ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহায়তার আহ্বান জিএম কাদেরের

আগের সংবাদ

আইপিএলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিল

পরের সংবাদ

পিয়ারু সর্দার

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯ , ৯:৩৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯, ৯:৩৩ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন

লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের পেছনে পুরান ঢাকার হোসনী দালান মহল্লার এক সর্দার অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিঃস্বার্থভাবে ইট, বালু, সিমেন্ট দিয়ে সহযোগিতা করেন। তাঁর নাম পিয়ারু সর্দার। তিনি বকশীবাজার হোসনী দালান, নাজিমুদ্দীন রোড, উর্দু রোড এলাকার সর্দার ছিলেন। তিনি ঠিকাদার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

ঢাকার অনেক ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান তাঁর হাতের স্পর্শেই নির্মিত হয়। তাঁর জন্ম ১৮৯৬ সালে পুরান ঢাকায়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন দানশীল, উদার এবং মহৎ মানুষ ছিলেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পিয়ারু সর্দারের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তিনি এ আন্দোলনকে সব সময় সমর্থন করতেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন।

তাঁর মহল্লার উত্তর পাশেই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং এর গড়ে ওঠা তিনি যৌবনেই দেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাতৃভাষা আন্দোলন পিয়ারু সর্দারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রায়ই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ত। পুলিশের তাড়া খেয়ে তারা রেললাইন পার হয়ে পিয়ারু সর্দারের মহল্লায় এসে আশ্রয় নিত। তারা হোসনী দালানে এসে নিরাপদ বোধ করত। পুলিশ এসে তল্লাশি করতে চাইলে পিয়ারু সর্দার বাধা দিতেন, পরিস্থিতি সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা করতেন।

এসব কারণে ছাত্রদের মধ্যেও পিয়ারু সর্দারের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তি ছিল। ছাত্ররা তাঁকে সমীহ করত। ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসমাজ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। সে দিন একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা আমতলায় ঐতিহাসিক সমাবেশ শেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল নিয়ে আসে।

শুরু হয় পুলিশের নির্মম অত্যাচার। ছাত্র-জনতা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে আশ্রয় নেয় এবং পিকেটিং করতে থাকে। বেলা তিনটা বা সাড়ে তিনটার দিকে গুলিবর্ষণ করা হয়। শহীদ হন বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে। ছাত্রদের এহেন মর্মান্তিক বীরোচিত মৃত্যু পিয়ারু সর্দারকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদদের স্মরণে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সেই রক্তভেজা স্থানে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়। এ সময় মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস সম্প্রসারণের কাজ চলছিল। কলেজের মধ্যেই ইট, বালি, রড স্তূপাকারে ছিল। তালাবদ্ধ একটি গুদামে ছিল সিমেন্ট। ওই গুদামের চাবি ছিল পিয়ারু সর্দারের কাছে। ছাত্ররা পিয়ারু সর্দারের কাছে গিয়ে নিজেদের অভিপ্রায় জানায় এবং তাঁর গুদামের সিমেন্ট ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনা করে।

পিয়ারু সর্দার ছাত্রদের কথা শুনে কালবিলম্ব না করে ঘরের ভেতর থেকে চাবি এনে ছাত্রদের হাতে দেন। বলেন ‘যত প্রয়োজন হয় সিমেন্ট ব্যবহার কর, কিন্তু অপচয় করো না আর সিমেন্ট নেয়া হলে গুদামে তালা মেরে চাবি ফেরত দিয়ে যেও’। তিনি সে দিন শুধু সিমেন্ট ব্যবহার করার অনুমতি দেননি, দুজন রাজমিস্ত্রিও দিয়েছিলেন ছাত্রদের সাহায্য করার জন্য।

মেডিকেল কলেজের যে ছাত্রটি পিয়ারু সর্দারের কাছে গুদামের চাবি আনতে গিয়েছিলেন তাঁর নাম মো. আলী আছগর। তিনি বলেন, আমি রাতে পিয়ারু সর্দারের বাসায় যাই গুদামের চাবি আনার জন্য। উদ্দেশ্য গুদাম থেকে সিমেন্ট বের করা। আমরা কয়েকজন হেঁটে হেঁটে পিয়ারু সর্দারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। পিয়ারু সর্দার আমাদের কথা শুনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চাবি দিয়ে দিল।

চাবি এনে গুদামের তালাটি প্রথম আমিই খুলি। সিমেন্ট বের করে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইন দিয়ে মেডিকেলের ছাত্ররা সিমেন্ট শহীদ মিনার নির্মাণের স্থানে নিয়ে যায়। পিয়ারু সর্দারের কয়েকজন শ্রমিক এখানেই ছিল। আমরা তাদের সহায়তা নেই। আমরা সব জিনিস ব্যবহার করে ২৪ তারিখ সকালে একজন কর্মচারীর হাতে পিয়ারু সর্দারের চাবি হস্তান্তর করি।

সে দিন যে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পিয়ারু সর্দার ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে এগিয়ে এসেছিলেন তা ছিল দুঃসাহসিক কাজ। সে দিন ছাত্রদের সাহায্য করার অভিযোগে তিনি রাজরোষে পড়ে সর্দারি হারাতে পারতেন, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় জড়িয়ে তিনি জেলে যেতে পারতেন, তার প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্স বাতিল হতে পারত।

এসব হলে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা ধুলায় মিশে যেত। তারপরও তিনি এসব ঝুঁকি নিয়ে সে দিন ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে দিনের সে ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে আজকে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মহান একুশের স্মৃতিকে ধারণ করে আছে আজকের শহীদ মিনার।

শহীদ মিনারের সঙ্গে মিশে আছে পিয়ারু সর্দারের নামটি। পুরান ঢাকার আধুনিক মানুষ পিয়ারু সর্দারের মৃত্যুবরণ করেন ১৯৬১ সালের ৫ অক্টোবর।

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন : লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা