উপ-হাইকমিশনারকে ডেকে পাল্টা প্রতিবাদ পাকিস্তানের

আগের সংবাদ

ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগকে স্বাগত জানাই: শিক্ষামন্ত্রী

পরের সংবাদ

চট্টগ্রামী উপভাষার পরিপ্রেক্ষিতে চর্যাপদ

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯ , ৫:৫৮ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯ , ৫:৫৮ অপরাহ্ণ

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা বলে দাবি করলে বিজয় চন্দ্র মজুমদার এই ব্যাপারে আপত্তি জানান। “বিজয়চন্দ্র মজুমদার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ইতিহাস বিষয়ে ১৯২০ সালে বেশ কয়েকটি বক্তৃতা প্রদান করেন। এই বক্তৃতামালার ত্রয়োদশ পর্বে তিনি চর্যাপদের ভাষা নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য ব্যক্ত করেন। পদগুলোর ছন্দ-রীতি ও ব্যাকরণ বৈশিষ্ট্যের বিচারে এগুলোর কয়েকটিকে হিন্দি ভাষায় রচিত বলে তিনি রায় দিলেও পদগুলোর মধ্যে বিভিন্ন সময়ের, বিভিন্ন ভাষার শব্দ ও ব্যাকরণ বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতির কারণে এগুলোকে বিশেষ কোনো একটি ভাষায় রচিত বলে মানতে রাজি নন।… বিজয়চন্দ্র মজুমদার চর্যার ভাষায় হিন্দি বৈশিষ্ট্য ও উড়িয়া প্রাধান্যের কথা বললেও এবং এই ভাষাকে সংকর ভাষারূপে বিবেচনা করলেও বাংলার দাবি একেবারেই অস্বীকার করেননি।” অসমীয়া পণ্ডিত বাণীকান্ত কাকতী তার Assamse, its fermati and Development বইতে বৌদ্ধগণ ও দোহায় সংকলিত পুঁথিগুলোর ভাষাকে অসমীয়া বলে দাবি করেছেন।

চর্যাপদের ভাষা কি? বাংলা? বাংলা হলে বাংলার কোন অঞ্চলের উপভাষা এ প্রশ্ন, এ মতপার্থক্য আমরা দেখতে পাই। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, চর্যাপদের ভাষা বহু অসমীয়া। ভাষা বিচারে দেখা যায় চর্যার পদকর্তারা সবাই একই অঞ্চলের নন, কেউ কেউ উড়িয়া, বেশির ভাগ বাংলার, কয়েকজন পূর্ববঙ্গের, পূর্ববঙ্গের যারা, তাদের বেশির ভাগ চট্টগ্রামের- এ অনুমানের যথেষ্ট কারণ আছে।

এ বিতর্কের যখন এখনো অবসান হয়নি, চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা বলা যায় কিনা? সেখানে এ প্রবন্ধ কিছুটা ইঙ্গিত জোগাবে যে, চর্যাপদকে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত, যদি আমরা এ প্রবন্ধের আলোকে দেখি যে, চর্যাপদের অনেকগুলো শব্দ এখনো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বুলি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কথা সত্য প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাষা দ্রুত পরিবর্তন হয় না।

পদকর্তারা চর্যাগীতির মাঝে বা শেষে যে ভণিতা দিয়েছেন, সে হিসাব করলে চব্বিশজন পদকর্তার নাম পাওয়া যায়। এরা সবাই ছিলেন বৌদ্ধ। চৌরাশি সিদ্ধার অন্তর্গত। এদের মধ্যে লুই, কুক্কুরী, বিরুআ, ডোম্বী, কবর, ধাম, জপনন্দি এরা সবাই নিঃসন্দেহে বাঙালি। এ ছাড়া শুধু ভাষা বিচার করলে আরো কয়েকজনকে বাঙালি ধরে নিতে হয়।

একইভাবে কয়েকজন যে বাঙালি ছিলেন না এও সত্য। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে শান্তিপা মৈথিলী এবং আর্যদের উড়িয়া হতে পারেন, অন্য সকল পদকর্তার ভাষা বাংলা। ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় এবং ড. সুকুমার সেনও দাবি করেছেন চর্যাপদ বাংলারই প্রাচীন ভাষা।

তবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বীকার করেছেন চর্যাপদের ওপর অসমীয়দের দাবিও যৌক্তিক। কারণ ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলা ও অসমীয়া ভাষার মধ্যে বিশেষ পার্থক্য ছিল না। তাই চর্যার ভাষাকে বঙ্গকামরূপী ভাষা বলাই সঙ্গত। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে চর্যার পদকর্তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন বৃহত্তর চট্টগ্রামের।

তবে তারা চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা বা জন্মসূত্রে চট্টগ্রামের নাকি চট্টগ্রামে আগমন করেন বা অস্থায়ী বসবাস করতেন বা ধর্ম সাধনা করতেন, সে আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়, আলোচ্য বিষয় তাদের গীতিতে চট্টগ্রামের শব্দ নিয়ে। এখন আমরা অনুসন্ধান করে দেখি চট্টগ্রামের কি কি শব্দ চর্যাগীতিকায় পাচ্ছি বা চর্যাগীতির কি কি শব্দ আঞ্চলিক চট্টগ্রামের ভাষায় ব্যবহৃত হচ্ছে?

 

চর্যা নং-৩
এ এক সে শুণ্ডিনী দুই ঘরে সান্ধই।
চীঅণ বাকলত বারুণী বান্ধাই
পৃ-১ (বিরুবাপাদানাম)
আধুনিক বাংলায়- এক সে শুড়িনী দু ঘরে ঢোকে। চিকন বাকল দিয়ে সে বারুণী মদ চোলাই করে।
শব্দের ব্যুৎপত্তি- চীঅণ < চিক্কণ < চিকন। চীঅণ শব্দ দিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য। দেহি খুব চিঅণ মনে অর। শুদ্ধ বাংলায়- দেখে খুব চিকন মনে হচ্ছে।

 

চর্যা নং ৩-এ-
দশমি দুআরত চিহ্ন দেখিয়া।
আইল গরাহক আপনে বহি আ ॥ (বিরুবাপাদানাম)
আধুনিক বাংলায়- দশম দ্বারে চিহ্ন দেখে, খদ্দের নিজেই (পথ) বেয়ে এল, দুআরত শব্দের ব্যুৎপত্তি- দ্বার > দু আর। দু আর + ত (অধিকরণে)
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য- দুআরত ঠেলা দিঅ (শুদ্ধ বাংলায়- দুয়ারে ধাক্কা দাও)

 

চর্যা নং ৬-এ-
কাহেরে যিনি মেলি আছহু কীস।
বেঢ়িল হাক পড়ই চৌদীস ॥ (ভুসুকুপাদানাম)
আধুনিক বাংলায়- কাকে নিয়ে বা কাকে ছেড়ে কেমন করে আছি। চারপাশ ঘিরে হাঁক পড়ে। মেলি শব্দের ব্যুৎপত্তি – মেলি > ছাড়িয়া মেল (পরিত্যাগ করা অর্থে) + ই অথবা মীল + ই > মিলি, মেলি।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য – দুআর খান মেলি দঅ। (শুদ্ধ বাংলা- দরজাটা খুলে দাও)

 

চর্যা নং ৭-এ
জে জে আইলা তে তে গেলা।
অবণাগবণে কাহ্ন নিঅড়ি বিমনা ভইলা ॥ (কাহ্নপাদানাম)
আধুনিক বাংলায় যারা যারা এল, তারা তারা গেল, আনাগোনা দেখে কানু দুঃখিত হলো।
শব্দের ব্যুৎপত্তি – আইলা > আগত > আঅ + ইল্ল > আইল্লা > আইল + আ।
গেল- গত > গঅ + ইল্লা > গইল্ল > গেল + আ। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য- আইলা কিল্লাই, গেলা কিল্লাই? শুদ্ধ বাংলায়- এসেছ কেন? গিয়েছ কেন?

 

চর্যা নং ৮-এ-
খুন্টি উপাড়ী মেলিলি কাছি।
বাহ তু কামলি সদগুরু পূছি ॥ (কম্বলাস্বরপাদানাম)
আধুনিক বাংলায় খুঁটি উপড়িয়ে কাছি মেলে দিয়ে (হে) কামলি, তুমি সদগুরুকে জিজ্ঞাসা করে বেয়ে চল। কাছি শব্দের ব্যুৎপত্তি – কাছি – কাচ্ছিকা মোটা দড়ি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য – লসি (রসী) কাছি কিছু ঘরত নাই? শুদ্ধ বাংলা রশি দড়ি ঘরে নাই?

 

চর্যা নং-৯-এ-
জিম জিম করিআ করিণিরে রিসই।
তিম তিম তথতা মঅগল বরিসই ॥ (কাহ্নপাদানাম)
আধুনিক বাংলায়- হস্তী যেমন যেমন হস্তিনীকে ঈর্ষা করে মদকল (অর্থাৎ খাদে পতিত হস্তি) তথতা বর্ষণ করে। শব্দের ব্যুৎপত্তি- রিসই ঈর্ষা (আসক্ত অর্থে) রিস + ই (প্রথম পুরুষ এক বচনে) চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য রিসই লাভ নাই। শুদ্ধ বাংলায় ঈর্ষা করে লাভ নেই।

 

চর্যা নং-১৪-এ-
পাঞ্চ কেডুআল পড়ন্তে মাঙ্গে পীঠত কাছি বান্দী।
গঅন দুখোলে সিঞ্চহু পাণী ন পইসই সান্ধি ॥
আধুনিক বাংলায়- নৌকার গলুইয়ে পাঁচটি ফেলে পিঠে কাছি বেঁধে গগন সেঁউতি দ্বারা জল সেচক কর। (যেন কোন) জোড়ার ফাঁকে (জল) প্রবেশ না করে। পীঠত শব্দের বুৎপত্তি- পীঠত- পৃষ্ঠ > পীঠ + ত (৭মী) চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য- বস্তা পীঠত দড়ি কাছি দি বান্ধি লঅ। শুদ্ধ বাংলায় – বস্তাটা পীঠে রশি দিয়ে বেঁধে নাও।

 

চর্যাপদ ১৫-এ-
কুলে কুল মা হোহি রে মূঢ়া উজু বাট সংসারা।
বাল তিন একু বাঙ্ক ণ ভূলহ রাজ পথ কণ্টারা ॥
(শান্ত পাদানাম)
আধুনিক বাংলায় ওরে, কুলে কুলে মূঢ় ইয়ে ঘুরো না সংসার পথ সোজা। মুখ বাঁকা পথে তিল মাত্রও ভুল করো না, রাজ পথ কানাত ঘেরা। বাল শব্দের বুৎপত্তি- বাল – জ্ঞানহীন, মূর্খ (তৎসম শব্দ) চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য – বালরে বুঝান যায় (শুদ্ধ বাংলায় মূর্খকে বুঝানো যায় না)

 

চর্যাপদ নং ২৩-এ-
জীবন্তে ভইলা বিহাণি মইল রঅণি।
বিণু মাঁসে ভুসুকু পা ঘর ন পইসনি নি ॥
(ভুসুকু পাদানাম)
আধুনিক বাংলায়- সকালে জীবন্ত হলো, রাত্রে মৃত। ভুসুকু পাদ মাংস নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে না। বিহাণি শব্দের ব্যুৎপত্তি- বিহান + ই – প্রভাতে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য- বিহানি আইসসি (শুদ্ধ বাংলায় সকালে এসেছি।)

 

চর্যা নং-৩৩-এ-

বলদ বিআল গবিআ বাঁঝে।
পীঢ়া দুহি অই এ তীনি সাঝে ॥ (ঢেণ্টণপাদানাম)
আধুনিক বাংলায়- বলদ প্রসব করল, গাই বন্ধ্যা, পাত্র (ভার) দোয়ানো হলো এ তিন সন্ধ্যা (বেলা)। শব্দের ব্যুৎপত্তি- বি আল – প্রসব করিল। বেদন > বি অ ল + এল > বি আ এল। বাঁঝে – বন্ধ্যা > বাঁঝা + এ – বাঁঝে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য- বাঁঝে গাই কেনে বিআল? শুদ্ধ বাংলায়-বাঁকা গাই কিভাবে প্রসব করল?

 

চর্যা নং-৪৭-এ-
কমল কুলিশ মাঝে ভইঅ মইলী।
সমতা জোএ জলিঅ চণ্ডালী ॥ (ধামপাদানাম)
আধুনিক বাংলায়- কমল কুলিশ মাঝে মৃতা হয়ে চণ্ডালী সমতা যোগে প্রজ্বলিত হলো। মইলী শব্দের বুৎপত্তি- মইলী – মৃত + ইল (বিশেষণ) > মইল + ঈ (স্ত্রী লিঙ্গ) মৃতা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাক্য – আঁই মইলী তারপর বুঝিবি। শুদ্ধ বাংলায়- আমি মারা গেলে তারপর বুঝবে।

ব্যাকরণে ও চট্টগ্রামের ভাষার সাথে ব্যাকরণগত মিল খুঁজে পাই। যেমন নঞর্থক পদ ক্রিয়াপদের আগে বসে। যা প্রচলিত বাংলায় পরে বসে। যেমন- দুলি দুহি পীঢ়া ধরণ ন জাই। (চর্যা নং ২), জোইনি তঁই বিণু খনহি ন জীবমি (চর্যা নং ৪), দু আন্তে চিখিল মাঝেঁ ন থাহী (চর্যা নং ৫), খনহ ন ছাড়ই ভুসুক অহেরী (চর্যা নং ৬), হরিণা হরিণীর নিলয় ন জানী (চর্যা নং ৬)

চর্যাপদের সমাজচিত্রতেও দেখি নদী, অরণ্য, পাহাড়, টিলা, সমুদ্র প্রভৃতির বর্ণনা, এর সব কিছুই আমরা দেখতে পাই বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রকৃতিতে। চর্যায় আছে হরিণ শিকারের কথা। বন্য হাতির কথা। চোলাই মদের প্রসঙ্গ। আছে নৌকা, পাড়, সাঁকো ঘাট প্রভৃতির কথা।

এই বর্ণনাগুলো চট্টগ্রাম বা পার্বত্য চট্টগ্রামের চিত্রের সাথে মিলে যায়। এরপর আসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি- চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন। তার সময়কাল ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ। এর পর আসে যুগসন্ধি। তারপর আসে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ। এই সময়ের বেশির ভাগ কবির জন্ম চট্টগ্রামে। শুধু তাই নয়, বেশির ভাগ পুঁথিও আবিষ্কৃত হয় চট্টগ্রাম থেকে।

মধ্যযুগের প্রথম মুসলমান কবি হলেন শাহ মুহাম্মদ সগীর। চর্যাপদ রচিত হওয়ার দুই থেকে আড়াইশ বৎসরের মধ্যে শাহ মুহম্মদ সগীরের সময়কাল। সগীরের ইউসুফ জোলেখা কাব্যের মধ্যে চট্টগ্রামের অনেকগুলো আঞ্চলিক শব্দ পাওয়া যায়। সগীরের পর পর আবির্ভাব ঘটে মধ্যযুগের অনন্য প্রতিভাধর এক একজন কবি। যেমন- মুকাম্মিল, আফজল, আলী, সাবিরিদ খান, শ্রীকর নন্দী, দৌলত উজীর বাহরাম খান, সৈয়দ সুলতান, নওয়াজিশ খাঁ, রতিদেব, দৌলত কাজী, মরদন, কোরেশী, মাগন ঠাকুর আলাওল।

এদের দু’একজনের জন্মস্থান চট্টগ্রাম কি না, এ নিয়ে কয়েকজন পণ্ডিতের আপত্তি থাকলেও বাকি সকলের জন্ম চট্টগ্রামে। মধ্যযুগে বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির তীর্থভূমি যে চট্টগ্রামই এ কথা আজ স্বীকৃত। এটা অনুমান করার সঙ্গত কারণ আছে যে, চট্টগ্রাম তার প্রাচীন যুগের সাহিত্য চর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বা এগিয়ে নিয়েছে মধ্যযুগে।

ইতিহাসে আমরা দেখি, বাংলার শাসক পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ। পরবর্তীকালে যেন বংশের রাজারা এসে বৌদ্ধদের ওপর নির্যাতন চালায়। ‘ভারতের বুকে শঙ্করাচার্যের প্রচারে বৌদ্ধ জাতি যখন নিশ্চিহ্ন হল, চট্টলাই তখন তাকে মায়ের মত বুক পেতে দিল। তাই ভারতের বৌদ্ধ ধর্মের একটি শেষ আশ্রয় হ’ল চট্টলা।”

পদকর্তাদের কেউ কেউ যে চট্টগ্রামের তার স্বপক্ষে এটাও বলা যায় যে, নবম শতাব্দীতে চট্টগ্রাম ছিল বৌদ্ধধর্ম চর্চার অন্যতম স্থান। শুধু তাই নয় বন্দর চট্টগ্রামে বণিক আর ধর্মপ্রচারক পীর সুফিয়া যেমন সহজে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তেমনি বৌদ্ধরাও। শঙ্করাচার্যের প্রভাবে ভারতের উড়িষ্যা এবং অন্যান্য স্থানে বৌদ্ধরা যখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন নেপালের মতো চট্টগ্রামও হলো তাদের আশ্রয়স্থল। মহামুনি ও চক্রশালা তার নিদর্শন।

চট্টগ্রামে এখনো রয়েছে বৌদ্ধদের অসংখ্য কেয়াঙ। বাংলাদেশে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বেশি লোক এখনো বসবাস করে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের ভাষার বৈশিষ্ট্য এবং বিভিন্ন শব্দ ও বৌদ্ধসাধকদের আশ্রয় প্রমাণ করে যে, চর্যার পদকর্তাদের কেউ কেউ চট্টগ্রামবাসী ছিলেন।

হিন্দি, উড়িয়া, মৈথিলী, অসমীয়া, ভাষাবাসীর কেউ কেউ চর্যাদকে তাদের প্রাচীন নিদর্শন বলে দাবি করলেও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ডা. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ড. সুকুমার সেন দাবি করেছেন চর্যাপদ বাংলা ভাষারই প্রাচীন নিদর্শন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্বীকার করেছেন চর্যাপদের ভাষায় অর্বাচীন অপভ্রংশের সামান্য প্রভাব রয়েছে।

চর্যার ভাষায় অপভ্রংশের প্রভাব থাকার সঙ্গত যে দুটি কারণ আনা যায় তা হচ্ছে- “চর্যাগীতিসমূহ যে সময় রচিত হয়, সে সময় বাংলা ভাষা অপভ্রংশের মৌলিকরূপ ত্যাগ করেছে বটে কিন্তু তার সঙ্গে একেবারে সম্পর্কচ্যুত হয়নি।

ধীরে ধীরে কয়েক শতাব্দী ধরে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা যখন অপভ্রংশ থেকে নবীন আর্যভাষায় রূপান্তর লাভ করেছে তখনো তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যসমূহ আশপাশে ছিটেফোঁটা অপভ্রংশের প্রভাবও এই ভাষার ওপর থেকে গিয়েছিল। চর্যাপদের ওপর অপভ্রংশের প্রভাবের কারণ এখানেই।

দ্বিতীয়ত সে সময় সংস্কৃতের পর সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী সাহিত্যিক ভাষা ছিল অপভ্রংশ। চর্যা পদকর্তাদের অনেকে আবার অপভ্রংশে পদ রচনা করেছেন। এই কারণে তাঁদের বাংলা রচনাতেও অপভ্রংশের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।” সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর The Origin and Development of the Bangali Language গ্রন্থে চর্যাপদের ভাষা নিয়ে প্রথম ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা করেন।

এতে তিনি বলেন, চর্যাপদের ভাষার মূল কাঠামো হচ্ছে বাংলা। মৈথিলী পণ্ডিত জয়কান্ত মিশ্র দাবি করেছেন চর্যাপদ হচ্ছে মৈথিলীর একটি উপভাষা। যা ছিল টিকা-চিকি অঞ্চলের ভাষা। তার ভাষায় “The Language of the Caryapada represents a prato-Maitheli dialect of the Chika Chike area, midway between standard Maithili and standad Bengali.”

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে বাংলা বলে দাবি করলে বিজয় চন্দ্র মজুমদার এই ব্যাপারে আপত্তি জানান। “বিজয়চন্দ্র মজুমদার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ইতিহাস বিষয়ে ১৯২০ সালে বেশ কয়েকটি বক্তৃতা প্রদান করেন। এই বক্তৃতামালার ত্রয়োদশ পর্বে তিনি চর্যাপদের ভাষা নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য ব্যক্ত করেন।

পদগুলোর ছন্দ-রীতি ও ব্যাকরণ বৈশিষ্ট্যের বিচারে এগুলোর কয়েকটিকে হিন্দি ভাষায় রচিত বলে তিনি রায় দিলেও পদগুলোর মধ্যে বিভিন্ন সময়ের, বিভিন্ন ভাষার শব্দ ও ব্যাকরণ বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতির কারণে এগুলোকে বিশেষ কোনো একটি ভাষায় রচিত বলে মানতে রাজি নন।… বিজয়চন্দ্র মজুমদার চর্যার ভাষায় হিন্দি বৈশিষ্ট্য ও উড়িয়া প্রাধান্যের কথা বললেও এবং এই ভাষাকে সংকর ভাষারূপে বিবেচনা করলেও বাংলার দাবি একেবারেই অস্বীকার করেননি।”

অসমীয়া পণ্ডিত বাণীকান্ত কাকতী তার Assamse, its fermati and Development বইতে বৌদ্ধগণ ও দোহায় সংকলিত পুঁথিগুলোর ভাষাকে অসমীয়া বলে দাবি করেছেন। উড়িয়াভাষী পণ্ডিতগণও চর্যাপদের ওপর দাবি জানিয়েছেন। অতএব আমাদের সিদ্ধান্তে আসতে হয় চর্যাপদ এককভাবে পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ কোনো বাংলা, অসমীয়া, উড়িয়া, হিন্দি, মৈথিলী ভাষা নয়।

এটি বিভিন্ন অঞ্চলের চৌরাশি বৌদ্ধ সিদ্ধার ভাষা, এতে রয়েছে বিভিন্ন ভাষার শব্দ এবং এই সন্ন্যাসী চৌরাশি জনের বেশির ভাগ বাঙালি হলেও কয়েকজন ছিলেন বাংলার বাইরের। আর ভাষাবিবেচনায় বলা যায়, প্রাকৃত ভাষার অপভ্রংশ স্তরের মাগধী অপভ্রংশ থেকেই বাংলা, উড়িয়া, অসমীয়া, প্রভৃতি ভাষার সৃষ্টি।

চর্যাপদ রচনার সময়ে এই ভাষাগুলো ছিল একই পরিবারের সদস্য। আর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাও ছিল তখন সে একই পরিবারের সদস্য। যে যুক্তিতে ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’র ভাষাকে অসমীয়া ভাষা বলে দাবি করা যায়, সে যুক্তিতে চর্যাপদের ভাষার ওপর চট্টগ্রামের ভাষার দাবি মেনে নিতে হয়।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বৌদ্ধতান্ত্রিক (চর্যার পদকর্তাদের) লেখকদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন- “মহীধর বা মহিল কানুপায় শিষ্য। তিনি গুরুর সহিত চাটিগাঁয়ে গিয়াছিলেন। তাঁহাকে মগধবাসী ও শূদ্রজাতি বলা হইয়াছে। ১৬নং বৌদ্ধগান তাহার রাচিত।”

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়