এক ইনিংসে পাঁচ রেকর্ড আফগানিস্তানের

আগের সংবাদ

ডিভিডেন্ডের মৌসুমেও পুঁজিবাজার মন্দা

পরের সংবাদ

বাংলা ভাষার এপার ওপার

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯ , ৯:৪৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯, ৯:৪৮ অপরাহ্ণ

মোস্তাফা জব্বার

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলাম লেখক।

আমি বরাবরই ভাষার কুলীনতা নিয়ে চিন্তিত নই। আমি মনে করি, কোনো ভাষায় যদি বিদেশি শব্দের আগমন স্বাভাবিক গতিতে হয় এবং তার যদি প্রাসঙ্গিকতা থাকে তবে তাকে স্বাগত জানাতে হবে। বিশেষ করে ডিজিটাল দুনিয়াতে ডিজিটাল সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত শব্দাবলী সব ভাষাতে আসবেই। আমি চাইলেই কম্পিউটারকে গনক যন্ত্র, ডিস্ককে চাকতি হিসেবে লিখে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারি না। আমার লেখা কম্পিউটার বিষয়ক বইগুলোতে যেখানে প্রয়োজন হয়েছে সেখানে ইংরেজি শব্দ রেখে দিয়েছি।

যদি বলা হয় যে বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও বাংলা হরফমালা এখন একুশের বইমেলা ও শহীদ মিনারেই সীমিত হয়ে আছে তবে মিশ্র প্রতিক্রিয়া হবে। কেউ কেউ মনে করবেন কথাটি সত্য না। কেউ কেউ বলবেন এটাই তো বাস্তবতা। মিশ্র প্রতিক্রিয়া বলছি সেই প্রেক্ষিতটা বিবেচনা করেই। এটি বাস্তবতা যে, ২১ ফেব্রুয়ারি এখন কেবল আমাদের শহীদ দিবস বা ভাষা দিবস নয়- বস্তুত এটি বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ দুনিয়ার বহু দেশের মানুষ আমাদের বাংলা ভাষা, বাংলা হরফ ও ফেব্রুয়ারির জন্য চেনে। ওরা মনে করে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইতে আমরা বীরের জাতি। এটি নিশ্চিত সত্যকথন। দুনিয়াতে আরো দেশে ভাষা আন্দোলন হলেও কেউ ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে একটি আলাদা দেশ বানিয়ে ফেলেনি। আমরা বীর এ জন্য যে, ভাষার মর্যাদা রক্ষা করার আন্দোলন করতে গিয়ে আমরা একটা দেশই বানিয়ে ফেলেছি।

তবে আমাদের দেশের কেউ কেউ এখনো মনে করছেন, বাক্যটা একটা নৈরাশ্যজনক ও নেতিবাচক অবস্থাকে বাস্তবে প্রতিফলিত করছে না। অন্য সব সময়ের মতো এবারো তাই বিষয়টির একটু পোস্টমর্টেম করা যেতে পারে। প্রতি বছরই আমি এই কাজটি করে থাকি।

ফেব্রুয়ারি মাসের সূচনা হয় পত্রিকার পাতায়-টিভির পর্দায় একটি কলাম বা ইভেন্ট হিসেবে। পুরো বছর বাংলা ভাষা-সাহিত্য বা হরফমালা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা না থাকলেও এই মাসটাতে বইয়ের বিজ্ঞাপনের দাম কমে, ভাষা আন্দোলন বিষয়ক অনুষ্ঠানাদির খবরাখবর প্রকাশিত হয় এবং বৈকালিক আড্ডা হিসেবে বইমেলা জমে ওঠে।

প্রধানমন্ত্রী নিজে বইমেলা উদ্বোধন করেন এবং হাজার হাজার বই প্রকাশিত হয়ে বাংলাদেশের প্রকাশনাকে সমৃদ্ধ করে। হিসাব বলে, বছরের সব সৃজনশীল বাংলা বইয়ের শতকরা ৮০ ভাগ কেবল এই সময়েই প্রকাশিত হয়। আমরা আদর করে একে প্রাণের উৎসব, মননের প্রকাশ ইত্যাদি নানা নামে ডাকি।

এই কথাটিও সত্য যে এই সময়ে ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত নবীন-প্রবীণ অনেকেই বিকেলটা বা ছুটির সময়টা বই মেলাতেই কাটাতে পছন্দ করেন। এক দল লোক বস্তুত বছরের এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঢাকায় বাংলা একাডেমির বইমেলা চলছে।

একই সঙ্গে ভারতের কলকাতাতেও আন্তর্জাতিক বইমেলা শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রকাশকরাও সেই মেলায় একটি প্যাভিলিয়নে জমাটবদ্ধভাবে অংশ নিয়েছেন।

এমন একটি পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে আমি ১৩ সালের কলকাতা বইমেলার ভারতের নিউজটাইমস নামক একটি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানের স্মৃতি স্মরণ করতে পারি। সেই বছর কলকাতা বইমেলায় থিম কান্ট্রি ছিল বাংলাদেশ। সেই সুবাদে ২০১৩ সালে অনেক কষ্টে ভিসা জোগাড় করে কলকাতা গিয়েছিলাম।

সেই বছর ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলায় ধারণকৃত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক একটি আলোচনা সভায় বাংলাদেশের আলোচকদের মাঝে কবি বেলাল চৌধুরী, কবি কামাল চৌধুরী (সাবেক সচিব) ও আমি অংশ নিয়েছিলাম। পশ্চিমবঙ্গের আলোচক ছিলেন পাঁচজন।

এর মাঝে পুস্তক মেলার আয়োজক বুক সেলার্স ও রাইটার্স গিল্ডের সভাপতি সুধাংশু দে ও সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চৌধুরীও ছিলেন। আমাদের আলোচ্য বিষয় ছিল; বাংলা ভাষার আজ ও কাল। উপস্থাপক ছিলেন পার্থ চৌধুরী। শিরোনামটির প্রতিপাদ্য আমি সেখানকার আলোচনা থেকেই নিয়েছি। আলোচকদের কেউ একজন বাংলা ভাষা ও বর্ণমালার বর্তমান অবস্থাকে এভাবেই চিহ্নিত করেছিলেন।

কলকাতার অনুষ্ঠানের উপস্থাপক পার্থ চৌধুরী আলোচনার শুরুতেই প্রশ্ন তোলেন, বাংলা ভাষার বিকৃতি ও অপপ্রয়োগ নিয়ে। আলোচনা হয়; বাংলা ভাষায় প্রচুর বিদেশি শব্দের আগমন, এফএম রেডিওতে বাংলার বিকৃত উচ্চারণ এবং জীবনের সব ক্ষেত্রে বাংলার প্রয়োগ নিয়ে।

ডিজিটাল যুগে বাংলা ভাষার অবস্থানের প্রসঙ্গটিও আসে। আমি লক্ষ করলাম, পশ্চিমবঙ্গের আলোচকদের মাঝে যারা লেখক তারা বাংলা ভাষায় বিশেষ করে হিন্দি ও ইংরেজি শব্দের আগমন নিয়ে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন। পশ্চিমবঙ্গের শহরগুলোতে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষারও তীব্র সমালোচনা করেন তারা।

তবে প্রকাশকরা তেমন অসহায় মনে করেন না। তাদের ধারণা ছিল দিনে দিনে বাংলা প্রকাশনা শিল্পের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ভাষার বিকৃতি ও বিদেশি শব্দের আগমন সম্পর্কে বাংলাদেশের বেলাল চৌধুরী, কামাল চৌধুরী ও আমি প্রায় সমস্বরে বললাম যে, ভাষা নদীর মতো। এতে যেমনি করে টলমলে স্পষ্ট পানির প্রবাহ থাকবে তেমনি করে থাকবে নোংরা পানিও।

নদীর প্রবাহের স্বচ্ছতাই নোংরা আবর্জনার দূষণ দূর করবে। কোন ভাষায় কোন শব্দ টিকে থাকবে সেটি নির্ণয় করবে সময়। এ ছাড়া প্রযুক্তি ও জীবনধারার জন্য নতুন শব্দ তো জন্ম নেবেই। বিশ্বায়নের সময়ে প্রভাবশালী ভাষাসমূহ থেকে শব্দ আসবে এবং যাদের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি তাদের শব্দও আসবে। বাংলা শব্দ অন্য ভাষাতে যাওয়ার ব্যাপারটাও তাই।

আমরা আরো বললাম, যে কোনো জীবন্ত ভাষাতেই বিকৃতি, আঞ্চলিকতা বা নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে থাকে। এফএম রেডিওর এই বিকৃতিও তেমন একটি প্রচেষ্টা। বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার বা এর হরফ বদলানোর চেষ্টা অতীতে বহুবার হয়েছে। কিন্তু বাংলার অবস্থান এখন এত সুদৃঢ় যে এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।

কেউ যেন ভাষার মূল স্রোতকে পাল্টে দিতে না পারে বা কোনো চোরাগলিতে নিয়ে যেতে না পারে তার চেষ্টা চালাতে হবে। কামাল চৌধুরী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা এবং এফএম রেডিওর বিকৃতি নিয়ে সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বললেন। আমাদের আলোচনায় এল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাজে ও শিক্ষায় বাংলার ব্যাপক প্রয়োগ এবং বাংলা ভাষার ডিজিটাল যাত্রায় বাংলাদেশের অবদান নিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গের আলোচকরা আরো স্পষ্ট করে বললেন, কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা ভাষার অবস্থা এখন ‘মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বেঙ্গলি ভাষা’র মতো। ওখানে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে যেমনি করে ও লা লা করা হয়েছে তেমনি বাংলা ভাষাকে হিন্দি ও ইংরেজির দাসে পরিণত করা হয়েছে।

আমরাও বাংলা ভাষার বিকৃতির প্রচেষ্টাকে লক্ষ করেছি। বিশেষ করে এফএম রেডিওতে অকারণে ইংরেজি মিশ্রিত করা বা উচ্চারণে বিকৃতি ঘটানোর প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। তবে সেটি স্থায়ী হতে পারবে বলে মনে করার কোনো কারণ আমরা পাইনি।

আমি বরাবরই ভাষার কুলীনতা নিয়ে চিন্তিত নই। আমি মনে করি, কোনো ভাষায় যদি বিদেশি শব্দের আগমন স্বাভাবিক গতিতে হয় এবং তার যদি প্রাসঙ্গিকতা থাকে তবে তাকে স্বাগত জানাতে হবে। বিশেষ করে ডিজিটাল দুনিয়াতে ডিজিটাল সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত শব্দাবলী সব ভাষাতে আসবেই।

আমি চাইলেই কম্পিউটারকে গনক যন্ত্র, ডিস্ককে চাকতি হিসেবে লিখে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারি না। আমার লেখা কম্পিউটার বিষয়ক বইগুলোতে যেখানে প্রয়োজন হয়েছে সেখানে ইংরেজি শব্দ রেখে দিয়েছি। এসব শব্দ পরিচিত ও গৃহীত হয়ে গেছে। উপস্থাপক আমার কাছে মেইল, ইন্টারনেট ও ফেসবুকে বাংলা লেখা নিয়ে প্রশ্ন করলেন।

আমি তাকে বলেছিলাম যে, বাংলাদেশে ৩০ লাখের মতো (তখন-বর্তমানে ৩ কোটির ওপরে) ফেসবুক ব্যবহারকারীর বেশির ভাগ বাংলা লেখে। কেউ কেউ বাংলা হরফে বাংলা লেখে। কেউ ইংরেজি হরফে বাংলা লেখে। অনেকের বানান শুদ্ধ হয় না। উচ্চারণভিত্তিক রোমান কিবোর্ড দিয়ে লেখে বলে সঠিক বাংলা হরফ ব্যবহারও করতে পারে না।

যদিও আমি রোমান হরফে বাংলা লেখার পক্ষে নই এবং শুদ্ধভাবেই বাংলা লেখার পক্ষে তবুও আমি এই প্রজন্মকে বাংলা লেখার জন্য স্বাগত জানাই। কারণ তারা যেভাবেই হোক মাতৃভাষা চর্চা করছে। ভুল করে হলেও করছে। আমি মনে করি, একদিন ওরাই রোমান হরফের বাংলাকে বাংলা হরফে রূপান্তর করবে। ভুলটাকে শুদ্ধ করবে।

আমাদের দেশেও বাংলা ভাষার উচ্চারণ বিকৃতি ও অপপ্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ আছে। এফএম রেডিওর বিকৃত উচ্চারণ ও জগাখিচুরি ভাষা অনেককেই হতাশ করছে। কিন্তু বাংলাদেশ তার জন্য মোটেই আতঙ্কিত নয়। আমাদের ভাষার ভিতটা এতটা দুর্বল নয় যে, এমন ছোটখাটো অপচেষ্টায় সেটি ভেঙে পড়বে।

প্রসঙ্গত গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চৌধুরী স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের প্রশংসা করলেন। তিনি বলেই ফেললেন যে, ৩৭ বছর ধরে (তখনকার হিসাবে) যে কলকাতা বইমেলা হচ্ছে তার পুরা কৃতিত্ব বাংলাদেশের। তিনি ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা ও ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনে বাংলাদেশের অবদানের প্রশংসা করলেন।

আমাকে উপস্থাপক প্রশ্ন করলেন, ডিজিটাল যুগে বাংলার কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কিনা। আমি জানালাম, বাংলাদেশ ডিজিটাল যন্ত্রে বাংলা লেখার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে। ইন্টারনেটের ডমেইন নাম বাংলায় করার পাশাপাশি এমনকি মোবাইলে বাধ্যতামূলক বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। পার্থর নিজের আগ্রহ ছিল এন্ড্রয়েডে বাংলা লেখার বিষয় নিয়ে।

আমি তাকে জানিয়েছিলাম, সেবারের একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা বিজয়ের এন্ড্রয়েড সংস্করণ প্রকাশ করেছি। ২০১৫ সালে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এখনই উইন্ডোজ-ম্যাক ও লিনাক্সেরও বাংলা সফটওয়্যার রয়েছে। আইওএসের জন্যও বাংলা সফটওয়্যার বাজারে এসেছে।

বলা যেতে পারে, পুরো অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের প্রশংসায় পরিপূর্ণ ছিল। ভারতীয় একজন লেখক খুব সুন্দর করে জানালেন, বাংলাদেশের মানুষ তার ভাষাকে এত ভালোবাসে যে প্রবাসে থাকলেও সে একটি বাংলা পত্রিকা, বাংলা চ্যানেল ও বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। সেই বছর ৫ ফেব্রুয়ারির প্রথম আলোতে আনিসুল হক যথার্থই লিখেছেন যে, বাংলা ভাষার কেন্দ্র এখন বাংলাদেশ।

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও কলাম লেখক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা