পিলখানা ট্র্যাজেডির দশ বছর

আগের সংবাদ

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে

পরের সংবাদ

শাফিয়া খাতুন

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯ , ৯:১৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯, ৯:৫৯ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন

লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

অধ্যাপক ড. শাফিয়া খাতুন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩১ সালের ১৫ জানুয়ারি কলকাতায়। তার মূল বাড়ি ছিল রংপুরে। তার বাবা মীর আসগর আলী ছিলেন নামকরা আইনজীবী। তিনি কলকাতায় আইন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। ড. শাফিয়া খাতুন ১৯৪৬ সালে মেট্রিক, ১৯৪৮ সালে লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে আইএ ও পরে বিএ পাস করেন।

১৯৫০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ প্রথম পর্বে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে তিনি এমএ ও এমএড পাস করার পর শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে ডক্টরেট করেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীকালে তিনি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫১-৫২ সালে ছাত্রাবস্থায় শাফিয়া খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উইমেন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভিপি ছিলেন। এ সময় ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হওয়ায় তিনি ভাষা আন্দোলনে নারী সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হন। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য সে সময় আলাদা একটিমাত্র আবাসস্থল ছিল ‘চামেলি হাউস’।

এটিকে বলা হতো Dhaka University Women Students Residence। ড. শাফিয়া সেখানকার ভিপি ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করলে ছাত্র-জনতার মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে যে প্রতিক্রিয়া হয় শাফিয়া খাতুন তাতে আন্দোলিত হন।

তিনি উইমেন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভিপি হিসেবে এ সময় ভাষা আন্দোলনে ছাত্রীদের সংগঠিত করার কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। শাফিয়া খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীনিবাস ‘চামেলি হাউসে’র ছাত্রীদের নিয়ে বৈঠক করেন এবং তাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে শরিক হতে আহ্বান জানান।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে ছাত্রজনতার সঙ্গে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বদানের যে আবহ সৃষ্টি হয়েছিল, শাফিয়া খাতুন তাতে প্রাগ্রসর ভূমিকা পালন করেন। তিনি ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহিলা কলেজে ও গার্লস স্কুলে ছাত্রীদের সুসংগঠিত করে আন্দোলনমুখী করার কাজে নানা কৌশল অবলম্বন করেন।

এক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন বা একাধিক সহপাঠী ছাত্রীকে দায়িত্ব বণ্টন করে তিনি আন্দোলনে জনমত গঠনের কাজে প্রবৃত্ত হন। চামেলি হাউসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বেশ কয়েকটি বৈঠক, সমাবেশ ও মিছিলে তিনি নেতৃত্ব দেন।

১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট চলাকালীন ছাত্রীদের একটি মিছিলে শাফিয়া খাতুন নেতৃত্ব দেন। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রদের মিছিলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে গমন করে।

ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত ভাষা আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি সভা ও সমাবেশে শাফিয়া খাতুনকে আপসহীন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্রজনতার সমাবেশকে সাফল্যম-িত করার জন্য ছাত্রীদের পরিচালনার নেতৃত্বে ছিলেন শাফিয়া খাতুন।

তিনি বিভিন্ন ছাত্রী নেত্রীদের ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহিলা কলেজ ও বালিকা বিদ্যালয়ে গমন করে সেখান থেকে মিছিল সহকারে অকুস্থলে ছাত্রীদের নিয়ে আসার জন্য কর্মবণ্টন করেন। তার সাংগঠনিক দূরদর্শিতার জন্যই সে দিন বিপুলসংখ্যক ছাত্রীকে আমতলার সমাবেশস্থলে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছিল।

আমতলার সমাবেশে প্রথম চারজন করে বের হওয়ার কথা যখন আলোচিত হয়, তিনি তাতে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। শাফিয়া খাতুন মনে করেন, চারজন করে ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে ছাত্রছাত্রীদের বের হওয়ার ফলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হবে না। তিনি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সব ছাত্রছাত্রীর এক সঙ্গে বের হওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার প্রক্রিয়া শুরু হলে নেতৃত্ব দেন শাফিয়া খাতুন। তার সঙ্গে ছিলেন সুফিয়া ইব্রাহীম, রওশন আরা বাচ্চু, শামসুন্নাহার, হালিমা খাতুন প্রমুখ। তাদের দলটিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি, তবে কয়েকজনকে লাঠিচার্জ করেছে। পুলিশের লাঠির আঘাত ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ফলে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

১৯৫২ সালে ২২, ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারিতে বিচ্ছিন্নভাবে ও সুসংগঠিতভাবে স্থানে স্থানে যেসব সমাবেশ ও প্রতিবাদ মিছিল হয় সেগুলোর কয়েকটিতে শাফিয়া খাতুন উপস্থিত থাকেন। এভাবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শাফিয়া খাতুন বীরত্বের সঙ্গে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকার কথা স্মরণ করে ঢাকা করপোরেশন ধানমন্ডিতে একটি রাস্তার নামকরণ করেছে ‘ভাষাসৈনিক শাফিয়া খাতুন সড়ক’। এই ভাষাসংগ্রামী ১৯৯৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু বরণ করেন।

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন : লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা