নরসিংদীতে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ১, আহত ২০

আগের সংবাদ

তুমি যাবে ভাই আমাদের ছোট গাঁয়?

পরের সংবাদ

কাগজের দিনকাল ও আমাদের পড়ালেখা

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯ , ১০:০৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯, ১০:০৪ অপরাহ্ণ

শহীদ ইকবাল

শিক্ষক, সম্পাদক ও কলাম লেখক

কাগজ এখন কাদের প্রকাশ করবে? একটা সময় ছিল যখন আমরা ভোরের কাগজে প্রচুর ব্যক্তি-মানুষ পেতাম। তারা আইডল হয়ে উঠেছিলেন। সক্রিয়ও ছিলেন দর্শক ও দৃশ্যপটে। এখন কারা আসেন? সত্য কথাটি কী বলা যায়? বলতে পারেন? কিংবা কাগজ তো শুধু খবর নয়। আমাদের সংস্কৃতি গড়ে দেয়। কাহিনী গড়ে দেয়। জীবনের কাঠামো প্রস্তুত করে। প্রচুর আলোর সোনালিরূপ বিছিয়ে দেয় আমাদের মলিনতার ওপরে। এই প্রশ্নটিই বস্তুত এখন রয়ে যাচ্ছে। কাগজ- সর্বাত্মকরূপে কিছু করতে পারছে না। একটি কৃষ্টিতে পৌঁছতে পারছে না। যদি পারতো তবে বিজনেস-উগ্র প্রকাশরীতি, মিথ্যা জলুস, মিথ্যা কালো অহংকারগুলো পরাস্ত হতো। তা হয়নি। এই পরাস্ততার দায় নিতে হবে কাগজকে। একটি কাগজ যতো ক্ষীণ পরিসরেই প্রকাশিত হোক, সত্যিকারের মানুষের ও জীবনের আহ্বানের রং তাকে গড়তেই হবে। এই গড়ে দেওয়াটা এই প্রচারসর্বস্বতার যুগে সহজ নয়।

আমাদের ঘর-লাগোয়া বুচড়ি বুড়ো আমগাছটার তলায় একটা বইয়ের দোকান ছিল। ঠিক জীবিকার জন্য নয়। একটু আড্ডা আর টুকটাক পড়ালেখা রাজা-উজির মারা ওসব চলতো ওখানে। ঘরে-গৃহে বেশ ছায়াসুনিবিড় ছিল দোকানটা। সেখানে দুদিন আগের পত্রিকা প্রতিদিন বিলি করতেন সুদূর রংপুর থেকে আসা রহমান হকার।

খুব ভালো মানুষ ও পরিশ্রমী ছিলেন তিনি। ময়লা ফতুয়া আর পরনে লুঙ্গি। শীতের সময় পুরনো চাদর গায়ে দিতেন। ঝটপট পত্রিকার শিরোনাম বলে পত্রিকা টেবিলে ফেলে দিতেন। তখন দাম পঁচাত্তর পয়সা, পরে এক টাকা হলো। প্রধান রাস্তার ঠিক শেষমাথা পর্যন্ত পত্রিকা পৌঁছে দিয়ে- যাবার সময় টাকা নিয়ে যেতেন। মচমচা গন্ধ সে নিউজপ্রিন্ট কাগজের।

এরকম কাগজে তখন বড় হেডিং ছিল না তেমন। তবে মিসরের সাদাত বা প্রেসিডেন্ট জিয়া মারা গেলে কালো ব্যানার হেড হয়ে যেত। ওসব নিউজ মুখ ডুবিয়ে সকলেই পড়ত। আগ্রহ আর আকস্মিকতা ঘিরে থাকতো পত্রিকার সবটা জুড়ে। এমনটা অনেকদিন চলে। এরকম একরকম ছিল পত্রিকার যোগাযোগ। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় এই একরকমের পত্রিকা ভেঙে গেল।

‘আজকের কাগজ’ এলো পরে ‘ভোরের কাগজ’। ততোদিনে আমরা ইউনিভার্সিটির সিঁড়িতে চলে এসেছি। কাগজের মর্যাদা সম্পর্কে আরও অধিক জানতে পেরেছি। তখন দিনের কাগজ দিনেই পাওয়া শুরু হয়ে গেছে। দেখতাম বড় বড় মানুষরা কলাম লিখছেন। খুব কাছে থেকে জেনে চলি হাসান আজিজুল হক, শহীদুল ইসলাম, সনৎকুমার সাহা তাদের কলাম লেখার কাজ।

কখনো তাদের চেম্বারে গেলে দেখি তারা কলমে মুখ ডুবিয়ে কলাম লিখছেন। হাসান স্যর, সনৎ স্যর, জুলফিকার মতিন স্যরদের কলমে বিশাল লাইব্রেরিটার তিনতলার পেপার রুমটা গমগম করতো। প্রতিদিন সেখানে প্রচুর ছেলেরা পড়ত। তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার ওপর লেখাপড়া শুরু হয়নি।

বিশেষত, প্রফেশনটা পছন্দ করে নানা বিষয়ে অনার্স পড়া অনেকেই সাংবাদিকতায় আকৃষ্ট হন। সাংবাদিকতার ব্যাপারটা মুগ্ধতার মতো। প্রতিদিনের লেখাপড়ার সঙ্গে সংযুক্তি ঘটে বোধসম্পন্ন মানুষদের। বিস্তর বিবেচনাও গড়ে ওঠে। কোনো কোনো কলাম লেখকের লেখা পড়ার জন্য আমাদের মন অস্থির থাকতো।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাড়াও ওবায়দুল হক, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, এবিএম মূসা, সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখের লেখা মিস হতো না। সোনালি রোদে পা দিয়ে কখন যেন আলিঝালি কাটা জানালা চুইয়ে ঝুপঝাপ অন্ধকার নেমে আসতো। আমরা টের পেতাম না।

একটা সময়ে ভোরের কাগজ খুব এক্সাইটিং পত্রিকা হয়ে ওঠে। মতিউর রহমান তখন সম্পাদক। ওর গেটআপ, লেখা নির্বাচন, খবর পরিবেশন, ভেতরে ও বাইরের ম্যাটার আকর্ষক হয়ে ওঠে। সার্কুলেশন কেমন তা জানতাম না কিন্তু রিডিং রুমে ওটা হাতে পাওয়ার জন্য বেশ তৎপরতা দেখাতে হতো।

এক অর্থে ওইসব সময় আমাদের কিশোর মনের পাড়ায় এক-আধটু পরিপক্বতা এসেছে, সেখানে ঢেউ দিচ্ছে প্রথম যৌবন। ঠিক যৌবনের তীব্র রেশ আর ঝলসিত আলোকরশ্মি আমাদের মমত্বের পরশে অধিকার করে ফেলেছে। এই অধিকার অপরিসীম। তীব্র আলোর ঝলকানির মতো। পড়াশোনার আলাদা একটা আগ্রহে তা চুইয়ে পড়ার সময়।

আমরা পত্রিকা পড়ি, পত্রিকার ভেতরের মানুষদের দেখি। ভালো-মন্দ খবরের চেয়ে আমরা চিন্তার উৎস খুঁজি। সাহিত্যের পাতাগুলো তীব্রভাবে আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রত্যেকটি পত্রিকাই আলাদা কিন্তু বিশেষ তালে বাঁধা ছিল কিছু কিছু পত্রিকা আর কিছু কিছু লেখা। এসব লেখা আমাদের কাছে বাইবেলতুল্য।

বাইবেলের ভেতরে নিষ্পাপ সশব্দ আয়োজনে যেমন নিষ্পাপ গৃহ লুকিয়ে থাকে, বারবার হানা দেয়, সুখ তৈরি করে, মুক্তির আনন্দ গড়ে ওঠে, সাহস আর সশব্দে মুখ উঁচু করার কাল- এইসব পত্র-পত্রিকাই আমাদের গড়ে দিয়েছিল। মন আর মনের শ্বেত কাগজে বিচিত্র আঁকিবুঁকির ঝঙ্কার তৈরি হতো। সেই ‘আমি’ আজকের আমিস্বরূপের অন্য আমি। এই যে পত্রিকার দান সেটা সারা জীবনের ঋণে আবদ্ধ। এর কোনো শেষ নেই। শুধু স্বীকার করে মাথা নত করার স্পর্ধিত শক্তি জোগায়।

দুই.

একটি কাগজ আসলে কী? একদিন আমাদের ক্লাসের সাখাওয়াৎ স্যর বলতেন ম্যাগাজিন পড়বি। অনেক ম্যাগাজিন। ওসব না পড়লে জ্ঞান হয় না। ক্লাসের পড়া দিয়ে কী করবি? আমরা তখন বিশেষ আকৃষ্ট হয়ে পড়ি বিভিন্ন ম্যাগাজিনের দিকে। খবরের কাগজগুলো সরে যায়। বড় বড় মুখশ্রীর কাভার, বিশাল বিশাল যুদ্ধ-দামামার সংবাদ দিয়ে ঘেরা সেসব তুচ্ছ তুচ্ছ কাগজ।

সে কাগজগুলোও আমরা হাতে পাই রহমান হকারের মাধ্যমে। হঠাৎ শাহাদাৎ চৌধুরীর কথা মনে আসছে। উনার বিচিত্রা আর কিছু কাভার স্টোরিও আমরা পড়েছি। কী সব মজার লেখা তার। মচমচে ওসব কাগজে ওরকম আরও কেউ কেউ লিখতেন। আমার ছোট ভাইয়ের ঢাকা ডাইজেস্ট কিংবা আনোয়ার হোসেনের গোয়েন্দা সিরিজগুলো পড়ার ঝোঁক ছিল।

মাঝেমধ্যে ও পূর্ণেন্দু পত্রীও পড়ত। বুদ্ধদেব বসুও। সেই সুবাদে আমরা সেসব পড়ে পড়ে যখন বেসুমার গদগদ তখন হঠাৎ পূর্ণিমা বা অন্যকিছু কাগজও হাতে আসে। নতুন নতুন কাগজের মাধ্যমে আমাদের জ্ঞানের বিস্তার বাড়ে। মধুমাখা সেসব দিনে রোকনুজ্জামান দাদা ভাই, সুকুমার রায়সহ বাংলা সাহিত্যের অনেক লেখকের পরিচয় ঘটে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন, সোভিয়েত নারী নামের ঢাউস ম্যাগাজিনও হাতে আসে। ম্যাগাজিনগুলো পৃথিবীব্যাপী নানা জিনিসের খবর দিত। সে খবরে আমরা জীবনের অভিমুখ খুঁজে পাই। বুঝতে শিখি, সত্য-মিথ্যা, সাহস আর শৌর্যের মুখমাখা অবিচলিত জীবনের কাহিনী।

তবে কাহিনী যেমনই হোক, কাগজের ভেতর দিয়ে আমাদের গ্রহে যে প্রচুর আলো ঢুকে গিয়েছিল, আলোর নতুন নতুন রং গড়ে উঠেছিল, আমরা ষড়ঋতুর বাংলাদেশকে কিংবা এদেশের অনেক বড় বড় মানুষকে রবীন্দ্রনাথকে, নজরুলকে জানতে পেরেছিলাম, তাদেওর মতো হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম- সেসব জ্ঞান মনের ভেতরে রোপণ করে দিয়েছিল এইসব নানা জাতের পত্রিকা। এরাই ছিল সে অর্থে জীবনের বড় হবার মূলমাত্রা।

তিন.

‘সক্রেটিস’ একটা শব্দ শুধু নয়। আগুন। সে ‘ন্যায়’ শব্দটি বুনে দিয়েছিল গোটা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে। আর শিখিয়েছিলেন ‘নিজেকে জানা’র গল্প। নিজের মুখ কেমন- ঠিক নিজে জানা যায় না। নিজের চেহারা দেখার জন্য একটা প্রতিবিম্ব চাই। এই জানার আকাক্সক্ষা কখনো শেষ হয় না। প্রকৃতি দেখাও মানুষের শেষ হয় না। এই মুগ্ধতার নিকষ আনন্দ কোথা হতে আসে।

কে তা বলে? মানুষ নিজেই নিজের কথা বলে। সবকিছু তারই জন্য সৃষ্টি। সে নিজেই সব সৃষ্টির উৎস খুঁজে নেয়। ‘কাগজ’ এক অর্থে নিজের মুখ। এতে গোটা বিশ্ব-প্রকৃতির প্রতিবিম্ব প্রবহমান থাকে। এর ভেতরেই প্রতিটি মুহূর্ত নির্মিত হতে থাকে। এই নির্মাণ অনপনেও।

কাগজ এভাবেই প্রতিদিন অনেকের মুখ নির্মাণ করে থাকে। মানুষের মন যেমন বৈচিত্র্যময়, শোভাময় যেমন তার প্রকৃতি তেমনি বড় হওয়ার মুহূর্তগুলোও প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তেও বর্ণাভাযুক্ত হয়। কাগজ সেই বর্ণাভার উদ্যোক্তা। যেটি প্রত্যেকের মনে গড়ে ওঠে। লেখাপড়া বা শিক্ষাদীক্ষার মূল বিষয়টিই তাই। বড় হওয়াও তাকেই বলে। বৃহৎ নির্মাণও তাই।

ব্যক্তির মুগ্ধতায় এ নির্মাণ কচি থেকে কিশলয় তারপর উদ্গম। এই সঞ্চারণের সারার্থ কী? বৃক্ষ বা নদীর মতো তার মন মুকুরে বিকশিত হয়। মুকুর ক্রমবিকশিত হয়। সবটুকু আলো-অন্ধকার গায়ে মেখে নেয়। সবটার ভেতরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা দেয়। তাৎপর্যময় করে, সকলের জন্য। এই অবহিতকরণের উৎসবে মানুষই প্রধান। মানুষে আছে যে মানবসত্তা তাই তার আনুকূল্য।

এইটিই নান্দনিকতার গুণ। নান্দনিকতা এই আনুকূল্যটাই মূলত সমাজে বিছিয়ে দেয়। এই বিছানোর ভেতর রং ও রেখার আলোকপাত থাকে। সেটি প্রসিদ্ধিজ্ঞাপকতা পায় আরও কিছু মননশীল মানুষের ভেতরে। কিছু ঘটনা বলি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক বন্ধুরা মিডিয়ায় আসতে চান না। নিভৃতে পড়তে ভালোবাসেন, দূরে থেকে দেখতে চান।

প্রচার বা মঞ্চ তাদের অপছন্দ। যোগ্যতা অনেক কিন্তু এটা এড়িয়ে চলেন। ঠিক হৈ-হুল্লোড় পছন্দ না। প্রতিযোগিতাটা তারা অশুভ মনে করেন। আবার ঠিক বিপরীত চিত্রও আছে। যেখানে নিজেদের পেশাকে পুঁজি করে অনেকেই প্রকাশ করতে চান, সেলিব্রেটি হওয়ার আকাক্সক্ষায় উন্মত্ত তারা।

এখন প্রশ্ন, দুই বিপরীত মানুষ কেন দুই রুচিতে চলেন। কেন দুই রুচির নান্দনিকতা তৈরি হলো? এমন মানুষও আছেন প্রচুর যারা পড়েন, জ্ঞান তার অসীম- কিন্তু প্রকাশ করেন না। প্রকাশশীলতার জন্য আকাক্সক্ষীও নন তারা। মানুষের এই বৈচিত্র্যশীল প্রবণতার ভিত্তি কী? অমরত্ব চাওয়ার বাসনাগুলোইবা কী? আসলেই সত্য মিথ্যা বা প্রকৃত পথ কোনটি? এসব যখনই ভাবছি তখন টিকে থাকার প্রশ্নটি আসে।

‘টিকে থাকা’ এটিও আপেক্ষিক মত। আর টিকে থাকার সঙ্গে বেঁচে থাকার ব্যাপারটি যদি না থাকে তবে টেকা না-টেকায় ব্যক্তির কী আসে- যায়! ব্যক্তি কেন তা নিয়ে কাতর হবেন। প্রকাশশীলতা একটা বড় বিষয়। প্রকাশশীলতার রীতি জনে জনে আলাদা। যে অপ্রকাশশীল সেও কোনো না কোনোভাবে প্রকাশশীল।

আর যে প্রকাশিত সেটি কারো কাছে ‘আনন্দ’ লাগে কারো কাছে বেখাপ্পা মনে হয়। এই আনন্দ আর নিরানন্দের স্বরূপ তো আলাদা। সেটা বোধের পার্থক্য থেকে। তাহলে শেষ কথা কী? রুচি-প্রগতি-বিশ্বাস সেটি গড়ে ওঠে নিশ্চয়ই পূর্ণতার সংস্কৃতির ভেতরে।

এই পূর্ণতা গড়ে ওঠে বিচিত্র পড়াশোনা ও বোধবুদ্ধি দিয়ে। সেটি নিজস্বতায় গড়ে উঠলে স্বাতন্ত্র্য এবং ভিন্নতার স্বরূপ-কাঠামো পেয়ে বসে। এই স্বরূপকাঠামো অবশ্যই চিন্তার, আবেগ ও অনুরাগের। সবটুকু মিলিয়ে সাবলীল ব্যক্তির প্রকাশ স্বতঃস্ফূর্ত ঘটে। এখন এ সময়ে প্রচুর সহজলভ্যতা এসে গেছে। প্রযুক্তির কল্যাণই মুখ্যত এর জন্য দায়ী।

সহজেই নিজেকে প্রকাশ করার ফলে, যোগ্যতার প্রশ্নটি ঝুলে গিয়ে বিপরীতে যোগাযোগের বিষয়টিই মুখ্য হয়ে উঠেছে এখন। যার যতো যোগাযোগ সে ততো বেশি পাদপ্রদীপের নিচে দাঁড়াচ্ছে। অথচ মুখ লুকিয়ে থাকা অনেকেই সেখানে সুযোগ পাচ্ছেন না, পাওয়ার আশাও করছেন না। হয়ও না।

ফলে সহজ গতি ও ব্যস্ততার টানাপড়েনে প্রকৃত জিনিসটি পিছিয়ে থাকছে। অধিক পিছিয়ে পড়ার কারণে তাই ক্রমশ অনেকগুলো ভালো ব্যাপার সম্মুখ থেকে দূরে সরে গিয়ে যা সহজলভ্য, যা অপ্রকাশযোগ্য- তাকেই প্রকাশিত করে তুলছে, প্রকাশযোগ্যতা বানাচ্ছে।

কাগজ এখন কাদের প্রকাশ করবে? একটা সময় ছিল যখন আমরা ভোরের কাগজে প্রচুর ব্যক্তি-মানুষ পেতাম। তারা আইডল হয়ে উঠেছিলেন। সক্রিয়ও ছিলেন দর্শক ও দৃশ্যপটে। এখন কারা আসেন? সত্য কথাটি কী বলা যায়? বলতে পারেন? কিংবা কাগজ তো শুধু খবর নয়। আমাদের সংস্কৃতি গড়ে দেয়। কাহিনী গড়ে দেয়। জীবনের কাঠামো প্রস্তুত করে।

প্রচুর আলোর সোনালিরূপ বিছিয়ে দেয় আমাদের মলিনতার ওপরে। এই প্রশ্নটিই বস্তুত এখন রয়ে যাচ্ছে। কাগজ- সর্বাত্মকরূপে কিছু করতে পারছে না। একটি কৃষ্টিতে পৌঁছতে পারছে না। যদি পারতো তবে, বিজনেস-উগ্র প্রকাশরীতি, মিথ্যা জলুস, মিথ্যা কালো অহংকারগুলো পরাস্ত হতো। তা হয়নি। এই পরাস্ততার দায় নিতে হবে কাগজকে।

একটি কাগজ যতো ক্ষীণ পরিসরেই প্রকাশিত হোক, সত্যিকারের মানুষের ও জীবনের আহ্বানের রং তাকে গড়তেই হবে। এই গড়ে দেওয়াটা এই প্রচারসর্বস্বতার যুগে সহজ নয়। উগ্র প্রকাশের যুগে অধিক কিছু কঠিন থাকে। অধিক সহজ প্রযুক্তির স্বাচ্ছন্দ্যে যোগ্যতার ভিত তৈরি হলে কিংবা (যোগ্যতার স্তরের মাপকাঠি তুল্যমূল্য মনে করলে) যোগ্যদের সামাজিক সম্মান তৈরির সুযোগ নানাভাবে করে দিতে পারলে (হোক তা শহর বা গ্রাম, কেন্দ্র বা প্রান্ত) আমাদের রুচি বদলাতো।

আধুনিকতার আলাদা স্বরূপ গড়ে উঠতো। বাঙালির আবেগ আছে। উগ্রতাও আছে। ফলে প্রযুক্তির প্রসারে ওই স্বভাবধর্ম বিরূপভাবে কাজ করছে। তাইতো সার্বিক নিরপেক্ষতার কৃষ্টি গড়ে উঠছে না, প্রকৃত জিনিসটি আমরা পাচ্ছি না। সর্বক্ষেত্রে ভুল ব্যাপার প্রডিউস হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ নেই। নিষ্ঠাও হারাচ্ছে। যোগাযোগ গড়ে উঠছে ওই আবেগ আর অনুকম্পাকে ঘিরে।

সেটি কর্মে ও প্রেরণাতেও থাকছে। এই রোগগ্রস্ততা দূর করার জন্য কাগজকে দায়িত্ব নিতে হবে। কাগজই প্রকৃত কাজটি করতে পারে। পুরনো লেখাপড়া ফিরিয়ে দিতে পারে। পুরনো যোগ্যতা ফিরিয়ে দিতে পারে। প্রকৃত আধুনিকতা কায়েম করতে পারে। যথার্থ লোক চিনিয়ে দিতে পারে। পুরনোরা পুরনো হয়ে গেলে বাতিল করতে পারে।

নতুনরা নতুন কিছু করছে নিরপেক্ষতায় তা গ্রহণ করার সৎসাহস দেখাতে পারে। এই দেখানোর কলাকৌশল হতে পারে পড়াশোনা, যার ভেতর দিয়ে প্রকৃত কৃষ্টির গড়ে উঠতে পারে। প্রকৃত সেবাটা সমাজ পেতে পারে। অযোগ্যতার তখন নিজের মতো করে মিলিয়ে যাবে। নিশ্চয়, যোগ্যরাই টিকে থাকবে তো বটেই।

সকলেই যে নিজের অতীতের প্রতি অনুরাগী, সেটি বলাবাহুল্য। কিন্তু সেটিও একটা নিরিখে বিচার করতে হবে। সেখানেও নিরপেক্ষতার ‘নিরপেক্ষ’ মানদণ্ড দরকার। অতি প্রিয় জিনিসকেও বিচারে জন্য ন্যূনতম সূক্ষ্মতা দরকার। সেটি গড়ে উঠছেই না। কোনো স্তরেই না। বেশি বেপরোয়া সব। তাতে পিছিয়ে পড়ে যে সব্বাই!