাও খুব সুন্দর লেখেন। দিদি তো ম্যাথম্যাটিশিয়ান। খুব ক্রিয়েটিভ একজন মানুষ। তিনি বহু ভাষা জানেন। আমাদের বাড়ি এবং এর আশপাশের পরিবেশ বেশ ভালো ছিল। ঠিক আলাদাভাবে কোনো প্রেরণা নয়, আমি ছোটবেলা থেকেই গান গাইতে পারতাম। তাই প্রকৃতিগতভাবেই গান গেয়েছি। আমার মা-বাবা তাদের সাধ্যমতো উৎসাহ দিয়েছেন। প্রচুর কষ্ট করতেন। যেমন সেসময় আমরা শিলংয়ের মতো ছোট্ট শহরে থাকতাম। আমাদের লেখাপড়ার জন্য, গান-বাজনার জন্য বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন ছেলেমেয়েদের জন্য বাবা মায়ের খুবই আগ্রহ থাকে, তারা ভালো কিছু করবে। অ্যাম্বিশানও হয়ত কাজ করেছে নিশ্চয়ই। সেই অ্যাম্বিশানের জায়গা থেকে আমি সেরকম কিছু করতে পারিনি। যেটা আমার মা-বার ইচ্ছে ছিল। বাবা তো দেখতেও পেলেন না। অনেক আগেই চলে গেছেন। কিন্তু ওদের আগ্রহ এবং ইচ্ছা অবশ্যই বড়। কিন্তু আমি যে স্কুলে পড়তাম গানটা ইজ পার্ট অব এভরি ডে লাইফ। আমি ইংরেজি মাধ্যমে পড়তাম। সেখানে আমরা প্রতিদিন মার্চ করে অ্যাসেম্বলি হলে যেতাম। যেখানে প্রতিদিন সকাল বেলা পিয়ানো, সুগট বাজত। আমাদের অজান্তেই গানের সুর কানে ঢুকে গেছে। এ ছাড়া আমাদের স্কুলে বছরের শেষে কনসার্ট হতো। সেখানে আমরা ইংরেজি গান গাইতাম। মৌসুমি বলেন, সেসময় আমার বন্ধুরা গিটার বাজিয়ে গান গাইত। বিটলস, কার্পেন্টার্স, বব ডিলান এদের গান আমি ছোটবেলা থেকেই শুনেছি। তাছাড়া আমার প্রথাগত যে শিক্ষা মাস্টার মশাইদের কাছে রবি ঠাকুর, অতুল প্রসাদ, ডি এল রায় ছাড়াও খানিকটা ক্ল্যাসিক্যাল, সেমি ক্ল্যাসিক্যাল যা যা শেখাতেন সব রকমের গানই শিখেছি। এ ছাড়া আমাদের শহরে প্রতিবছর একটা গুরুত্বপূর্ণ কম্পিটিশন হতো। সে কম্পিটিশনটাই ছিল একটা সম্মিলন। আমার ধারণা, আমার সংগীত শিক্ষার পেছনে এর একটা বড় ভ‚মিকা আছে। আমার বাবা অডিটে যেতেন। বাড়িতে আসার সময় প্রত্যেকবার আমার জন্য রেকর্ড প্লেয়ার নিয়ে আসতেন। আর আমি সে রেকর্ড শুনে পরের দিন বেশ কয়েকটা গানই গাইতে পারতাম।
গান আর পড়াশোনা কিভাবে সম্ভব? এর জবাবে মৌসুমি বলেন, দুটো বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয়। পড়াশোনা আর গান তো কোনো আলাদা ব্যাপার নয়। গানই তো একধরনের শিক্ষা।
আপনি তো উপমহাদেশের লোকগানের সঙ্গে পশ্চিমা গানের মেলবন্ধনের চেষ্টা করছেন। গানের দলও গড়ে তুলেছেন, কাজটা কঠিন কি না? কত দূর সফল হতে পেরেছেন?
মৌসুমি ভৌমিকের উত্তর, আমি ঠিক মেলবন্ধন ঘটানোর কাজ করছি না। আমি লোকগানের মানুষ না। মূলত কাজ করছি, আমার গবেষণার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০০৩ সালের শেষদিকে। শুরুর ভাবনাটা ছিল বিচ্ছেদের গান নিয়ে। বিচ্ছেদের কিছু কিছু গলা ছিল, কিছু কিছু গান ছিল, যেগুলো আমাকে সাংঘাতিক টেনেছিল। আমি যে গান জানি তাই আসলে শেয়ার করা চেষ্টা করছি।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলা লোকগান সংগ্রহের পাশপাশি গবেষণা করছেন, টার্গেটটা কি? অর্থাৎ পেছনের কারণ জানতে চাই-
মৌসুমি আমার কোনো টার্গেট নেই। আমি কোনো টার্গেট নিয়ে কাজই করি না। ভালোলাগা থেকেই করি। আমি মূলত বিরহ নিয়ে কাজ করছি। সেই বিরহে দেশ, দেশভাগ, অস্তিত্ব, ভূখণ্ড এসবই আমার কাছে বড় বিষয়। সেটা সুকান্ত মজুমদার এবং আমি করছি।
লোকগান দুই বাংলাতেই জনপ্রিয়, কিন্তু এপাড়ের গান ওপাড়ে গেলেই পাল্টে যায়, আমাদের লোকগানের সুর ও গায়কী সম্পর্কে আপনার কোনো পর্যবেক্ষণ আছে কি? মৌসুমি ভৌমিক বলেন, একটা গান একটা জায়গা থেকে আরেকটা জায়গায় গেলে পাল্টে যায়। সেটা আমাকে ভাবায়ও না। এ নিয়ে আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্তও নই।
এখন মার্চ মাস। এ মাসেই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড কবিতাটি আপনার কণ্ঠে গান হয়ে আমাদের মুগ্ধ করে। গানটির সুর কি আপনিই করেছিলেন? এ নিয়ে উল্লেখ করার মতো কোনো স্মৃতি আছে কি? জবাবে অনন্য মৌসুমি বললেন, এ সম্পর্কে আমি অনেকবার অনেক জায়গায় বলেছি। এটা তারেক মাসুদের মুক্তির কথা সিনেমায় ব্যবহার হয়। গিন্সবার্গের কবিতাটি দিয়ে তারেকই আমাকে বলেছিল তুমি একটা গান তৈরি করো। অনুবাদ নয় এটি। তার আধারে তৈরি করা একটি গান। ১৯৯৯ সালে গানটি তৈরি হয়। বিশ বছর হয়ে গেল। গানটির সঙ্গে ানেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমি এ নিয়ে কি বলবো! বলা কঠিন। গানটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে, শুধু এটুকুুই বলতে পারি। আর কিছু বলতে পারছি না।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়