খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কিছু প্রস্তাবনা

আগের সংবাদ

মাশরাফি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য

পরের সংবাদ

একুশ আসে-যায়, প্রতি বছর একই চিত্র

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯ , ৯:৪৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯, ৯:৪৭ অপরাহ্ণ

আহমদ রফিক

ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক।

একুশের এ দুরবস্থার দায় কার? অবশ্য সমাজের উচ্চ শিক্ষিত এলিট শ্রেণির, সেই সঙ্গে শিক্ষিত শ্রেণির অন্যান্য অংশের, কথিত সুধী নাগরিক সমাজের। দায় সর্বোপরি শাসনযন্ত্রের তথা রাজনৈতিক মহলের। তাদের শ্রেণিস্বার্থ পূরণ হওয়ার কারণে একুশের তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান সর্বস্তরে বাংলা চালু কর, আজ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে উপেক্ষিতই নয়, আবর্জনার স্তূপে নিক্ষিপ্ত। ভূরাজনৈতিক স্বাধীনতা, নতুন পতাকা ও ভূখণ্ডের নতুন নাম ও মানচিত্র নিয়ে তারা মহাখুশি। তাদের তো আর কিছু চাইবার নেই।

ফাল্গুন অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের মনে পড়ে যায় ভাষার জন্য আমরা প্রাণ দিয়েছি, রক্ত ঢেলেছি। ছাত্র যুবারা এ মহৎ কর্মে প্রথম সারির যোদ্ধা। তাদের নিঃস্বার্থ আত্মদানে উদ্বুদ্ধ হয়েছে শিক্ষিত শ্রেণি, পেশাজীবী মানুষ। রক্তের ধারায় প্রবল প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে শহর থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি- অখ্যাত দুর্গম টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া- অচেনা গ্রাম বাজিতপুর, উপেক্ষিত-অবহেলিত মহকুমা শহর মেহেরপুর আর সাগর সংলগ্ন দুর্গম অঞ্চল কক্সবাজার বা সন্দ্বীপ।

গোটা পূর্ববঙ্গ চঞ্চল, বিক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভের মাধ্যমে জেগে উঠেছে মাতৃভাষা বাংলাকেন্দ্রিক ভাষা চেতনা, একুশের চেতনা- সেই ধারায় ভাষাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবোধ। এ জাতীয়তাবোধ যতটা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিভিত্তিক তারচেয়ে কম নয় রাজনৈতিক চরিত্রের বিচারে। ভাষা-জমায়েতে ও মিছিলে পুলিশের ও ইপিআর জওয়ানদের গুলিবর্ষণে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে যেসব শহীদ মিনার তৈরি হলো ঢাকা থেকে দেশের বাইরে সর্বত্র- এমনকি পরে রাজধানী ঢাকায় ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’ সেগুলোও একাধারে সংস্কৃতি ও রাজনীতির প্রতীক। সেই প্রতীক ঘিরে চলছে সংস্কৃতিচর্চা ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রকাশ।

এভাবে ভাষা আন্দোলন যা এ দেশে প্রথম গণতান্ত্রিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনরূপে পরিচিত হয়ে উঠেছে জাতীয় চরিত্রের আন্দোলন দলমত আদর্শ নির্বিশেষে। এ আন্দোলনের মর্যাদা গভীর বিচারে শিকড় থেকে জাতিগত চরিত্রের- তাই বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক নেতাদের মুখেও উচ্চারিত হয় এমন বক্তব্য : ভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও তার অর্জনের সূতিকাগার- সব প্রতিবাদী আন্দোলনের উৎসমুখ। এই উৎসমুখ থেকে উৎসারিত হয়েছে পরবর্তী সময়ের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন, এমনকি পূর্ব-ঐতিহ্যের মুক্তি সংগ্রাম- একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তো বটেই- ছাত্র-যুবা, রাজনৈতিক কর্মী ও জনগণের আত্মদানে। তুলনাহীন এর তীব্রতা, আন্তরিকতা ও বিস্তার। এ আন্দোলনই প্রথম সারা পূর্ববঙ্গ আলোড়িত করেছে, মানুষকে রাজনৈতিক দিক থেকে সচেতন করতে সাহায্য করেছে।

দুই.
একুশে তাই আমাদের সংস্কৃতি ও রাজনীতির নিয়ামক উপাদান- সেটা অবশ্য নির্ভর করে একুশে বা তার প্রতীকগুলোকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করি। একুশের আদর্শিক আকাক্সক্ষাগুলোকে কতটা গ্রহণ, বাস্তবায়ন করি, কতটা উপেক্ষা ও অবহেলা করি। হিসাব-নিকাশ নিতে গেলে দেখা যায়- আমরা এর আনুষ্ঠানিকতাটিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় গ্রহণ করেছি। প্রতি বছর তারই প্রকাশ ঘটাই।

তাই ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে দৈনিক পত্রিকাগুলো ভরে ওঠে একুশে বন্দনায় এবং তা নানা মাত্রায়, নানা রংয়ে, নানা আঙ্গিকে। এরপর বাংলা একাডেমিতে মাসভর অনুষ্ঠানমালা, দেশের গণ্যমান্য নানা বয়সীদের অংশগ্রহণে। বক্তৃতা, গান থেকে বহুবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সর্বোপরি বইমেলা প্রসারিত হয়েছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে বহু পরিচিত রেসকোর্স ময়দানের গাছগাছালির মধ্যে।

বইমেলার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। লেখককে, প্রকাশককে পাঠক-জনতার সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে, ছোটদের বই পড়ায় উৎসাহিত করতে। সারা বছরের প্রতীক্ষা রাজধানী ঢাকায় বইমেলার জন্য। আবার এ কথা সত্য, অপ্রিয় বাস্তব সত্য যে এ মেলায় যতটা বই ক্রেতার আগমন, তারচেয়ে বহু, বহুগুণ বেশি সমাগম নারী-পুরুষ-শিশুদের বিনোদন আকাক্সক্ষা মেটানোর উদ্দেশ্যে। যেমন গ্রামে শিশু ও তরুণদের সাংবাৎসরিক অপেক্ষা নববর্ষের বৈশাখী মেলার জন্য। বিশেষ করে শিশুদের।

বলা হয়ে থাকে, আমাদের কোনো সেকুলার জাতীয় উৎসব নেই একমাত্র বৈশাখী অনুষ্ঠান বাদে, এই সাংস্কৃতিক উৎসব সে প্রয়োজন মেটায়। হয়তো তাই। কিন্তু এই বিষয়ক বিচারে এর নেতিবাচক দিক হলো, বারবার যা দেখি- বইমেলার তড়িঘড়িতে লেখার মান, বইয়ের মান উৎসব-আবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। সারা বছর বই লেখা ও বই প্রকাশের আগ্রহ-উৎসাহে আগেকার তুলনায় ভাটা পড়েছে। এটা মোটেই আকাক্সিক্ষত নয়। শুভ লক্ষণও নয়। বইমেলা বইমেলার মতোই চলুক তার জমজমাট আনন্দ-উৎসবের ঐতিহ্য নিয়ে- মননশীল লেখক-প্রকাশক তাদের সৃষ্টিকর্মের মনে ও উৎকর্ষে যেন ভাটা পড়তে না দেন- যেন যোগ না দেন একুশের সময়-তাড়িত হৈহট্টগোলে।

তিন.
একুশের প্রথম দিনটিতে এই লেখার টানে যে নেতিবাচক দিকগুলোকে উপেক্ষা করতে পারছি না তাহলো এর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের দিকগুলো। যে ভোলে ভুলুক, আমি ভুলতে পারছি না যে একুশের প্রথম স্লোগান ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলেও (১৯৭২) জাতীয় জীবনে এর বাস্তবায়ন অনেক অনেক দূরে রয়ে গেছে।

এই তাৎপর্যময় প্রকাশ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার নিশ্চিতকরণে সেটা আদৌ হয়নি। কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছি- এ বছর একুশে উপলক্ষে যতগুলো টেলিভিশন চ্যানেল বা সাংস্কৃতিক সংগঠন ও পত্রিকার তরফ থেকে মন্তব্য বা সাক্ষাৎকার নিতে এসেছে সবারই মুখে এক কথা- সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার সম্পর্কে কিছু বলুন। এরপর যথারীতি বহুচর্চিত বয়ান, রোমন্থন- যদিও জানি, এসবের ফলাফল শূন্য।

এই যে সংবিধানে লেখা হয়েছে- ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’- যে কথার তাৎপর্য হলো জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করা- এবং যা সর্বস্তরে লঙ্ঘন করা হচ্ছে তাতে কি সাংবিধানিক বা শাসনযন্ত্রের একটি পাতা নড়ছে, কোথাও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, আইনি ব্যবস্থা কি নড়েচড়ে বসছে? উচ্চ আদালত দু’একবার এ সম্পর্কে নির্দেশ জারি করলেও প্রশাসনিক মহলে তা উপেক্ষিত হচ্ছে।

নির্বিচারে চলছে অতীত বিদেশি শাসনের প্রেতচ্ছায়া- তাদের ইংরেজি রাজভাষা ও রাজসংস্কৃতির ভক্তিনিষ্ঠ অনুসরণ- উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা, উচ্চ আদালতের মতো সর্বত্র। রাজধানীতে সর্বস্তরে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল সমারোহ, দুর্মূল্য শিক্ষার আয়োজন। প্রশাসন নির্বিকার। শুধু নির্বিকার নয়, এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণহীন তাদের আচরণে। মাতৃভাষা-রাষ্ট্রভাষা বাংলা শিক্ষায়তনে ধুলোয় গড়াগড়ি যাচ্ছে- দেখার কেউ নেই।

একই অবস্থা উচ্চ আদালতে। আইনজীবীর জেরা থেকে বিচারকের রায় সবই সাবেক রাজভাষা ইংরেজিতে গ্রাম থেকে আসা মামলার বাদী-বিবাদী উভয়ের কাছে তা দুর্বোধ্য। এতে করে নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার কি রক্ষা পাচ্ছে? কিংবা রক্ষিত হচ্ছে সংবিধানের বিধিবিধান? শাসনযন্ত্রের নিয়ন্ত্রকগণ সেসব দিকে নজর দেয়ার প্রয়োজনবোধ করছেন না।

আজ ২০১৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিতে পৌঁছেও এ হলো ‘মহান একুশের’ বেহাল দশার চিত্রচরিত্র- একুশে নিয়ে তরুণ ও নানা বয়সী বাঙালির আবেগ-তাড়নার বাস্তব প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়া। প্রতি বছর একুশে উদযাপন উপলক্ষে বাঙালিয়ানার উপচেপড়া আবেগের এই হলো সঠিক চিত্র। একে কী নামে অভিহিত করব আমরা? বুঝেশুনে আত্মপ্রতারণা, নাকি নিছক উপেক্ষা-অবহেলা শ্রেণিস্বার্থ পূরণের আত্মতৃপ্তিতে।

এবং তা প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক পেশাজীবী থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্ম পর্যন্ত- যা মূলত বিত্তবান পরিবারের উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং ধনী থেকে অতিধনী শ্রেণি পরিবারের সদস্য পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি- তাদের একুশের সত্যকে জানার ও বোঝার ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবও একটি বড় দিক।

একুশের এ দুরবস্থার দায় কার? অবশ্য সমাজের উচ্চ শিক্ষিত এলিট শ্রেণির, সেই সঙ্গে শিক্ষিত শ্রেণির অন্যান্য অংশের, কথিত সুধী নাগরিক সমাজের। দায় সর্বোপরি শাসনযন্ত্রের তথা রাজনৈতিক মহলের। তাদের শ্রেণিস্বার্থ পূরণ হওয়ার কারণে একুশের তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগান সর্বস্তরে বাংলা চালু কর, আজ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে উপেক্ষিতই নয়, আবর্জনার স্তূপে নিক্ষিপ্ত।

ভূরাজনৈতিক স্বাধীনতা, নতুন পতাকা ও ভূখণ্ডের নতুন নাম ও মানচিত্র নিয়ে তারা মহাখুশি। তাদের তো আর কিছু চাইবার নেই। তবু একুশের জঙ্গনামা এদের কণ্ঠেই প্রতি ফেব্রুয়ারিতে পঠিত হতে থাকবে, অতিশয় ভক্তিসহকারে। আত্মপ্রতারণার এই দলিল যেমন রাজনীতির তেমনি সংস্কৃতির মঞ্চে কিংবা পীঠস্থানে প্রদর্শিত ও পঠিত হতে থাকবে বাঙালিয়ানার গর্বিত উচ্চারণে। প্রতিবাদী কণ্ঠ হয় নির্জীব, না হয় মৃত।

আহমদ রফিক: ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা