সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত শেষ কবে?

আগের সংবাদ

প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি

পরের সংবাদ

মমতাজ বেগম

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯ , ৮:৫৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯, ৮:৫৯ অপরাহ্ণ

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন

লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে নির্যাতিত, ত্যাগী ও নিগৃহীত নারী ভাষাসৈনিকের নাম মমতাজ বেগম। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে তিনি তিলে তিলে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে স্বামী সংসার হারিয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, গ্রেপ্তার বরণ করেছেন, নানারকম কুৎসা ও গঞ্জনা সহ্য করেছেন। নিজের জীবন, সংসার বিপন্ন করেছেন কিন্তু ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি।

ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী, সাহসী ও ত্যাগী নারী মমতাজ বেগম ১৯২৩ সালে ভারতের ভূপাল রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম কল্যাণী রায় চৌধুরী, ডাক নাম মিনু। তিনি সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশির বোনের মেয়ে। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিল রাজশাহী রঘুনন্দন পূর্বের জমিদার। বাবা রায় বাহাদুর মহিম চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন জেলা জজ পরে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন।

মাতা মাখন মতি দেবী ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা এবং শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত অথচ রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেয়া প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ধারক কল্যাণী রায় চৌধুরী রক্ষণশীলতার শৃঙ্খল ভেঙে ভালোবেসে বিয়ে করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর আব্দুল মান্নাফকে। ধর্মান্তরিত হয়ে কল্যাণী রায় চৌধুরী নাম ধারণ করেন মমতাজ বেগম।

১৯৪৩ সালে কলকাতা থেকে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪২ সালে কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএড এবং ১৯৬৪ সালে এমএড ডিগ্রি লাভ করেন। রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেয়া একমাত্র সন্তান কল্যাণী রায়ের শিক্ষাজীবনও স্বাভাবিক ছিল না।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় এই মহীয়সী নারী নারায়ণগঞ্জ মর্গান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে রহমত উল্লাহ মুসলিম ইনস্টিটিউট ময়দানে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ময়দানের কাছেই মর্গান স্কুল।

জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। তাঁর কাছ থেকেই নারায়ণগঞ্জবাসী জানতে পারেন যে, ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি হয়েছে। মুহূর্তেই বিশাল জনসভা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সভা থেকে যে বিরাট মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে, তাতে মমতাজ বেগম যোগ দেন।

তখন ছিল রক্ষণশীলতার যুগ। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে পর্দা ঘেরা ঘোড়াগাড়ি ও রিকশায় মহিলারা চলাফেরা করতেন। এই রক্ষণশীলতার মধ্যেও মমতাজ বেগম শহরের মহিলাদের বিশেষ করে ছাত্রীদের আন্দোলনে শরিক করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এতে নারায়ণগঞ্জ মহকুমা প্রশাসন তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তখন মহকুমার পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) ছিলেন দেলোয়ার সাহেব।

মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে এক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। ২৯ ফেব্রুয়ারি সকাল নয়টা কিংবা সাড়ে নয়টায় মমতাজ বেগমকে রাস্তায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং নারায়ণগঞ্জ কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। কোর্টে তাঁর জামিনের আবেদন নামঞ্জুরও হয়। এদিকে তাঁর গ্রেপ্তারের খবরে উত্তেজিত জনতা কোর্ট ভবন ঘেরাও করে ফেলে।

সেখান থেকে তাঁকে ভ্যানে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় কিন্তু চাষাঢ়ায় এক জনসমুদ্র গতিরোধ করে দাঁড়ায়। পুলিশ জনতার ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস প্রয়োগে ব্যর্থ হয়। ঢাকা থেকে আসে আরো পুলিশ এবং ইপিআর। জনতার প্রতিরোধে এসে যোগ দেন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের দুপাশের গ্রামবাসীও।

তারা চাষাঢ়া থেকে পাগলা পর্যন্ত রাস্তার দুপাশের ১৬০টি বটগাছ কেটে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেন। সে দিন পুলিশ নারায়ণগঞ্জে জুলুমের এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য খান সাহেব ওসমান আলীর বাসভবনও তছনছ হয়। শত শত ব্যক্তি আহত হয়। গ্রেপ্তার হয় শতাধিক।

রাত আটটা পর্যন্ত জনতা-পুলিশ তীব্র সংঘর্ষ চলে। রাত এগারোটার দিকে জনতার প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়লে পুলিশ মমতাজ বেগমকে একটি ট্রাকে করে ঢাকায় নিয়ে আসে। ওই ট্রাকে গ্রেপ্তারকৃত শফি হোসেন খানও ছিলেন এবং মর্গান স্কুলের কয়েকজন ছাত্রীও ছিলেন। মুসলীম লীগ সরকার অবশ্য মমতাজ বেগমকে কারাগার থেকে বন্ড সইয়ের শর্তে মুক্তি দিতে চেয়েছিল।

এই তেজস্বিনী নারী সে প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মুচলেকা দিয়ে মুক্তি ক্রয়ের বিরুদ্ধে অবিচল থেকে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এই অস্বীকৃতির জন্য মমতাজ বেগমকে তার সরকারি চাকরি হারাতে হয়েছে। স্বামী তাকে পরিত্যাগ করেন। প্রায় দেড় বছর পর কারাগার থেকে মমতাজ বেগম মুক্তি পান।

১৯৫২ সালের মে মাসের চতুর্থ সপ্তাহের প্রথম দিকে মমতাজ বেগমকে জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনের অংশগ্রহণের কারণে তাঁর সুন্দর সাজানো সংসার ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ অনিশ্চয়তা।

তা সত্ত্বেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ, অকুতোভয়, আপসহীন এই ত্যাগী নারী আন্দোলনের মাঠ থেকে এক বিন্দু সরে দাঁড়াননি, নিজকে বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। ভাষা আন্দোলনের কিংবদন্তি মমতাজ বেগম ১৯৬৭ সালের ৩০ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন : লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা