বিমান ছিনতাইকারী নায়িকা সিমলার স্বামী!

আগের সংবাদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে অপহরণ মামলায় দুইজনের যাবজ্জীবন

পরের সংবাদ

ভাষা আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯ , ৪:৪৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯, ৫:০২ অপরাহ্ণ

Avatar

দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি ছিল নারীদের অংশগ্রহণ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে ঢাকা তখন উত্তাল। আন্দোলনের সব কর্মকাণ্ডই ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ‘১৪৪ ধারা’ ভেঙ্গে যে মিছিলটি বের হয় সেই মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন নারীরা। ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। তাতেও অংশ নেন নারীরা। সেদিনের আন্দোলনে তাদের সাহসী ভূমিকা গোটা দেশকে আলোড়িত করেছিল। তেমনি সাহসী নারীদের কথা জানাতেই অন্যপক্ষের আজকের আয়োজন।

 

‘১৪৪ ধারা’ ভাঙেন যে নারীরা

ভাষা আন্দোলন থেকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে বায়ান্নের ২০ ফেব্রুয়ারি হরতাল আহ্বান করা হলে সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে এবং পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সেদিন ১৪৪ ধারা জারি করে। এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্তে ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করে। কৌশল হিসেবে মিছিলের প্রথম সারিতে মেয়েদের থাকতে বলা হয়। সেদিন পুলিশের লাঠিতে আহতও হয়েছিলেন অনেক ছাত্রী। এদের মধ্যে রওশন আরা বাচ্চু, ড. সুফিয়া আহমদ, ড. হালিমা খাতুন, সারা তৈফুর, শামসুন নাহার আহসান, ড. শরীফা খাতুন প্রমুখ অন্যতম।
১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের ছাত্রী ছিলেন রওশন আরা বাচ্চু ও ড. সুফিয়া আহমদ। রওশন আরা বাচ্চু দর্শন বিভাগ আর সুফিয়া আহমদ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের পড়তেন। বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলার সমাবেশ থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত হলে মেয়েদের যে দলটি প্রথম বের হয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে তারা দুজন সে দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আহূত ছাত্রজনতার সমাবেশে ছাত্রীদের সংগঠিত করে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশস্থলটির বাইরে পুলিশ লাঠি দিয়ে ব্যারিকেড দিয়েছিল। অনেকে লাঠির ওপর দিয়ে লাফিয়ে এবং নিচ দিয়ে বের হয়ে গেলেও তারা তা করেননি। আরো কয়েকজন ছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তারা পুলিশের লাঠির ব্যারিকেডটি ভেঙে ফেলেন। এবং দলের অন্যদের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। ব্যারিকেড ভাঙার দৃশ্য দেখা মাত্রই পুলিশ এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ শুরু করে দেয়। লাঠির আঘাতে তারা আহত হন। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়তে থাকে। পুরো এলাকা তখন রণক্ষেত্র। বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পার্শ্ববর্তী এলাকায় পুলিশের মুহুর্মুহু গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সলিমুল্লাহ হলের তৎকালীন প্রভোস্ট ড. গনির পার্শ্ববর্তী বাড়িটিতে আশ্রয় নেন তারা।
রওশন আর বাচ্চা বলেন, কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে প্রভোস্টের বাড়িটির যাওয়ার সময় কাঁটাতারে আমার শাড়ির আঁচল আটকে গিয়েছিল। এ সময় একজনের সাহায়তায় কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে ড. গনির বাসায় আশ্রয় নেই।
ড. হালিমা খাতুন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী। একুশের সকালে তার দায়িত্ব ছিল পিকেটিং করা। তিনি পিকেটিংয়ের আগে মুসলিম গার্লস স্কুল ও বাংলা বাজার গার্লস স্কুলের মেয়েদের আমতলার সমাবেশে নিয়ে আসেন। মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজের ছাত্রীদেরও সমাবেশে সমবেত করার ব্যাপারেও তার ভ‚মিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। একুশের আগের রাতে ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি গোপনে ভাষা সৈনিক নাদেরা বেগমের বাসায় গিয়ে হোস্টেলের ছাত্রীরা যাতে আমতলার প্রতিবাদ সভায় যান সে সংক্রান্ত চিঠি নিয়ে আসেন। ছাত্রীরা ছোট ছোট দলে (৪ জনের) বিভক্ত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গে সেদিন রাস্তায় নেমেছিল। এমনই একটি দলে ছিলেন হালিমা খাতুন। তার দলে অপর তিন জন হলেন, জুলেখা (পুতুল), নূরী ও সেতারা। তারা প্রথম পুরনো আর্টস বিল্ডিংয়ের দরজায় পুলিশের ব্যারিকেড ঠেলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিতে দিতে পথে বের হয়ে পড়ে। পুলিশ পথ ছেড়ে দেয়। কিন্তু তারপর ছোট ছোট আরো দুটি দল পুলিশের বেড়া ভেঙে বের হয়ে আসে। মেয়েদের তৃতীয় ও চতুর্থ দলটিকে পুলিশ এরেস্ট করে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে গিয়ে বহু দূরে গিয়ে ছেড়ে দেয়।
সারা তৈফুর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী। তিনি সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মহিলা হল ‘চামেলি হোস্টেল’-এ থাকতেন। ওই হলের দুই শতাধিক ছাত্রীকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে হল নেত্রী ড. শফিয়া খাতুনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্টভাবে কাজ করেছেন তিনি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যেসব পোস্টার লেখা হয়েছিল তিনি হোস্টেলের মেয়েদের নিয়ে সেই পোস্টার লিখেছেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গে সারা তৈফুর যে দলেছিলেন তা এগিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ সময় আত্মরক্ষা করার জন্য ছোটাছুটি করতে গিয়ে তিনি পায়ে আঘাত পান। আঘাতের কারণে তার পা দিয়ে রক্ত ঝড়ে। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি সামনের দিকে এগিয়ে যান এবং আন্দোলন চালিয়ে যান।
শামসুন নাহার আহসানও তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তিনি তার সঙ্গীদের নিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যখন বের হয়ে আসেন তখন এক পর্যায়ে পুলিশ মারমুখী হয়ে ওঠে। পুলিশের টিয়ার গ্যাস ও লাঠি পেটার মধ্যে আত্মরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন শামসুন নাহার। একই সঙ্গে পরিষদ ভাবনের কাছে এগিয়ে যেতে থাকেন। এক পর্যায়ে তাদের দলের কয়েকটি মেয়ে পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হন। তারা পাশে একটি কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে ড. গনির বাসায় আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় কাঁটাতারের বেড়ায় আটকা পড়ে তার শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়।

শরিফা খাতুন তখন স্কুলের গন্ডি ছাড়িয়ে ইডেন কলেজে ভর্তি হয়েছেন। হোস্টেলের দেয়াল টপকে তারা সমাবেশে যোগ দেন। ইডেন কলেজের হোস্টল থেকে ২০-২৫ জন ছাত্রী সেদিন ব্যানার নিয়ে বের হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শরিফা খাতুনদের দলটি সামনে দিকে এগোচ্ছিল। কিছুদূর এগোবার পর মিছিল আর এগোচ্ছিল না। কারণ পুলিশ মিছিল থেকে ছাত্রছাত্রীদের ধরে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। টিয়ার গ্যাসও ছোড়া হয়। বিকেল ৩টার দিকে গোলাগুলি শুরু হলো। গুলিতে হতাহতও হয় অনেকে। মিছিলে পুলিশের গুলি ছোড়ার ঘটনার ৩০-৪০ মিনিট পর কলাভবনের পাশ দিয়ে মেডিকেল কলেজের দেয়াল ভাঙা হলো। দেয়াল ভেঙে পথ করে ছাত্ররা মেয়েদের কলেজ হোস্টেলে পৌঁছে দেয়। আর অন্য মেয়েদের রিকশা ঠিক করে দেয়। পরে জানা যায়, পুলিশের হাত থেকে ছাত্রীদের রক্ষার জন্য মেডিকেল কলেজের দেয়াল ভেঙে পথ করার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ডক্টর মো. শহীদুল্লাহ।

 

ঢাকার বাইরেও নারীরা ছিল সোচ্চার

ঢাকার বাইরে যেসব নারী ভাষা সৈনিক সেদিন ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন মমতাজ বেগম ও প্রতিভা মুৎসুদ্দি তেমনি দুই নারী।

মমতাজ বেগমের আসল নাম কল্যাণী রায় চৌধুরী। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারাদেশ যখন উত্তাল সেই হাওয়া লেগেছিল নারায়ণগঞ্জেও। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করলেন মমতাজ। শুধু তাই নয়, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন তার স্কুলের শিক্ষক, ছাত্রী ও সাধারণ নারীদের। ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে শহরের রহমতউল্লা মুসলিম ইনস্টিটিউটের সামনে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশ চলছিল। সমাবেশের প্রধান বক্তা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। তখনই ঢাকা থেকে খবর এলো ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ছাত্র মিছিলে গুলি করা হয়েছে। গুলিতে কয়েকজন মারাও গেছেন। মুহূর্তেই জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলের ছাত্রী ও শিক্ষকদের বিশাল মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন মমতাজ বেগম। সেখান থেকেই বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। শহর হয়ে ওঠে উত্তপ্ত। মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলের আগে কখনো নারায়ণগঞ্জে নারীদের মিছিল সংঘটিত হয়েছে বলে জানা যায় না। সেই মিছিলটিই ছিল নারায়ণগঞ্জে নারীদের সংঘটিত প্রথম মিছিল।
এই সাহসী ভ‚মিকার জন্য মুসলিম লীগ সরকারের রোষানলে পড়েন মমতাজ বেগম। তাকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে এবং বিভিন্ন মিলের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে মিছিল করে আসে নারায়ণগঞ্জ কোর্ট প্রাঙ্গণে। শহরজুড়ে শুরু হয় মানুষের বিক্ষুব্ধ আলোড়ন। মমতাজ বেগমকে বহনকারী ঢাকাগামী গাড়িটি চাষাঢ়া মোড়ে এলে হাজার হাজার মানুষ গাড়ির পথ রোধ করে দাঁড়ায়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের পথে বড় বড় ১৬০টি গাছ কেটে ব্যারিকেড তৈরি করে ছাত্রছাত্রীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট নারায়ণগঞ্জে আসে। শুরু হয় পুলিশের নির্মম অত্যাচার। লাঠির আঘাতে রক্তাক্ত হয় হাজারো মানুষ। গ্রেপ্তারও করা হয় নির্বিচারে। শেষ রক্ষা হলো না। ট্রাকের পর ট্রাক পুলিশ এসে ঢাকার কারাগারে নিয়ে গেল তাকে। ১৯৫৩ সালের শেষদিকে দেড় বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান মমতাজ। ২০১২ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভ‚ষিত করেন সরকার।

ভাষা আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি। বায়ান্নতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে চট্টগ্রামে হাতেগোনা যে কয়জন নারী সক্রিয়ভাবে অংশ নেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি তাদের অন্যতম। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্যের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে যে মিছিল বের হয় সেই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তখন থেকেই প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষার সপক্ষে অনুষ্ঠিত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এই ভাষা সৈনিক। এ ছাড়া বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজের সঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নেয়া, পোস্টার লেখা এবং অভিভাবকদের বাধাকে উপেক্ষা করে মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি। অকুতোভয় এই ভাষা সৈনিক ভাষার অধিকার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কারাবরণও করেন। ২০০২ সালে পেয়েছেন একুশে পদক।
একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঘটনার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করে। এবং তা প্রায় সপ্তাহখানেক অব্যাহত ছিলো। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে নারীদের প্রথম প্রতিবাদ মিছিলে তার অংশগ্রহণ ছিল সক্রিয়। সেই মিছিল ছাড়া অন্য কর্মসূচিতেও নারীরা ট্রাকে করে শহর প্রদক্ষিণ করতেন। প্রতিভা মুৎসুদ্দি চট্টগ্রামের কলেজ থেকে অন্য সহপাঠীদের নিয়ে এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতেন।