ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ

আগের সংবাদ

একুশ আসে-যায়, প্রতি বছর একই চিত্র

পরের সংবাদ

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কিছু প্রস্তাবনা

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ , ৯:৩৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ

চৌধুরী মনজুর লিয়াকত

অর্থনীতি বিশ্লেষক।

প্রধানমন্ত্রী আর অর্থমন্ত্রী এগিয়ে আসছেন অনেকটা। তবে সাধারণ জনগণ আসুক এগিয়ে আরো একটু। অনেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি ঋণখেলাপিরা একটুও ঠিক পথে এগিয়ে আসে। এ দেশ এ জরা থেকে কিছুটা মুক্ত হয়। তবে যে প্রচণ্ড গতিতে উন্নতি করছে বাংলাদেশ, তা আরো বেগবান হবে। শুধুমাত্র ঋণখেলাপিদের মাধ্যমে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা থামানো প্রয়োজন।

অবাকই হতে হয় এটা শুনলে যে, অর্থঋণ আদালতে শুধু সরকারি ব্যাংকের ৫৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বিচারের অপেক্ষায় আটকে আছে। এ আদালতে দুই লাখ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিশাল অঙ্কের টাকা আদায় হচ্ছে না। তাই অর্থঋণ আইন সংশোধনের পাশাপাশি উচ্চ আদালতে পৃথক বেঞ্চ প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি ব্যাংকাররা করে আসছেন বহুদিন থেকেই।

এ পরিপ্রেক্ষিতে লিখতে গিয়ে হঠাৎ করে চোখে পড়ল সামাজিক মাধ্যমের একটি পোস্ট। যেখানে দেখলাম দেশের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার চৌধুরী তানজিম করিম নিজে উপস্থিত হয়ে একটি লিখিত অনুরোধ জানাচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে।

ঋণখেলাপিদের বিচার ত্বরান্বিত করার কিছু সুনির্দিষ্ট (নিম্নে উল্লেখ্য) প্রস্তাব রয়েছে এখানে। যা এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ অনেক আশাবাদী হতে সাহায্য করবে। ওই প্রস্তাবনার মর্মার্থ হলো, আইনের প্রয়োগকে আরো গতিশীল করে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণকে দ্রুত যেন নামিয়ে নিয়ে আসা যায় সহনীয় পর্যায়ে, বিষয়টি এভাবে-

১. ক্রমবর্ধমান অর্থঋণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অর্থ ঋণ আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। ২. অর্থঋণ আদালতের বিজ্ঞ বিচারকদের অভিজ্ঞতা নিরূপণ করে তাদের বদলি/রদবদলের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া। ৩. অর্থঋণ মামলার বিপরীতে বিবাদীকৃত রিটসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে আদালত বা বেঞ্চ গঠন। ৪. আদালতকে বিভ্রান্ত করতে ঋণখেলাপি কর্তৃক মিথ্যা তথ্য প্রদানকে একটি অন্যতম অপরাধ হিসেবে পরিগণিত করে, প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। ৫. ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের নিমিত্তে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করে তা এক্সিকিউট করা অর্থাৎ ব্যবস্থা নেয়া।

তিনি আরো আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান সুদক্ষ গভর্নর মহোদয়ের সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের গুণাবলিতে একটি আলোচনা শুরু হওয়ার ঋণ আদায় বিষয়ক প্রাসঙ্গিক মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে। যাতে ব্যাংক এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি ভালো ফল পায় এ বিষয়টিতে।

গত ৩০ জানুয়ারি তারিখে বিভিন্ন পত্রিকায় দেখছি বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখ একটি পরামর্শক সভা তলব করেছিল। ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এই বৈঠকটি আহ্বান করেছিল। খেলাপি ঋণ সমস্যার লাগাম হাতে রাখতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আইন কমিশন ও তফসিলি সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক হলো ৬ ফেব্রুয়ারি।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। একই সময় ঋণ অবলোপন করা হয়েছে আরও প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাব ধরলে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হবে দেড় লাখ কোটি টাকা, যা আমাদের জাতীয় বাজেটের এক-চতুর্থাংশ।

পরামর্শক সভায় ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা ঋণখেলাপিদের আটকাতে বিভিন্ন পরামর্শ তুলে ধরেন। সভাটিতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ কমিশনের সব সদস্য, আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাবেক ডিজি বাংলাদেশ ব্যাংক মুহাম্মদ (রুমি) এ আলী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে করিমের সভাপতিত্বে এ সভায় প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জানা যায় বৈঠকে ব্যাংকের এমডিদের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উঠে আসে যে খেলাপি ঋণ কমাতে হলে ঋণখেলাপিদের ওপর সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যা অনেক দেশেই আছে।

সভায় উঠে আসে ঋণখেলাপিরা দেনা শোধ না করে বিলাসী জীবনযাপন করবে, তা যেন না হয়। জমি কেনার ক্ষেত্রে তাদের বাধার সৃষ্টি করা উচিত। তাদের পাসপোর্ট নবায়ন আটকে দেয়ার কথা আসে এখানে। দেশের বাইরে ভ্রমণে বাধা দেয়ার বিষয়টি আসে। এমনকি দেশের ভেতরে যেন প্লেন টিকেট কিনতে না পারে তারা, এ ব্যাপারটিও উঠে আসে।

এদের সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ আটকে দেয়া যেতে পারে বলে অভিমত আসে। এসব ব্যক্তি যেন গাড়ি কিনতে না পারে। কোনো ধরনের যানবাহনের লাইসেন্স যেন না পায় তারা, এ বিষয়গুলোও আসে অন্যান্য অনেক পন্থার পাশাপাশি।

মালয়েশিয়া, চীন, নেপালের মতো খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কটের সিদ্ধান্ত নিলে খেলাপি ঋণ কমে যাবে বলে জোরালো মতামত আসে এ সভায়। তবে বলা হয় যে এটি ফলপ্রসূ করতে হলে আইন সংশোধন করতে হবে। প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবারে শপথ নেয়ার পর তার প্রথম বৈঠকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব (জিরো টলারেন্স) প্রকাশ করেছেন।

আর নতুন অর্থমন্ত্রী প্রথম দিন শপথের পরেই খেলাপি ঋণের ব্যাপারে তার কঠিন অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণ অবশ্যই একটি অপরাধ। এটি জনগণের টাকা, দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এই টাকা কাজে লাগে। এটির সঠিক ব্যবহারের উদ্দেশ্য পূরণ হবে কিন্তু যারা এর অপব্যবহার করেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ঋণখেলাপি সংস্কৃতি একটি সামাজিক-সংস্কৃতিক সমস্যাই বেশি, লিগ্যাল সমস্যা বা লিগ্যাল গভর্নেন্স সমস্যার চাইতে। এ বিষয়টি মনে রেখেই এগিয়ে যাওয়া উচিত। যদি কেউ এখনকার গতিশীল চলমানতায় আশাবাদী হওয়াটাকে যদি একটু নিরাশাজনক দৃষ্টিতে দেখতে চান।

তারাও যেন এই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের (Willful defaulter) বিরুদ্ধে সামাজিক একটি আন্দোলনের (Social Awareness Campaign) জন্য এগিয়ে আসেন। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী আর অর্থমন্ত্রী এগিয়ে আসছেন অনেকটা। তবে সাধারণ জনগণ আসুক এগিয়ে আরো একটু। অনেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি ঋণ খেলাপিরা একটুও ঠিক পথে এগিয়ে আসে। এ দেশ এ জরা থেকে কিছুটা মুক্ত হয়।

তবে যে প্রচণ্ড গতিতে উন্নতি করছে বাংলাদেশ, তা আরো বেগবান হবে। শুধুমাত্র ঋণখেলাপিদের মাধ্যমে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা থামানো প্রয়োজন। এই খেলাপি যত ছোট হোক সেখান থেকেই হোক শুরু। এটি একদিন মহীরুহ হবে। বড় বড় প্রভাবশালী খেলাপিদের রেহাই দিবে না এ ঝড়।

সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি একটু ভাবি তবে স্পিরিচুয়ালিটির আলোকে। মৃত্যু যে আসবে যে কোনো সময়। সন্তানরা যদি প্রশ্ন করে ‘ঋণ নিয়েছিলে, ফেরত দিয়েছিলে কি? আমাদের যে ঋণখেলাপির সন্তান বলে ডাকা হচ্ছে। এতে আমাদের কি দোষ।

একজন রিকশাচালকও তো ঘাম ঝরিয়ে দুটো ডাল-ভাত খাইয়ে সন্তানদের সৎ রোজগারে বড় করছে। মানুষের টাকা ব্যাংক থেকে সরিয়ে দিয়ে নয়’। এ আলোকে প্রত্যেক ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ নিশ্চয় তিরষ্কার করে আমানতের খেয়ানতকারীদের।

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানবকল্যাণে করা প্রতিটি কাজকেই আল্লাহ উত্তম ঋণের মর্যাদা দিয়েছেন, এর মাঝে মানুষের টাকা যা ব্যাংক থেকে নেয়া হয় ঋণ আকারে, তা ফেরত দেয়াটা অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানতের খেয়ানত না করা অন্যতম। যা যথাসময়ে পরিশোধ করতে হবে, নিজের জীবদ্দশায়।

আর এর পাশে অসিয়ত করে যাওয়া উচিত যাতে হঠাৎ মৃত্যু গ্রাস করে নিলেই (যা অবশ্যম্ভাবী) পরিবার-পরিজন তা পরিশোধ করতে এতটুকু দ্বিধা না করে, কষ্ট না করতে হয়। মনে রাখতে হবে ওই ঋণ তো আল্লাহতায়ালা মাফ করবেন না, কারণ তা যে ছিল বান্দার হক (হাক্কুল ইবাদ)।

তাই উত্তরাধিকারদের ভারমুক্ত করে সেই সৃষ্টিকর্তার নির্দেশিত পথে স্থায়ী নিবাস আর চিরকালীন শান্তি অর্জনের জন্য চলুন যথাসময়ে ঋণ ফেরত দেই মৃত্যু আসার আগেই। সময় যে বড় কম।

চৌধুরী মনজুর লিয়াকত : অর্থনীতি বিশ্লেষক।