আমরা শোকাহত ও মর্মাহত

আগের সংবাদ

ভাষা ও নৃগোষ্ঠীকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হবে

পরের সংবাদ

রওশন আরা বাচ্চু

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯ , ৯:৪৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯, ৯:৪৬ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন

লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রওশন আরা বাচ্চু অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সংগঠিত করা ছাড়াও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হলের ছাত্রীদের ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সুসংগঠিত করেন।

একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী প্রথম ছাত্রীদলের অন্যতম সদস্য ছিলেন রওশন আরা বাচ্চু। ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু ১৯৩২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সিলেটের কুলাউড়ার উছলাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।

বাবা এ এম আফরেফ আলী ও মা মনিরুন্নেসা খাতুন। ১৯৪৭ সালে রওশন আরা বাচ্চু লেডি কীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৪৯ সালে বরিশালের বি এম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট, ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে অনার্স পাস করেন। ১৯৬৫ সালে বিএড এবং ১৯৭৪ সালে ইতিহাসে এমএ পাস করেন।

রওশন আরা বাচ্চু ‘গণতান্ত্রিক প্রোগ্রেসিভ ফ্রন্ট’ এ যোগ দিয়ে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং উইম্যান স্টুডেন্টস রেসিডেন্স এর সদস্য নির্বাচিত হন। প্রতিবাদী ছাত্র সংগঠন গণতান্ত্রিক প্রোগ্রেসিভ ফ্রন্টে যোগদানের মাধ্যমে রওশন আরা বাচ্চু রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আন্দোলনে তিনি অংশ নেন। ১৯৪৯ সাল থেকে রাষ্ট্রভাষা দিবসের কর্মসূচিতে তিনি সম্পৃক্ত থাকতেন। ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট এবং ১১, ১২, ১৩ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবসে তিনি রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে ২০ ফেব্রুয়ারি হরতাল আহ্বান করা হলে সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। পরিস্থিতি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে।

পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সেদিন ১৪৪ ধারা জারি করে। এ সময় যেসব ছাত্রছাত্রী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করাই আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন বলে মনে করেন, রওশন আরা বাচ্চু তাদের মধ্যে একজন।

২১ ফেব্রুয়ারির দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আহূত ছাত্র-জনতার সমাবেশে ছাত্রীদের সুসংগঠিত করে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে যারা কাজ করেছেন রওশন আরা বাচ্চু হলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ইডেন কলেজ ও বাংলাবাজার বালিকা বিদ্যালয় থেকে ছাত্রীদের সংগঠিত করে আমতলার সমাবেশস্থলে নিয়ে আসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশস্থলটির বাইরে পুলিশ লাঠি দিয়ে ব্যারিকেড দিয়েছিল। অনেকে লাঠির ওপর দিয়ে লাফিয়ে এবং নিচ দিয়ে বের হয়ে গেলেও রওশন আরা বাচ্চু তা করেননি। তিনি আরো কয়েক ছাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশের লাঠির ব্যারিকেডটি ভেঙে ফেলেন এবং দলের অন্যদের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসেন।

এদিকে পুলিশ ব্যারিকেড ভাঙার দৃশ্য দেখা মাত্রই এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ শুরু করে দেয়। লাঠির আঘাতে তিনি আহত হন। সেদিন বিকেলে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদ সদস্য আনোয়ারা খাতুন বক্তব্য রাখতে গিয়ে যে দুজন আহত ছাত্রীর পরিচয় তুলে ধরেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বেগম রওশন আরা বাচ্চু।

এদিকে বর্তমানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পার্শ্ববর্তী এলাকা পুলিশের মুহুর্মুহু গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। উপায়ন্তর না দেখে রওশন আরা বাচ্চু স্তূপীকৃত ভাঙা রিকশার নিচে গিয়ে আশ্রয় নেন। তিনি এখানেও নিরাপদ মনে করলেন না।

পরে একজন হলের প্রভোস্ট ড. গনির পার্শ্ববর্তী বাড়িটিতে আশ্রয় নেয়ার মনস্থ করে রওনা হন। সে বাড়িটির কাঁটাতারের বেড়া পার হতে গিয়ে কাঁটাতারের সঙ্গে শাড়ির আঁচল আটকে যায় তার। এ সময় কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে আসলে তিনি কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে ড. গনির বাসায় আশ্রয় নিতে সক্ষম হন।

একুশের হত্যকাণ্ডের পর ২২ ফেব্রুয়ারির গায়েবানা জানাজা, শোক মিছিল, ২৩ ফেব্রুয়ারির হরতালসহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডে রওশন আরা বাচ্চু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে অনুষ্ঠিত অন্যান্য সভা ও সমাবেশে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। কোনো ভয়ভীতি তাকে ভাষাচেতনার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি যে সময় ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন, সে সময় মেয়েদের জন্য অনুকূল পরিবেশ ছিল না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের অনুমতি ছাড়া ছেলেদের সঙ্গে কথা বললে সে সময় ১০ টাকা জরিমানা করা হতো মেয়েদের। আন্দোলনে গেলে পড়াশুনা বন্ধ করে দেয়ার পারিবারিক হুমকিও ছিল তার। সব বাধা উপেক্ষা করেই তিনি মাতৃভাষার চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছেন এবং সব ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন।

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন : লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।