শীতের রাজ্যে কাতুকুতু

আগের সংবাদ

দেশের প্রথা ভাঙা গদ্যসাহিত্য

পরের সংবাদ

একুশের অনালোচিত অজানা কিছু কথা, কিছু ঘটনা

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯ , ৪:৫৭ অপরাহ্ণ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১৯ , ৪:৫৭ অপরাহ্ণ

আমরা সাধারণত বলে থাকি বাহান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রাণ বিসর্জনকারী ভাষা শহীদদের রক্তাক্ত ইতিহাস আমাদের গৌরবময় ইতিহাস। তবে বাহান্ন সালের রক্তাক্ত এ ইতিহাসের শুরু আরো অনেক পূর্ব থেকে। সে ইতিহাস যেমন আমাদের জানা তেমনি আছে কিছু অজানা ও অনালোচিত ঘটনা। ইতিহাসের সেই সব অকথিত কথা শুরু থেকেই শুরু করা যাক।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রথম মত প্রকাশ
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রথমে মত দেন একজন ব্রিটিশ লেখক ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হলহেড, তিনি ব্রিটিশ কোম্পানি সরকারের পক্ষে বাঙালিদের ইংরেজি শেখাবার জন্য অ মৎধসসধৎ ড়ভ ঃযব ইধহমধষ খধহমঁধমব নামক একটি বই প্রকাশ করেন ১৭৭৮ সালে। এটিকে বলা হয় ‘হলহেডের ব্যাকরণ’। তখন উপমহাদেশের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফার্সি। হলহেড তাঁর ব্যাকরণের ভ‚মিকায় ফার্সির পরিবর্তে বাংলাকে সরকারি কাজকর্মে ব্যবহারের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হলে কোম্পানি সরকারের সুবিধার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে ফার্সির পরিবর্তে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য মতামত প্রদান করেন। এটিই বাংলা অক্ষরে মুদ্রিত প্রথম পুস্তক, এ পর্যন্ত পাওয়া ইতিহাস থেকে প্রমাণিত হয় যে, এটিই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম সুপারিশ ও মতামত।

মানসিক প্রস্তুতি
পাকিস্তানের জন্ম লাভের বহু পূর্বেই রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তর্কের সৃষ্টি হয়। অবাঙালিরা উর্দুকে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রের জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাতে থাকে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাঙালির মনে আঘাত লাগে। দেশের সচেতন নাগরিক ও বুদ্ধিজীবীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রের জাতীয় ভাষা হিসেবে উর্দুকে গ্রহণ করার ষড়ষন্ত্রমূলক অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ তোলে। লেখালেখির মাধ্যমে এ আন্দোলন শুরু করেছিলেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে তাদের এই প্রচেষ্টা ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল যাকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মনস্তাত্তি্বক পর্ব যা মানসিক প্রস্তুতি পর্ব বলা যায়। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই পর্বটি আজো উপেক্ষিত এবং অনালোচিত।

উপমহাদেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাবক
১৯১১ সালে রংপুরের শিক্ষা সম্মেলনে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী যুক্তি সহকারে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করার জোর সুপারিশ করেছিলেন।
১৯২১ সালে বাংলা ভাষাাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য প্রথম লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। এ প্রস্তাব পেশ করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারকে বলেছিলেন : ‘ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলা ভাষাকে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে প্রথম বাংলায় পাঠদান
বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। ১৯৪৬ সালের কথা। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদে কর্মরত ছিলেন। পদার্থ বিজ্ঞানের ক্লাসে তিনি প্রথম বাংলা ভাষায় পাঠদান করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বাংলায় বক্তব্য দেয়া তখনকার সময়ে ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক এবং অসম্ভব কাজ। অদম্য সাহস আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে তিনি এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। তখন থেকেই অধ্যাপক কাসেম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপ্ত বাসনা করতে থাকেন। ইতোপূর্বে অনেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সপেক্ষে আলোচনা, লেখালেখি করেছেন কিন্তু বাংলা ভাষায় প্রাকাশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য প্রদানের ঘটনা এটাই প্রথম।

সাংবাদিক সংঘের দাবি
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি উঠে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সংঘ-এর পক্ষ থেকে। ১৯৪৭ সালের ৪ নভেম্বর সংঘের পক্ষ থেকে এ দাবি জানান আবুল কালাম শামসুদ্দীন, কাজী জহিরুল হক, বঙ্কিমচন্দ্র সাহা, জ্যোতিদাশ গুপ্ত, আবু জাফর শামসুদ্দীন, শ্রীকান্ত চ্যাটার্জি, সৈয়দ নূর উদ্দীন, সন্তোষ কুমার চ্যাটার্জি প্রমুখ।
প্রথম স্মারকলিপি
১৯৪৭ সালের ১৪ নভেম্বর তমদ্দুন মজলিস কর্তৃক পূর্ব-পাক প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনের কাছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এতে দেশের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদসহ শতাধিক লোকের স্বাক্ষর ছিল। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন :
মওলানা আকরাম খাঁ (বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সভাপতি), মওলানা আব্দুল্লাহিল বাকী (মেম্বার অব লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি), অধ্যাপক আবুল কাসেম (তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক), অধ্যাপিকা শামসুন্নাহার মাহমুদ, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ (মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান), শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন, অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন, (এস এম হলের প্রভোস্ট), ড. ওসমান গণি, অধ্যাপক আবদুল লতিফ (ব্যারিস্টার), অধ্যাপক অতুল সেন, ড. মহিউদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ (দৈনিক ইত্তেহাদ সম্পাদক), নীলা রায় (জয়শ্রী সম্পাদিকা), আনওয়ারা চৌধুরী (নিখিল বঙ্গ মুসলিম মহিলা সমিতির সম্পাদিকা), অধ্যাপক ও আর খাস্তগীর, আব্বাস উদ্দীন (গায়ক), অধ্যাপক বিনয়েন্দ্রনাথ রায়, অধ্যাপক গণেশ বসু, মো. মোদাব্বের (দৈনিক আজাদের বার্তা সম্পাদক), ওসমান, আবু রুশদ, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ মান্নান বখশ, আহসান হাবিব, কাজী আফসার উদ্দিন (জিন্দেগী সম্পাদক), আবু জাফর শামসুদ্দীন, জহুর হোসেন চৌধুরী প্রভৃতি।

প্রথম সংগ্রাম পরিষদ
১৯৪৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সন্নিকটে রশিদ বিল্ডিংয়ে (বিল্ডিংটি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগের পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত) তমদ্দুন মজলিসের অফিসে অনুষ্ঠিত এক সভায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য অধ্যাপক কাসেমের প্রস্তাবক্রমে অধ্যাপক নুরুল হক ভূইয়াকে আহবায়ক করে প্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়।

কর্নেল আফ্রিদি ও মেজর এলিংসনের বাংলাভাষার প্রতি
১৯৫২ সালে কর্নেল আফ্রিদি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অবাঙালি প্রিন্সিপাল এবং হাসপাতালের সুপারিনটেন্ডেন্ট। বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলন নিয়ে তার বিরুদ্ধাচরণই স্বাভাবিক, কিন্তু বাস্তবে তিনি আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। একুশের ছাত্রহত্যার পর তিনি সরেজমিন অবস্থা দেখতে ব্যারাক প্রাঙ্গণে এসেছিলেন। ঘুরে ঘুরে রক্তের ছোপ, গুলির দাগ স্বচক্ষে দেখে মন্তব্য করেন,
‘আমাকে বলা হয়েছে, ১৪৪ ধারা ভাঙার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে গুলি চালানো হয়েছে। কিন্তু হোস্টেলের ভিতরে ছাত্রদের উপস্থিতিতে কেমন করে ১৪৪ ধারা নিষেধাজ্ঞা ভাঙা হয় তা আমার মতো একজন আর্মি অফিসারের কাছেও দুর্বোধ্য। আশ্চর্য এ প্রশাসন।’

শুধু কি তাই। পুলিশ এসে মেডিকেল ব্যারাকে স্থাপিত কন্ট্রোল রুমের মাইক নিয়ে গেলে মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তিনি সেই মাইক ফিরিয়ে আনেন। তিনি গুলিবর্ষণেরও প্রতিবাদ করেন তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন প্রফেসর ফ্রাংক উইলিয়াম এলিনসন। তিনি ভাষা শহীদ বরকতের শেষ অপারেশন করেছিলেন। শুধু বরকত নয়, অসংখ্য আহত ছাত্র-জনতার অপারেশন ও চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি। সে সময় উপস্থিত ছিলেন সার্জারি বিভাগের শিক্ষানবিস ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম। তাকে উদ্দেশ্য করে এলিনসন বলেছিলেন, ‘ইয়াং ডক্টর, আই ডিড নেভার সি সার্চ এ ব্ল্যাড ওশান। ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম বলেছিলেন, স্যার উই মাস্ট স্টপ দি স্ট্রিম অব ব্ল্যাড।’

ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি কেটে ক্লিনসেভ
ডা. আলী আজগর ছিলেন ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাক হোস্টেলের ছাত্র। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে, গোলাম মাওলা ও কামরুদ্দিন আহমদ তাকে একটি জরুরি কাগজ দিয়ে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলের একজন ছাত্রের কাছে পাঠান, কাগজটি মওলানা ভাসানীর কাছে দেয়ার জন্য। কাগজটি নিয়ে সে কসাইটুলির কুহিনুর মেডিকেল হলে যান। কুহিনুর মেডিকেল হলের আবাসিক ছাত্র আবদুল আওয়াল তার আত্মীয়। তাকে কাগজটি দিয়ে কাগজটির প্রকৃত মালিক মিটফোর্ড স্কুলের সেই ছাত্রকে পৌঁছে দিতে বলেন। পুরান ঢাকায় প্রবেশের সাথে সাথেই আইবির লোকেরা তার পিছু নেয়। কুহিনুর মেডিকেল হলে একজন লোক এসে তাকে বলল, ‘পুলিশ আপনাকে খুঁজছে।’ তখন এক পিয়ন তাকে গামছা পরিয়ে তাকে সুন্দর ফ্রেঞ্চকাট দাড়িটি ছাঁটিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। সে দুর্গন্ধময় ময়লার স্ত‚প ও ড্রেন পার হয়ে এক বাড়িতে ঢুকে অপরিচিত এক মহিলার মুখোমুখি হন। মহিলা ঘটনা শুনে বেরিয়ে যাওয়ার চোরা পথ দেখিয়ে দেয়। আলী আজগর বহুকষ্টে হোস্টেলে এসে গোসল করে পরিষ্কার হন।

বইয়ের ভিতর গুলির খোসা
ডা. এমদাদুল হক ১৯৫২ সালের উত্তাল আন্দোলনে ঢাকায় ছিলাম না। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ছিল। ঢাকায় এুকশে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্র হত্যার বিবরণ দিয়ে তার বন্ধু ও রুমমেট মুরতজা আলী তাকে একটি চিঠি লিখেন। উক্ত চিঠি পেয়ে সে সাথে সাথেই ঢাকায় চলে আসে। সম্ভবত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এসে তার পড়ার টেবিলে প্যাথলজির বইটি নিতে গেলে হঠাৎ করে একটি গুলির খোসা পড়ে যায়। তখন রুমে তার দুজন বন্ধুও ছিল। তারা গুলির খোসার উৎস সন্ধান করতে যেয়ে দেখে ব্যারাকের মুলীবাঁশের বেড়া ও পড়ার টেবিলের শোকেসের পিছনের কাঠ ভেদ করে গুলিটি আমাদের রুমে এসে পড়েছে। রুমটি ছিল ১২নং ব্যারাকের ৩নং রুমে ঠিক বিপরীত দিকে। এই ১২নং ব্যারাকের সামনেই গুলি হয়েছিল। রুমের জানালা দিয়ে গুলিবর্ষণের স্থানটি স্পষ্ট দেখা যেত। পরে গুলির খোসা নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে হৈচৈ পড়ে যায়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়