আইপিএলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিল

আগের সংবাদ

এক ইনিংসে পাঁচ রেকর্ড আফগানিস্তানের

পরের সংবাদ

শোক আর ক্ষতিপূরণ নয় জীবনের মর্যাদা দেয়া জরুরি

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯ , ৯:৩৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯, ৯:৩৯ অপরাহ্ণ

স্বপ্না রেজা

কলাম লেখক।

নিমতলীর ঘটনা থেকে শিক্ষা না নেয়ার ফলাফল এটা। শিক্ষাটা কার নেয়া দরকার ছিল, স্থানীয় বাসিন্দাদের নাকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অথবা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের? হ্যাঁ, নিজেদের জীবন ঝুঁকিমুক্ত করতে অবশ্যই স্থানীয়রা কোনো রকম বিস্ফোরক, রাসায়নিক দ্রব্যাদি নিজেদের ঘরে মজুদ রাখবেন না।

যতবার চকবাজার, বাংলাবাজার, নবাবপুর, নিমতলীর মতো পুরান ঢাকার ঘনবসতি এলাকায় গিয়েছি, ততবার ভয়ে বুক কেঁপে উঠেছে। ভীত হয়েছি। স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার সরু অলিগলি, শেষ দেখতে উদ্বিগ্ন হতে হয়। শেষটা সহজে দেখা যায় না। এদিক-ওদিক ঝুলে থাকে বৈদ্যুতিক তার।

বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারগুলো জরাজীর্ণভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। মূল সড়ক বিভিন্ন ধরনের যানবাহন, খুচরো ফেরিওয়ালা আর পথচারীদের ভিড়ে ঠাসা, প্রায় অচল বলা যায় চলাচলে। গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে আবাসিক দালানকোঠা, ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক কারণে কারখানা, গুদামঘর এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেছে যে, হেঁটে গেলে মনে হয় মাথার ওপর ভেঙে পড়বে।

আবার এসব দালানকোঠায় উঠলে মনে হয়, এই বুঝি দালানকোঠার সঙ্গে নিচে ধসে পড়ব। ভূমিকম্পে এসব এলাকার মর্মান্তিক পরিণতির কথা বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, বলছেনও। ফলে এসব জায়গায় গেলে অজানা আশঙ্কার মতো থেকে থেকে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

আবার বৈদ্যুতিক তার, ট্রান্সফরমার, রাসায়নিক কারখানা, বাসাবাড়ি, গুদামগুলো একে অন্যের সঙ্গে এমনভাবে দলা পাকিয়ে থাকে যে, মনে হয় দলার কোথাও সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলেই যেন সব ঝলসে যাবে, ছাই হয়ে হবে। আর যাই হোক নিমতলীর ট্র্যাজেডি তো আর ভোলার নয়।

২০১০ সালের ৩ জুন ১২৪ জন মুহূর্তের মধ্যে ছাই হওয়ার মর্মান্তিক ইতিহাস তো অত সহজে মুছে যাওয়ার নয়। ফলে এসব এলাকায় গেলে ট্র্যাজেডির ভয়টাও সঙ্গে যায়। ছায়ার মতো অনুসরণ করে। মনে হয় আমি হয়তো অতি সহজে নিরাপদে বের হতে পারব না আর।

ফিরতে পারব না নিজের ঠিকানায় একটা দেহ ও তার প্রাণ নিয়ে। বলতে দ্বিধা নেই, পুরান ঢাকার পরিবেশের কারণে যে ভয় আগে সঙ্গে ছিল, তাকে ছাপিয়ে গেছে নিমতলীর ট্র্যাজেডিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আমলে না আনার কারণে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া চকবাজারের চুড়িহাট্টার করুণ ট্র্যাজেডি।

পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের ভেতর কিন্তু এমন ভয় দেখতে পাওয়া যায় না। তারা বেশ সাবলীলভাবে ঘিঞ্জির ভেতর বসবাস করেন। নিমতলীর মর্মান্তিক ঘটনার পরও তাদের এই বসবাসে কোনো ছেদ পড়েনি, দুশ্চিন্তা হয়নি। বরং পূর্বপুরুষের ভিটায় তারা নিশ্চিন্তে বসবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন বরাবরের মতো।

এদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী হওয়ায় তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কারখানা, গুদাম, সব স্থাপনা নিজেদের আয়ত্তে, দৃষ্টির সীমানায় গড়ে তোলেন। ‘সেফটি সিকিউরিটি’ ফিলিংস নেই বললেই চলে। হয়েছে বলেও মনে হয় না। নিজেদের গণ্ডি পেরিয়ে কোনো যুক্তিতে বের হতে চান না। ফলে নতুন ঢাকার কোনো হাতছানি তাদের স্পর্শ করে না।

পারিবারিক ঐতিহ্য, আভিজাত্য রক্ষায় তারা এমনতর পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, বসবাস করেন। আর ঢাকা শহরের অংশ বিধায় সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত এসব অঞ্চল। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এসব এলাকার দেখভাল করে থাকে। করার কথা বলেই বলছি, করে থাকে।

কিন্তু কী দেখভাল করেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর নিমতলী ট্র্যাজেডির পর চকবাজার ট্র্যাজেডিতে খুঁজে পাওয়া যাবে নিঃসন্দেহে, অন্তত এটা পরিষ্কার বলা যায়। পুরান ঢাকার স্থাপনাগুলো এবং স্থানীয় পরিবেশ কোনোভাবেই নিরাপদ নয় জীবনযাপনে, এ কথা কিন্তু নতুন নয়।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, শিল্প, স্বরাষ্ট্র প্রতিটি মন্ত্রণালয় এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বেশ ভালোভাবে এই পুরনো কথা অবগত আছে। আট বছর আগে নিমতলী ট্র্যাজেডির সেই কথা খুব কঠোরভাবে, পরিষ্কার হরফে ১২৪টি প্রাণের বিনিময়ে বলে গেছে, স্বাক্ষর রেখে গেছে।

নির্বোধ, উদাসীন বিভাগগুলো আট বছরেও সেই কথার মর্মার্থ বোঝেনি সম্ভবত। আর তাই নিমতলী ট্র্যাজেডিতে সেই সময়ে সরকারের তদন্ত কমিটি যে সুপারিশ করেছিল, দীর্ঘ আট বছরেও তার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। আট বছরে কেন এই সুপারিশ অনুযায়ী কাজ করা হলো না, সেই জবাবদিহিতা কার কাছে পাওয়া যাবে, প্রশ্নটাও নিরর্থক।

কারণ যাদের অনেক কিছুই করার ছিল, দায়িত্ব ছিল, তারাই আজ চকবাজার ট্র্যাজেডির দোষীকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অনেকটা নিজেদের দোষমুক্ত রেখে। যেভাবেই হোক এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার দায়ী, দোষী ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হবে, এমন কিছু বললেন কেউ একজন। কানে বিঁধলেও মানতে হলো।

কারণ এটাই দেশের প্রচলিত দোষারোপের সংস্কৃতি। ভাবছি এমন কোনো দোষী ব্যক্তিকে অবশেষে খুঁজে পাবে কিনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সংস্থা, যারা কিনা বলে ফেলে, এই সেই ব্যক্তি, যার ছুড়ে ফেলা জ্বলন্ত সিগারেট রাসায়নিক গুদামে এত বড় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে?

প্রাণহানি ঘটেছে! বাতাসে পোড়ার গন্ধ মিশে গেছে! পুরো এলাকায় কয়লার স্তূপ হয়েছে! এই ব্যক্তির এমন আচরণের সঙ্গে আর কেউ বা গোষ্ঠী সম্পৃক্ত কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, কাউকেই রেহাই দেয়া হবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কিন্তু অসম্ভব কিছুই নয়।

এটাই তো আমরা দেখি যে, অতি সাধারণ ব্যক্তির এক থেকে ততধিকবার ময়নাতদন্ত যত সহজে করা সম্ভব এ দেশে, রাঘব-বোয়ালখ্যাত ব্যক্তিদের তত সহজে একবারো নয়। আর তাই তো বিনা দোষেও বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের কতজনই না জেল খাটেন, জেল খেটে গেছেন।

শোক প্রকাশ বেশ সহজ কাজ। শোক প্রকাশ করার সুযোগ যেন তৈরি না হয়, সেটা করা সম্ভবত বেশ কঠিন কাজ। ওটা করতে হলে দায়িত্ববান হতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়। শত বাধা, বিপত্তিতেও সঠিক তদন্ত করতে হয়, সুপারিশ করতে হয়। সততার সঙ্গে অন্যায়কে প্রতিহত করতে হয়।

কী দরকার সহজ কাজ রেখে কঠিন কাজ করার? আবার আরো সহজ কাজ হলো দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারপ্রতি এক লাখ বা তার অধিক টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া, মৃতের সৎকারের জন্য মৃতপ্রতি কিছু টাকা বরাদ্দ দেয়া। আহতদের চিকিৎসার জন্য অর্থ সহায়তা দেয়াও সহজ।

এ ধরনের ক্ষতিপূরণ দিতে টাকার গাছ বপন করতে হয় না সরকারকে, জনগণের কাছ থেকে আদায় করে নেয়া হয়। আর সব কিছুর মতো এসব ক্ষেত্রেও মূলত সাধারণ মানুষের টাকাই সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে যায়। চকবাজারের যারা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন বা পাবেন, মূলত তাদের টাকাই তাদের কাছে যাচ্ছে বা যাবে পরোক্ষভাবে।

কারণ সরকারের নিজের বলতে কোনো টাকা নেই। থাকে না। সরকারের টাকার উৎস তো জনগণের ভ্যাট-ট্যাক্স। জনগণের কাছে সেবা বিক্রি করে, সেই অর্থে যেমন সরকার চলে, তেমন সেই অর্থেই জনগণকে প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। সেবা জনগণ আদৌ কতটা পায় বা পাবে, সেটা বড় কথা হয়ে ওঠে না। তাই ক্ষতিপূরণ দেয়ায় কোনো মহত্ত্ব নেই, কৃতিত্ব নেই।

আমি ব্যক্তিগতভাবে তা খুঁজে পাই না, দেখি না। বরং ক্ষতিপূরণ যেন দিতে না হয়, সেই ব্যবস্থা বাস্তবায়নই প্রকৃত দায়িত্ব, কর্তব্য এবং তা জরুরি। যেটা জনগণ প্রত্যাশা করে। যেটা নিমতলীর ট্র্যাজেডির পর চকবাজারে করা উচিত ছিল। কিন্তু সেটা করা সম্ভবত অনেক কঠিন ছিল সংশ্লিষ্টদের।

সাবেক শিল্পমন্ত্রী রাসায়নিক গুদামগুলো না সরাতে পারার কারণও বললেন। যে কারণটায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, রাসায়নিক কারখানা, গুদাম সরিয়ে নেয়ার অক্ষমতা তাদের। ক্ষমতায় থেকেও যা পারা সম্ভব হয়নি। আমরা বারবার বুঝি, ক্ষমতা মূলত থাকে স্বার্থের ভেতর ঘুপটি মেরে।

তাই অবলীলায় মানুষ পোড়ে, ছাই হয়। নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মনমানসিকতাই বা কোথায়। ওসব থাকে না। ওসব থাকার জন্য মাথার ওপর সার্চলাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। সেটাই বা সম্ভব কী করে। কেউ কী দেখার থাকে যে, অন্য কেউ কী করছে। দুর্ঘটনার পর ওসবও কয়লা হয়ে যায়।

নিমতলীর ১২৪টি দেহ কয়লায় রূপান্তর হওয়ার নয় বছর পর চকবাজারের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকে বলেছেন, নিমতলীর ঘটনা থেকে শিক্ষা না নেয়ার ফলাফল এটা। শিক্ষাটা কার নেয়া দরকার ছিল, স্থানীয় বাসিন্দাদের নাকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অথবা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের?

হ্যাঁ, নিজেদের জীবন ঝুঁকিমুক্ত করতে অবশ্যই স্থানীয়রা কোনো রকম বিস্ফোরক, রাসায়নিক দ্রব্যাদি নিজেদের ঘরে মজুদ রাখবেন না। রাখতে পারবেন না। রাখতে না পারার সুশাসন করার দায়িত্ব পালন কে করবেন, সেই শিক্ষাই বা কে কাকে দিচ্ছেন, দেবেন?

আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক কারখানা করার অনুমোদন কে, কাকে দিচ্ছেন, কোন সম্ভাব্যতায় দিচ্ছেন বা দিতে পারেন- এসব ব্যাপার-স্যাপারে শিক্ষণীয় কী থাকছে?

স্বপ্না রেজা : কলাম লেখক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা