ধর্ষণ: সামাজিকভাবেই প্রতিরোধ করতে হবে

আগের সংবাদ

বানান ও ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় প্রেরণা হোক ফেব্রুয়ারি

পরের সংবাদ

মাহবুব উল আলম চৌধুরী

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন

লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৯ , ৯:০৯ অপরাহ্ণ

ভাষাসংগ্রামী ও কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর জন্ম ৭ নভেম্বর, ১৯২৭ সাল গহিরা আসাদ চৌধুরী বাড়ি, রাউজান চট্টগ্রামে। পিতার নাম- মরহুম আহমেদুর রহমান চৌধুরী ও মাতার নাম- মরহুম রওশন আরা বেগম। তিনি ১৯৪৭ সালে গহিরা হাইস্কুল থেকে বৃত্তিসহকারে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। রাজনৈতিক কারণে আইএ পড়ার সময় চট্টগ্রাম কলেজ ত্যাগ করার পর আর লেখাপড়া হয়নি।

১৯৪২ সালে চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র কংগ্রেসে যোগদান করে ছাত্র কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী, ভারত ছাড় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বীর বিপ্লবীরা কারামুক্ত হলে জে এম সেন হলে তাঁর মামা আহমদ সাগীর চৌধুরীর নেতৃত্বে যে সংবর্ধনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, তিনি ছিলেন এর উদ্যোগী কর্মী।

১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে প্রগতিশীল মাসিক ‘সীমান্ত’ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় (১৯৪৭-১৯৫২)। এই সীমান্ত পত্রিকায় ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রভাষার ওপর প্রথম সম্পাদকীয় লেখা হয় (সীমান্ত সংগ্রহ, পৃ. ১০৫)। এটা ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত কোনো সাময়িক পত্রিকার প্রথম সম্পাদকীয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পক্ষে এই পত্রিকাটির সাহসী ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।

১৯৪৯ সালের ২২ ও ২৩ নভেম্বর কলকাতার দেশবন্ধু পার্কে যে বিশ্বশান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সেই সম্মেলনে চট্টগ্রাম থেকে মাহবুব উল আলম চৌধুরী এবং শহীদ সাবের যোগদান করেন। সম্মেলন শেষে বেরোনো মিছিল থেকে পুলিশ মাহবুব উল আলম চৌধুরীসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে তালতলা থানায় নিয়ে যায় এবং আলীপুর জেলে প্রেরণ করে।

তিনদিন পর তাঁদের মুক্তি দেয়া হয়। ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মূলনীতি কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সে রিপোর্টে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের কথা উল্লেখ ছিল না। বাংলা রাষ্ট্রভাষা করার স্বীকৃতি ছিল না। তিনি ছিলেন মূলনীতি বিরোধী কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক। (যারা অমর ভাষা সংগ্রামে-১৬)

১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বপ্রথম বিশ্বশান্তি পরিষদের শাখা চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ওই পরিষদের সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫২ সালে তিনি চট্টগ্রাম জেলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নিহত শহীদদের স্মরণে প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ রচনা করেন।

মাহবুব উল আলম চৌধুরী সে সময় চট্টগ্রাম জেলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। আহ্বায়ক হিসেবে চট্টগ্রামে একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচিকে কার্যকর করার জন্য তিনি রাতদিন যে বিরামহীন শ্রমে নিজকে জড়িয়েছিলেন, তারই ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আর সেই অসুস্থ অবস্থায় প্রচণ্ড জ্বরের মধ্যে তিনি ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর শুনে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তখনই রচনা করেন এই ঐতিহাসিক কবিতাটি।

পরে এই কবিতাটি ৫০ হাজার লোকের সমাবেশে লালদীঘি ময়দানে পাঠ করেন চৌধুরী হারুন অর রশীদ। কবিতা পাঠের কারণে তাঁকে কারাভোগ করতে হয়েছে এবং ছাপার কারণে কোহিনূর প্রেসের ম্যানেজার দবির উদ্দিনকেও জেলে যেতে হয়েছিল। এ কালজয়ী কবিতা ও কবি সম্পর্কে ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘একুশের প্রথম কবিতা যে মাহবুব উল আলম চৌধুরী লিখছেন, তা হয়তো এক আকস্মিক ঐতিহাসিক ঘটনা।

কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কবিতা তাকে লিখতেই হতো-’ তাঁর সমগ্র জীবনাচরণ ও সাহিত্যচর্চার ধারায় তা ছিল অনিবার্য। ১৯৫৩ সালে প্রথম অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পার্টি গণতন্ত্রী দল গঠিত হয়। তিনি ছিলেন এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সম্পাদক। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টকে জয়যুক্ত করার জন্য চট্টগ্রামে যে কর্মী শিবির গঠিত হয় তিনি ছিলেন তার আহ্বায়ক।

১৯৫৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম শাখা যুবলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধে নিজেকে জড়িত করেন। ১৯৭২ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ (১৯৭২-৮২) পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন। একুশের প্রথম কবিতার জনক মাহবুব উল আলম চৌধুরী ২৩ ডিসেম্বর, ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন : লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।