ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকবে সরকার : ওবায়দুল কাদের

আগের সংবাদ

সরকারের অব্যবস্থাপনায় চকবাজারে অগ্নিকাণ্ড: মির্জা ফখরুল

পরের সংবাদ

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল :

তুরাগ একটি খালের নাম!

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯ , ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯ , ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ

মিরপুরে তুরাগ তীরে গোড়ান চটবাড়ী এলাকার বিশাল একটি অংশ দখল করে আছে রেডিমিক্স কোম্পানি -ভোরের কাগজ
সীমানা পিলার মাটিচাপা দিয়েছে প্রভাবশালীরা

তুরাগ নদের দখলদারদের তালিকার শীর্ষে রয়েছে বেশ কয়েকটি রেডিমিক্স কোম্পানি (কংক্রিট মেশানোর কারখানা)। এ ছাড়াও ৪৩টি ছোট-বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ৪০টি বালু মহাল ও শতাধিক ব্যক্তির দখলের থাবা পড়েছে এ নদের ওপর। দখলদাররা মূল নদের ১৫০ থেকে ২০০ ফুট ভেতরে প্রবেশ করেছে। বেশকিছু স্থানে সরকার কর্তৃক স্থাপিত সীমানা পিলার নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগ। ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করতেই উচ্চ আদালতের রায় অনুসরণ না করে সীমানা খুঁটি বসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে সরকারিভাবে চিহ্নিত অংশটুকু দখলমুক্ত থাকলেও বর্তমানে তুরাগ নদটি পরিণত হয়েছে খালে। এর পরও অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সীমানা পিলারসহ মাটি ভরাট করে গড়ে তুলেছে নিজেদের স্থাপনা। দৃশ্যমান থাকা এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি নদ-নদী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, তুরাগ দখলে শীর্ষে রয়েছে মীর আক্তার সিমেন্ট রেডিমিক্স কারখানা, এনডিই রেডিমিক্স, ক্রাউন সিমেন্ট রেডিমিক্স কারখানা, টাইগার রেজিস্ট্রেশন ওয়ার্ল্ড, রেজা কন্সস্ট্রাকশন, সোনার বাংলা স্টোন ক্রাশার, শারফিন ট্রেডিং সিন্ডিকেট, মির্জা মৎস্য খামার, ডোমইনো ও জারা নিট কম্পোজিটসহ বেশকিছু বড় প্রতিষ্ঠান। যারা তুরাগের অংশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এ ছাড়া সমবায় সমিতি, ছোট মার্কেট, মাছের খামার,

ধর্মীয়, শিক্ষা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশও রয়েছে। নদের সীমানার ২শ গজের মধ্যে কোনো স্থাপনা তৈরি না করার নিয়ম থাকলেও তীরে অসংখ্য কারখানাসহ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ উচ্চ আদালত ২০০৯ সালের ২৫ জুন সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) পদ্ধতি অনুসারে সীমানা খুঁটি বসানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। ফলে সরকারের চিহ্নিত করার কাজটিও দখলদারদের অনুক‚লে গেছে।
ক/১৬৭ বাগবাড়ী, মিরপুর দ্বিগুণ মৌজার সিএস ও এসএ দাগ নং ৬৭ ও ৯১৪ এবং আর এস ৭১ ও ১০০১ দাগে রয়েছে মীর আক্তার রেডিমিক্স কারখানা। বিশাল আকৃতির এ প্রতিষ্ঠানটি তুরাগের প্রায় ৫০ ফুট দখল করেছে। প্রায় ৪ বছর আগে এ কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। তবে তুরাগের জায়গা দখলের বিষয়টি অস্বীকার করেন মীর আক্তার রেডিমিক্স কারখানার প্রকৌশলী আব্দুল মতিন। তিনি বলেন, আমরা কারখানা করার সময় কিছুটা নদীর জমি ভরাট ছিল। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদের চিঠি দেয়। আমরা এ চিঠি পেয়ে ভরাট অংশ কেটে উঠিয়ে ফেলেছি।
ওই প্রতিষ্ঠানের পাশেই মির্জা মৎস্য খামার নামে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এ খামারের পক্ষ থেকে মাটি ফেলে একটি মৎস্য খামার তৈরি করা হয়েছে। যা পুরোটাই হয়েছে সীমানা পিলারের ভেতরে অর্থাৎ তুরাগের অংশে।
আশুলিয়া এলাকার রুস্তমপুরে রেজা কন্সস্ট্রাকশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান কারখানা নির্মাণ করেছে। এ প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণের সময়ই তুরাগ নদের সীমানার ৫টি পিলার উঠিয়ে প্রায় ২০ ফুট দখল করে নেয়। পরে মাটি ভরাট করে তারা স্থায়ীভাবে বড় আকৃতির দেয়াল নির্মাণ করেছে। এখান থেকে একটু সামনে যেতেই নদের পিলারের ভেতরে আরো ৩০ ফুট দখল করে রেখেছে টাইগার রেজিস্ট্রেশন ওয়ার্ল্ড নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। রুস্তমপুরেই সোনার বাংলা স্টোন ক্রাশার নামে আরেকটি কারখানা প্রায় ১০টি পিলার ভেঙে ৫০ ফুট জায়গা দখল করেছে। কয়েক বছর আগে স্থাপন হওয়া এ কারখানাটির অংশে এসে স্পষ্ট বোঝা যায় তুরাগ দখলের চিত্র। এর পাশেই শারফিন ট্রেডিং সিন্ডিকেট নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ২০টি সীমানা পিলার ভেঙে তুরাগের ৪০ ফুট দখল করেছে।
সাভারের বিরুলিয়া এলাকায় তুরাগের একাংশ দখল করে গড়ে উঠেছে ক্রাউন সিমেন্টের রেডিমিক্স কারখানা। এ ছাড়া এনডিই রেডিমিক্স প্রা. লি. নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান তুরাগের প্রায় ৫০ ফুট অংশ দখলে রেখেছে। প্রায় দুই বছর আগে স্থাপিত এ কারখানাটি সরকার নির্মিত ২০টি সীমানা মাটিচাপা দিয়েছে। এ ব্যাপারে এনডিই রেডিমিক্স কারখানার ডেপুটি ম্যানেজার মারুফ হাসান বলেন, আমি অল্পদিন হলো চাকরিতে এসেছি। এ তাই দখলের বিষয় আমার জানা নেই।
টঙ্গী অংশে তুরাগের বুকে বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ করেছে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তুরাগ থানার তালতলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সেতুর পশ্চিম পাশে নদ দখল করে রেডিমিক্স কারখানা তৈরি করেছে ডোমইনো কনক্রিট নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ডোমইনোর উত্তর অংশে বাউন্ডারির ভেতরেই তুরাগ নদের কয়েকটি সীমানা খুঁটি দেখা গেছে। কারখানার পশ্চিম পাশেও ভরাট করা হয়েছে। তুরাগ থানার ভাটুলিয়ায় আবদুল্লাহপুর-আশুলিয়া সড়কসংলগ্ন এলাকায় আনুমানিক ১শ ফুট দখল করা হয়েছে। এখানে প্রস্তাবিত মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নামে নদ ভরাট করা হয়েছে। আশুলিয়া-মিরপুর সংযোগ সড়ক থেকে পূর্ব প্রান্তে নদের বেশ কিছুটা অংশ ভরাট করেছে সিমরান কম্পোজিট লিমিটেড ও জারা নিট কম্পোজিট লিমিটেড নামে দুটি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া দিয়াবাড়ী বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে আশুলিয়া হয়ে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০ জন দখলদার পাওয়া গেছে যারা ড্রেজারের মাধ্যমে তুরাগ থেকে বালু উত্তোলন করে ব্যবসা করছে।
ভ‚মি মন্ত্রণালয়ের এক তদন্ত প্রতিবেদনে নদী দখলকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। নদীর সীমানা পিলার বসানোর ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা মানা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া কাউন্দিয়া মৌজায় ১৫০ থেকে ১৭০ ফুট অভ্যন্তরে ও ভাটুলিয়া মৌজায় নদের ৮০ থেকে ১০০ ফুট ভেতরে সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়েছে। দখলদারদের জন্য সংকুচিত হওয়ায় বিরুলিয়া এলাকায় তুরাগে পাশাপাশি একাধিক নৌযান চলারও সুযোগ নেই বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।
পোর্ট রুলস, ১৯৬৬-এর বিধান অনুযায়ী, সীমানা পিলার থেকে ১৫০ ফুট উপরের তীরভ‚মি নদীবন্দরের সীমানাভুক্ত। এ ১৫০ ফুট সীমানায় ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি থাকলেও সেখানে অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে বন্দর সংরক্ষকের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই তুরাগ তীরে স্থাপন করা হয়েছে অসংখ্য কারখানা। বর্তমানেও বেশকিছু স্থাপনা নির্মাণাধীন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়