কাগজের দিনকাল ও আমাদের পড়ালেখা

আগের সংবাদ

টেলিটক দিয়ে শুরু হবে ফাইভ-জি: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী

পরের সংবাদ

তুমি যাবে ভাই আমাদের ছোট গাঁয়?

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯ , ১০:১৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯, ১০:২১ অপরাহ্ণ

গ্রামের বাড়িতে আমাদের পাশের বাড়ির হেনাদের পরিবারের সঙ্গে ছিল আমাদের দারুণ ভাব। হেনাদের হাঁড়ির খবর রাখতেন আমার মা। তবে মাঝেমধ্যে ঝগড়াও কম হতো না। কিন্তু তারপরও কোথায় যেন ছিল সাথ সাথ চলার একটি বন্ধন। আমরা কখনও সেই বন্ধনকে ছিঁড়ে যেতে পারিনি।

পিছনে ফিরে তাকানোর মধ্যে আধুনিকতা নেই। আধুনিক মানেই আগামী। আজকের পিঠে দাঁড়িয়ে যে আগামীকাল ভাবতে পারে সে-ই আধুনিক। আর গতকাল নিয়ে যে আঁকড়ে থাকে তাকে বলা যেতে পারে ট্র্যাডিশনাল। আধুনিক আর ট্র্যাডিশনাল নিয়ে তো দ্বন্দ্ব আছেই, থাকবেও চিরকাল।

কে বেশি সত্য তা জানি না। তবে পরিবর্তনের মাঝ থেকে যে নতুন কিছু বেরিয়ে আসতে পারে তা আমি বিশ্বাস করি। সেই নতুন কিছুর নাম যদি আধুনিকতা হয়, তাও তো স্বীকার করে নিতেই হবে। পরিবর্তন, পরিবর্ধন এসব তো চলমান পদ্ধতির নাম। তবে এর সঙ্গে আরো একটি বিষয় মেনে নিতে পারলে আমাদেরই উপকার হবে বেশি। ট্রায়াল এন্ড ফাইন্ডিং।

আমরা পরিবর্তনকে মেনে নিয়েই তার বাস্তব অবস্থাকে ট্রায়ালের মাধ্যমে বুঝে নিতে পারি তা কতটুকু আমাদের জন্য মঙ্গলময়। সব পরিবর্তন শুভ হবে, সব আধুনিকতা গ্রহণযোগ্য হবে এমন গ্যারান্টি কে দিতে পারে। তাই ট্রায়াল এবং ফাইন্ডিং দিতে পারে আমাদের চলার পথে সঠিক দিকনির্দেশনা। অর্থাৎ বিচার-বিশ্লেষণ করে নিয়েই আমাদের আধুনিকতাকে বেছে নিতে হবে। যা-ই আসছে তার নাম আধুনিকতা হলেও তা আমাদের জন্য শুভ বার্তা না-ও নিয়ে আসতে পারে।

সব কিছুকেই আধুনিক রূপ দিতে আমাদের থাকে প্রাণপণ প্রচেষ্টা। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে আমরা কৃষিতে হয়েছি উন্নত। কল-কারখানায় এসেছে আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং বৃদ্ধি পেয়েছে উৎপাদন ক্ষমতা। আধুনিকতার এমন উদাহরণ তো আমাদের চারপাশে সবসময়। তাকে কে পারবে অস্বীকার করতে? সে তো অমোঘ সত্য।

এমন আধুনিকতার ছোঁয়া না পেলে আমরা আজও হয়তো উড়োজাহাজ চালাতে পারতাম না, মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারতাম না। বিজ্ঞান এমন আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে উন্নত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

আধুনিকতার এমন সুফলের বর্ণনা তো সর্বত্রই বিরাজিত। তাকে অস্বীকার করে এমন মিথ্যাবাদী কে হতে যাবে। কিন্তু এমন সহজ পাটিগণিতের ধারায় সবকিছু হয়ে গেলে তো কথাই থাকতো না। সব সময় তা হয়ও না।

গ্রামের বাড়িতে আমাদের পাশের বাড়ির হেনাদের পরিবারের সঙ্গে ছিল আমাদের দারুণ ভাব। হেনাদের হাঁড়ির খবর রাখতেন আমার মা। তবে মাঝেমধ্যে ঝগড়াও কম হতো না। কিন্তু তারপরও কোথায় যেন ছিল সাথ সাথ চলার একটি বন্ধন। আমরা কখনও সেই বন্ধনকে ছিঁড়ে যেতে পারিনি।

হেনা তখনও বড় হয়ে ওঠেনি; কিন্তু এই অল্প বয়সেই হেনার ওপর চোখ পড়েছিল পাড়ার দু’একটি বখাটে ছেলের। হেনাও কি কম গিয়েছে? মাঝে মাঝে চোরা চোখে দেখে নিত হেনা কাউকে। তবে গ্রামের বাড়ি তো! গ্রামের বাইরে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। গ্রামের মধ্যে যেখানেই যেতো হেনা, গ্রামের কেউ না কেউ তাকে দেখতে পেতোই।

অন্যদিকে, আমাদের বাড়ির লোকের ছিল শাণিত চোখ। হেনার দিকে তাকানোর জো কি ওসব বখাটে ছেলেদের আছে! তার আগেই আমাদের বাড়ির কিংবা তাদের বাড়ির কিংবা পাশের বাড়ির কেউ না কেউ তা দেখে ফেলবেই। তাই তো হেনা একটু-আধটু ইচ্ছা থাকতেও চোখ তুলে তাকাতে পারেনি কোনো দিন।

সেই হেনার যখন বিয়ে হলো সৌদি আরবে চাকরিরত বরের সঙ্গে, তখন তো হেনা মহাখুশি। বিয়ের পর সৌদি আরবে বসবাসরত স্বামী হেনাকে ঢাকা শহরে ঘর ভাড়া করে দিল। হেনা একাই থাকে, সঙ্গে থাকে তার এক দেবর। দেবর তার বাসায় থেকেই কলেজের পড়া পড়ছে। ছুটা কাজের বুয়া থাকে বিকেল অবধি।

তারপর হেনা সব সময়ই প্রায় একা। কখনও কখনও রিকশা করে হেনা বেড়িয়ে পড়ে ঘরের বাইরে। কেউ নেই তাকে বাধা দিতে। কেউ নেই তাকে চোখে চোখে রাখতে। এক বছর পরই হেনার স্বামীর দেশে ফেরার কথা। এবার মাস দুয়েক থাকবে সে দেশে। স্বামী ঠিক সময়ে এসে গ্রামের বাড়িতে মাকে দেখতে যাওয়ার সাধ জানাল। হেনা যেন কেন উৎসাহ পায় না আগের মতো।

শহর ছাড়তে তার কষ্ট হয়। স্বল্প পরিচিত অফিসে চাকরি করা জলিলকে সব সময় দেখতে ইচ্ছা হয় তার। হেনার স্বামীর চোখে এড়াল না বিষয়টি। সংসারে শুরু হলো অশান্তি। শহরে একাকী থাকার সাধ বুঝি হেনার যায়। হেনা রুখে দাঁড়াল। কিছুতেই সে গ্রামে শাশুড়ির সঙ্গে থাকবে না। অশান্তির মাঝেই একদিন দেবর বুঝতে পারল হেনার সঙ্গে ওই মেসে থাকা চাকরিজীবী জলিলের চলছে গভীর প্রেম। হেনাকে আর আটকানো গেল না।

একদিন লোকলজ্জার মাথা খেয়ে জলিলের সঙ্গে পালিয়ে যেতে মনস্থ করল হেনা। জলিল এতদিনে বুঝতে পারল, তার কোথায় যেন ভুল হচ্ছে। একাকী হেনাকে পেয়ে যতটা তার ভালো লাগতো, এবার বুঝি হেনার ঘর ছাড়া ও তার সঙ্গে চিরতরে থাকার কথা শুনে ততটা আর ভালো লাগল না। হেনাকে ব্যাক ফায়ারের স্বাদ নিতে হলো।

ইতোমধ্যে হেনার স্বামীও শক্ত অবস্থানে। হেনাকে আর শহরে রাখা যায় না। গ্রাম ছাড়া হেনার শহুরে জীবন খুব ভালো ফল দিতে পারল না। হেনার আধুনিক জীবন হতাশার বার্তা দিয়ে ঢেকে দিল। হেনা ফিরে গেল আবার তার ট্র্যাডিশনাল গ্রামের জীবনে। এদিকে-ওদিকে আত্মীয়, মামা-চাচা, ভাই-বোন এমন একটি চেনা পরিচয়ে হেনা আবার অভ্যস্ত হয়ে গেল।

অনেক কষ্টে হেনা আবার স্বামীর মন জয় করতে পারল। জলিলকে মন থেকে মুছে ফেলল হেনা। গ্রামের শাশুড়ি-ননদ আর পাড়া-প্রতিবেশীর মাঝে ফিরে গিয়ে হেনা আবার তার চেনা পৃথিবীর চেনা খাঁচায় বন্দি হয়ে গেল।

বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃ কোলে। চির চেনা, চির সত্য এই বাণী বারবার প্রমাণিত হয়ে আসছে যুগে যুগে। হেনার জন্য তার চেনা গ্রামই হয়তো ভালো ছিল। অচেনা শহরের জীবন ব্যবস্থায় তার অবস্থান সুখকর ছিল না। পৃথিবীর সর্বত্রই এমন পরিস্থিতির রমরমা অবস্থান। এক দেশের ভাষা অন্য দেশের গালি।

পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের জীবন ব্যবস্থা আর বাংলাদেশের বাঙালি জীবন ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। চলাফেরা খাদ্যাভ্যাস সর্বত্রই ব্যবধানের ছড়াছড়ি। কেউ খেতে পছন্দ করে দুধ-মুড়ি আর কেউ দুধ-সিরিয়াল। কেউ স্বল্প কাপড়, কেউ-বা সারা শরীর মুড়ে রাখে কাপড় দিয়ে। কানাডাতে তখন প্রথম এসেছিলাম। সেই নব্বই সালের কথা।

দুই ছোট্ট মেয়ের হাত ধরে পাড়ি দিয়েছিলাম সাত সমুদ্র তেরো নদী। কোনো একটি দোকানে গিয়েছিলাম। দোকানি আমাদের দুই মেয়েকে দেখে বলল, তোমরা লাকি। মেয়ে পেয়ে আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করতাম সব সময়ই। কিন্তু তা তো ওই দোকানির টের পাওয়ার কথা নয়। তাই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- কেন?

সাদা দোকানি পষ্ট ভাষায় জানাল, মেয়েরা ১৮ বছর হলেই তোমাদের ছেড়ে যাবে অথবা তোমরা তাদের আলাদা করে দিতে পারবে। তারপরই তোমাদের চমৎকার স্বাধীন জীবন। ভুল শুনলাম না তো? বেশ রুষ্ট হয়েছিলাম। দোকান থেকে দ্রুত বের হয়ে এসেছিলাম। না, আমরা ঠিক ওইভাবে ভাবতে পারি না। আমাদের সমাজে মেয়ে বা ছেলে আমাদের ভার হয়ে যায় না কখনো।

বেরিয়ে আসার আগে দোকানিকে শুনিয়ে এসেছিলাম। তার প্রতিক্রিয়া জানতে আর দেরি করিনি; ভয়েই দ্রুত বেরিয়ে এসেছিলাম। তার যেন ছায়া না পড়ে আমাদের মেয়েদের ওপর। সুপষ্ট দু’টো মানুষের দু’ধরনের কালচার। আমি আঁকড়ে থাকতে চাই সন্তানকে বুকে ধরে যতদিন থাকা যায়। ওই পাশ্চাত্যের দোকানি, কোনোভাবে দায় এড়িয়ে প্রাপ্তবয়সী ছেলেমেয়েদের দূরে রাখতে চায়।

নিজের স্বাধীনতা তারা এভাবে দেখে। আমি সন্তানের মাঝে লুকিয়ে থেকে বন্দি জীবন খুঁজি। ওটা হতে পারে আধুনিকতা। তার আধুনিকতা আমাকে ছুঁয়ে যেতে পারেনি। মায়া-মমতার ট্র্যাডিশনাল চির চেনা রূপকে আমি অস্বীকার করতে পারিনি। সে হয়তো তার ডেফোডিলকে নিয়েছে, আমি আমার বকুল ফুলকে নিয়েছি।

আমার বন্ধু চক্রবর্তী টরেন্টোতে থাকেন। ছোট একটি বাড়ির ওপর তলায় থাকেন সপরিবারে। বেসমেন্ট ভাড়া দিয়ে কিছুটা অর্থ সংকুলান করেন। নতুন ভাড়াটে এসেছে। বয়স ১৮-১৯। মাকে সঙ্গে করেই এসেছে। মা-ই আসলে বাসাটা ভাড়া চায়। তবে থাকবে ছেলেটি তার ১৮-১৯ বছরের সাদা বান্ধবীকে নিয়ে। সিঙ্গেল মাদার তার মা। এতদিন ছেলেকে নিয়ে থাকতেন নিজ বাড়িতে।

ছেলে এখন বড় হয়েছে, তাই তাকে আলাদা করে দেওয়া। থাক সে তার বান্ধবীকে নিয়ে। মা চায় নিজের স্বাধীনতা। ছেলে সঙ্গে থাকলে স্বাধীনতা হরণ হচ্ছে মা’র। তাই ছেলের জন্য আলাদা বাসা। ভাড়াটা মা-ই দিবে। স্বাধীনতা ভোগের পরিবর্তে এই সামান্য ভাড়া দিতে তার আপত্তি নেই।

সারাদিন ঝগড়া করেও শাশুড়ি-বউ একসঙ্গে থাকা বাঙালি পরিবারের কাছে এমন উদাহরণ একেবারেই ভৌতিক ব্যাপার হতে পারে। বাঙালি চরিত্রের এটাই তো বিশেষত্ব। একজন বেশ্যাও তার সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। এখানে শুধু দায়িত্ব নামের বেড়ি নয়, এখানে মমতা নামের চিরবন্ধনও জড়িত থাকে।

পৃথিবীর এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের মানুষ থেকে আলাদা জীবন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত। কেউ একান্নবর্তী পরিবারের অংশ হয়ে গর্ব করে, আবার কেউ-বা সংসার ভেঙে একা ঘর বাঁধে। বাংলাদেশ, যুগোস্লাভিয়া, ইতালি, ভারতসহ বেশ কিছু দেশে আছে একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থার রমরমা ইতিহাস।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইডেন অস্ট্রেলিয়াসহ বহু দেশে আলাদা সংসারের আলাদা আমেজ, এক সঙ্গে থাকা নয়। দূর থেকে একবার দেখে আসা। তা হয়তো বিশেষ কোনো দিনে। হ্যালো বাবা, শরীর ভালো তো? এমন সমাজের লোক যদি হঠাৎ দেখে বিশোর্ধ্ব একটি শক্ত সমর্থ যুবক বা যুবতি বাবা-মা’র সঙ্গে থাকে, তবে তা তাদের কাছে দৃষ্টিকটু লাগে।

এও কি হয়? এক সঙ্গে থাকলে তো প্রাইভেসি বলে কিছু থাকে না। প্রতিটি মানুষ আলাদা, প্রত্যেকেরই প্রাইভেসি প্রয়োজন। ছাত্রজীবনের বিশেষ কিছু দিন যারা আর্থিকভাবে দাঁড়াতে পারেনি, তারা থাকতে পারে বাবা-মা’র সঙ্গে। কিন্তু অর্থ আয়ের পর একসঙ্গে থাকার নাম পরাধীনতা- প্রাইভেসির অপমৃত্যু।

সারা জীবন একসঙ্গে থাকাটা বাঙালি সমাজের কোনো পরিবারের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু দু’টোই বাস্তবতা। বিয়ে করে সন্তান নিয়েও বাঙালি ছেলে তার বাবার পরিবারেই থাকে। এটাই যেন সেখানে নিয়ম। অন্যদিকে, বয়স বাড়ার পর যুবকটি বা যুবতিটি বাবা-মাকে ছেড়ে আলাদা থাকবে এটাই তো তাদের জন্য স্বাভাবিক সমাজের প্রতিচ্ছবি। এই দুটি সমাজের একটি হলো আধুনিক সমাজ। বড় হয়ে ওঠা গাছকে কেটে ছোট করে রাখার বিধানই এখানে আধুনিকতা।

কাউকে দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই। দু’টোই বাস্তবতা। একটি সমুদ্রের এপাড়ের বাস্তবতা, আবার অন্যটি সমুদ্রের ওপাড়ের বাস্তবতা। একটিকে আধুনিক বললে অন্যটিকে ট্যাডিশনাল বলা যাবে। তবে আধুনিকতার হাতছানি বেশি। সেই হাতছানি অনেককেই নাড়া দেয়, দোলা দেয়।

কেননা সেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা আছে, সময়োপযোগী চিন্তা- চেতনার মিল আছে, চোখ বুজে ভালো লাগার হাতছানি আছে। তাইতো সহজেই সংক্রামিত করে বসে সেই সমাজের সবাইকে। যারা ভাঙে তাদের তো করেই, আবার যারা ভাঙনের শিকার হয় সেই পরিবার প্রধানরাও যেন এমনটাই চায়। দু’পক্ষেরই যেন লাভ তাতে।

একপক্ষ দায়িত্ব থেকে মুক্তি নিচ্ছে, মমতা নামের পুরাতন ধারণার হাত থেকে দূরে সরে যেতে পারছে। আবার অন্যপক্ষও এতদিন টেনে যাওয়া দায়িত্ব থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টির মতো স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করছে। কেউ কারও পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না, কেউ কারও পথের রাস্তাটিকে সরু করে দিচ্ছে না। যেন সব খুশি। তাই তো সেখানে কষ্ট নেই, বেদনা নেই।

কিন্তু কোলকাতার বেগুনবাড়ি কিংবা ঢাকার কায়াতটুলি কোথাও এমনটা হওয়ার জো নেই। এক সঙ্গে, পাশে পাশে। এখানে দুঃখ আছে, কষ্ট আছে; আবার হাসি আছে, আনন্দ আছে। বুড়ো মানুষটি এখানে বৃদ্ধাশ্রমে থাকে না, বরং নাতির সঙ্গে খেলে খেলেই সকাল-সন্ধ্যা কাটায়। ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু ব্যতিক্রমের বাইরে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছরের লালিত একান্নবর্তী সংসার ব্যবস্থা।

এখানে অসুস্থ দাদুকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য শুধু একটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সই থাকে না, থাকে অসংখ্য হাত, অসংখ্য কাঁধ। এখানে আধুনিকতার তীব্র রশ্মি যেন ট্র্যাডিশনের শক্ত বলয় ছেদ করে ভিতরে ঢুকতে পারছে না। তবে এখানেও আধুনিকতার শক্ত হাতের হাতছানি আছে। তারপরও টিকে আছে এমন সমাজ ব্যবস্থা হাজার বছর ধরে।

অনেকদিন হলো কানাডাতে এসেছে। ও আমার ছোট ভাই তুল্য। বাংলাদেশের ঢাকার যে অঞ্চলে আমার জন্ম, সেই থানার ছেলে। তাই যোগাযোগটা একটু বেশি। হাঁকে-ডাকে আমাদের কাছে চায়। তারই মেয়ের জন্মদিনে গিয়ে মেয়েকে দেখতে পাইনি বলে আফসোস করছিলাম। জানালো, এখনই ফিরে আসবে। ওর কানাডিয়ান বন্ধুদের নিয়ে আর্লি ডিনার করতে গেছে।

আমাকে পেয়েই সে অভিযোগ দিয়ে বসল। মেয়ের সঙ্গে ছয়জন বান্ধবী ও চারজন বন্ধু। এই দশ জনের ডিনারের পয়সা তাকে দিতে হয়নি। জন্মদিনে তার বন্ধুরা কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসবে; কিন্তু খাবারের পয়সা যাবে যার যার পকেট থেকে। সিস্টেমটা সে মেনে নিতে পারেনি।

কিন্তু শত জোর করেও রেস্টুরেন্টের খরচের অর্থটি তার মেয়েকে দিতে পারেনি। এখানে সিস্টেম যে এমনই। অভিযোগ দায়ের করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষটি কিছুতেই এ ব্যবস্থাকে সুস্থ হিসেবে মেনে নিতে পারছে না। তবে এখানে ওসব ইমোশনাল সেন্টিমেন্টের তেমন কোনো মূল্য নেই। ওরা অভ্যস্ত এভাবেই।

ফ্রান্সের প্যারিসে গিয়েছিলাম ছোট মেয়ের এমবিএর কনভোকেশনে। প্যারিস শহরের আইফেল টাওয়ারের কাছাকাছি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে সে থাকত। সেখানেই কাটালাম ১০-১২ দিন। ট্যুরিস্ট এরিয়া হওয়ায় আশপাশে রেস্তোরাঁয় ঠাসা। এই ভবনের নিচ তলায় একটি পিৎজার দোকান।

একদিন সিদ্ধান্ত হলো, নিচের দোকান থেকে পিৎজা নিয়ে আইফেল টাওয়ারের সামনে বসে পিকনিক স্টাইলে দুপুরের খাবার খাবো। নিচে গিয়ে অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছি, এমন সময় ক্যাশিয়ার ছেলেটি সামনে এগিয়ে এসে সোজাসুজি বাংলায় জানতে চাইল, আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি কিনা? আমার এবং আমার মেয়ের বাংলা কথাবার্তা শুনে সে বুঝে নিয়েছে আমরা বাঙালি।

সিলেট থেকে দশ বছর আগে এসে পিৎজার দোকানে কাজ করছিল সালমান। কখনও পিৎজা তৈরি করে, আবার কখনও ক্যাশে বসে। যাই হোক, ভাব বিনিময়ের পর যখন পিৎজা নেওয়ার সময় হলো তখন আমি কিছুতেই পিৎজার দাম দিতে পারলাম না। সালমান জানালো, আজ আমার পক্ষ থেকে আঙ্কেল।

পনের ইউরোর পিৎজা ফ্রি দিতে পারে স্বল্প পরিচিত একজন বাঙালিকে, এমন বোকা মানুষ তো বাংলাদেশ থেকেই যাবে। এখানেই বাঙালির আর একটি চরিত্র। কোনোভাবেই এটাকে অন্য কোনো দেশের মানুষের সঙ্গে মিলানো যাবে না। আমি শত চেষ্টা করেও সে দিন সালমানকে টাকা দিতে পারিনি।

সালমানকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে সেদিনের জন্য ফ্রিতেই পিৎজা খেয়ে নিয়েছিলাম। সালমান এরপর আমাকে আরও দু’একবার দেখেছে। এমন স্বল্প পরিচিত লোককে বিনামূল্যে পিৎজা দেওয়ার মানুষটি প্যারিসের মতো কঠিন শহরে থেকেও বাঙালির চিরায়ত আতিথেয়তার মানসিকতাটি সালমান হয়তো আজও ছাড়তে পারেনি।

ঢাকা শহরে আজ উন্নত জাতের ফল, উন্নত মাছ এবং উন্নত পদ্ধতিতে অধিক ফলনকৃত শাক-সবজির ছড়াছড়ি। দামও ধরাছোঁয়ার মধ্যে। কিন্তু তারপরও ক্রেতার মুখে কষ্টের ছবি দেখি। স্বাদটি ঠিক আগের মতো নয়। ফলন আধুনিক, ফলন বেশি- কিন্তু স্বাদটি কম।

সেই পুরনো স্বাদের আশায় অনেকেই নিজ বাড়ির আঙিনায় অধিক ফলনের সার না দিয়ে একেবারেই ন্যাচারাল পদ্ধতিতে শাক-সবজি পাওয়ার চেষ্টা করছে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের বাজারেও আজ দেখা যায় অধিক ফলনের শাক-সবজির পাশে ন্যাচারালভাবে উৎপাদিত অর্গানিক সবজির আগমন। আধুনিকতার পাশে ট্র্যাডিশনের সহাবস্থান। কিন্তু একসঙ্গে চলছে না; তারা পাশাপাশি হাঁটছে।

বাঙালি আজ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এমন কোনো দেশ নেই যেখানে বাঙালি ঘর বাঁধেনি। এখানে আধুনিকতার সুযোগে কেউ কেউ ওই দেশের সমাজের সঙ্গে মিশে যেতে চেষ্টা করছে। আবার কেউ কেউ নিজের ভাবধারায় থেকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে।

বাঙালির জীবন ব্যবস্থা, বাঙালির খাবার ব্যবস্থা কিছুটা হলেও আলাদা অন্য একটি সমাজের লোকদের থেকে। বাঙালি মাছ খাবে, সবজি খাবে, ডাল খাবে এবং তেলে-ঝোলে রান্না করবে। বাংলাদেশের বাঙালি আর আমেরিকার বাঙালির মধ্যে এখানে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু আমেরিকার একটি পরিবার তো এভাবে পারবে না।

তারা বারবিকিউ করবে, সামান্য ফ্রাই করবে এবং তেলে-ঝোলে কিছুই খাবে না। বাঙালি রাত হলে পরিবারের লোকদের মাঝে গোল হয়ে বসে টিভি দেখবে। আর অন্যরা রাত হওয়া মানেই পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার সময়। ক্লাবে যাবে, মদ খাবে, নৃত্য করবে এবং তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরবে ঘুমাতে।

এমন ব্যবধান খালি চোখেও দেখা যায়, আবার ভিতরের চোখ দিয়েও দেখা যায়। ওরা আধুনিক, আর বাঙালির পুরনো ভাবধারা আধুনিক নয়। বাঙালির সন্তানরা বাংলাদেশ ছেড়ে এসে আধুনিক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। হাতছানি যে সেখানে অনেক বেশি। আধুনিক হয়েও পড়ে অনেকে। চলনে-বলনে আর আলাদা থাকতে চায় না তারা।

এদেশে এসে ঠিক যেন এদেশের মতোই থাকতে চায়। অনেকে হয়েও ওঠে অনেকটা। মিশে যায় মূল সমাজের মূল ধারায়। তখন তাদের পরিবারের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আধুনিকতা আর ট্র্যাডিশনের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব যুগ যুগ ধরে চলে আসছে সারা পৃথিবীতে। আজ যা আধুনিক আবার কাল হয়ে যাবে তা ট্র্যাডিশন।

তখন ভবিষ্যতের নতুন আধুনিকতার সঙ্গে আজকের আধুনিকতার নতুন দ্বন্দ্ব। এমনই চলছে পৃথিবীর জন্মের পর থেকে। তবে নতুন সংঘাত শুরু হয়েছে যখন পৃথিবীর মানুষ মাইগ্রেশনের শিকার হয়েছে। মাইগ্রেশন একটি বিতর্কিত বিষয়। এটি সমাজের জন্য কতটুকু ভালো কিংবা কতটুকু মন্দ তা আজ পর্যন্ত স্থির করে কেউ বলতে পারেনি।

তবে পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে মাইগ্রেশন পদ্ধতি চলে এলেও বর্তমান পৃথিবীতে মাইগ্রেশন একটি শক্তিশালী মাধ্যম। পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষ আজ অন্য সকল প্রান্তে ছড়িয়ে গিয়ে নতুন পৃথিবী গড়ে তুলছে। পৃথিবী আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্লোবাল ভিলেজ। শীতের পাখিরা শুধু শীতকালেই মাইগ্রেশন নিয়ে অন্য দেশে যায়। পাখিদের গোবাল ভিলেজ শুধু নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য।

কিন্তু মানুষের মাইগ্রেশন সর্বত্র এবং সব সময়ের জন্য। জন্ম নেওয়া দেশটি ছেড়ে অধিক আয় কিংবা শান্তির তাগিদায় কিংবা নিছক নতুন দেশের সান্নিধ্যে আসার বিবেচনায় মানুষ ঘর ছাড়ছে এবং অন্য ঘরকে নিজের ঘর করে নিচ্ছে। মাইগ্রেশনের দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর অস্ট্রেলিয়া তো মাল্টি কালচারের স্বর্গভূমিতে পরিণত হয়েছে।

শত দেশের শত রকমের মানুষ এক সঙ্গে মিলিত হয়েছে এসব দেশে। আর সেখানেই শুধু ওই পুরাতন দ্বন্দ্বের, আধুনিকতার সঙ্গে ট্র্যাডিশনের। একদল মানুষ তার ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিতে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় এবং অন্যদল যে দেশে এসেছে তার মূল ধারার সংস্কৃতিতে অবগাহন করতে চায়। বাঙালি যদি বাংলাদেশে কিংবা ভারতেই থাকতে পারতো, তবে তো বাঙালির চিন্তাধারার কিংবা ভাবধারার কোনো পরিবর্তন আসার সুযোগ থাকতো না।

তার তেমন আধুনিকতা হতো তার নিজস্ব আধুনিকতা। কিন্তু বাঙালি যখন বিশ্ব দরবারে ছড়িয়ে পড়ল, তখনই শুরু হলো একটি শংকর পদ্ধতির আধুনিকতা। বাঙালি তখন বাঙালির আধুনিকতা নেবে, না আমেরিকার আধুনিকতা নেবে সেই দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেল। কেউ হয়ে গেল আমেরিকান, আর কেউ রয়ে গেল সেই আগের জায়গায়- যেখানে বাঙালিপনার অহমিকা বিদ্যমান। বেশি আধুনিক হতে গিয়ে জীবন সাথীও বেছে নিল ভিন্ন সমাজের অন্যরকম আধুনিক কোনো মানুষকে।

কারও হয়তো কিছুদিন ভালো কাটলো, কিন্তু একটি সংঘাতময় অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দু’জনের আধুনিকতার যেখানে মূল পার্থক্য সেই সূক্ষ্ম জায়গাটিতে দ্বন্দ্ব রয়েই গেল। সাদা চোখে যাকে দেখা গেল না। কিন্তু বিশেষ দিনের কোনো বিশেষ সুযোগে হয়তো সেই দ্বন্দ্ব মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। এমনটাই হচ্ছে অনেকের জন্য, অনেক দিনের ইতিহাসে।

যেখানে সুখ আছে, শান্তি আছে, অর্থ আছে কিন্তু তারপরও কি যেন নেই! এখানেই আধুনিকতা আর ট্র্যাডিশনের চির দ্বন্দ্ব, চির শত্রুতা। একটি থাকলে অন্যটি হিংসে করে, অন্যটি পালিয়ে যায়। কি মজাই না হতো যদি দু’টোই পাশাপাশি থাকতো।

কিন্তু তা হতে দেয় না বাস্তবতা নামের কঠিন সত্যটি। কিন্তু তোমার গ্রাম তোমাকে ঠিকই ডাকছে। সেই যখন তুমি গ্রাম ছেড়েছিলে তখন থেকেই ডেকে চলেছে। তুমি যেতে পারবে না, তারপরও ডেকেই চলেছে। আজও ওই ডাক- তুমি যাবে ভাই আমাদের ছোট গাঁয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা