জন্মদিনে বাপ্পাকে স্ত্রীর উপহার

আগের সংবাদ

জনসচেতনতায় পূর্ণিমা

পরের সংবাদ

লোকসভা ও বিধানসভায় তুলকালাম

মমতার ‘ধরনা’ চলছে

কাগজ ডেস্ক :

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০১৯ , ৪:৩৯ অপরাহ্ণ

ভারতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে কেন্দ্রের বিরোধ ঘিরে সেখানে জন্ম নিয়েছে চরম নাটকীয়তা। গত রবিবার বিকেলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিবিআই) কর্মকর্তারা কথিত সারদা দুর্নীতি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে কলকাতা রাজ্যের পুলিশ কমিশনারের বাসায় হাজির হওয়ার পরই শুরু হয় তুলকালাম কাণ্ড-কারখানা। পুলিশি বাধার মুখে পড়েন সিবিআই কর্মকর্তারা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করে শেক্সপিয়ার সরণি থানায় নিয়ে যায় কমিশনার রাজিব কুমারের অনুগত রাজ্য পুলিশ। ‘নজিরবিহীন’ এ ঘটনায় পুরো শহরে শোরগোল পড়ে যায়। অবশ্য কিছু সময় পরে সিবিআই কর্মকর্তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
এসব ঘটনা ঘটার পরপরই ত্বরিৎ পুলিশ কমিশনারের বাসভবনে ছুটে যান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তীব্র ভাষায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার বিজেপি দলের অপতৎপরতার নিন্দা জানান। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা এরপর গান্ধীজির সত্যাগ্রহ কর্মসূচির অনুরূপ ধরনা কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে বলেন, মোদি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে গণতন্ত্র ও সংবিধানকে বাঁচাতে তিনি এ অবস্থান নিচ্ছেন। গত রবিবার রাতভর কলকাতার ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে অবস্থান করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সংবিধান ও দেশ বাঁচানোর দাবিতে ধরনা ৮ ফেব্রুয়ারির পরও অব্যাহত থাকবে। তবে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার কারণে ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে মাইক বাজবে না। এ সময়ে অন্য কোথাও যাবেন না তিনি। সরকার বা দলীয় কোনো কর্মসূচিও বাতিল করা হবে না। সোমবার সকালে ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোর সবচেয়ে বড় খবর এটাই। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, রবিবার সন্ধ্যায় সিবিআই এবং রাজ্য পুলিশের বিরোধ যে নজিরবিহীন চেহারা নিয়ে প্রকাশ্য হয়, রাতভর ধরনায় বসে মমতা তাকে কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে রাজ্যের সংঘাতের মাত্রায় নিয়ে গেছেন। এদিকে কলকাতা পুলিশ ও সিবিআই সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে ভারতীয় পার্লামেন্টেও। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই লোকসভার উভয়কক্ষে বিক্ষোভ শুরু করেন তৃণমূল সংসদ সদস্যরা। একপর্যায়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত লোকসভা মুলতবি রাখতে বাধ্য হন স্পিকার। রাজ্যসভাতেও অনুরূপ দুপুর ২টা পর্যন্ত কার্যক্রম মুলতবি রাখেন স্পিকার বেঙ্কাইয়া নাইডু। এদিকে উদ্ভ‚ত সংকট নিরসনে কেন্দ্র সরকার ও সিবিআই কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলেও গতকালের শুনানি পিছিয়ে আজ মঙ্গলবার ওই শুনানি হবে বলে জানায় আদালত। খবর এনডিটিভি, আনন্দবাজার।
মমতার প্রতিবাদ কর্মসূচির সঙ্গে ইতোমধ্যেই একাত্মতা ঘোষণা করেছেন বিরোধীদলীয় প্রায় সব নেতাই। রাহুল গান্ধী ফোনে কথা বলেছেন মমতার সঙ্গে। টুইটার বার্তায় দেশবাসীকে জানিয়েছেনও সে খবর। রাহুল জানান, আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে চলব। বিরোধীরা প্রত্যেকে মোদি ও বিজেপির এই ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করবে। মমতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাকে আরো ফোন করেন উত্তর প্রদেশের চারবারের মুখ্যমন্ত্রী ও বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আমআদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও তেলেগু দেশম পার্টির নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু, সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব ও ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর মতো শীর্ষ নেতারা।
প্রসঙ্গত বছর ছয়েক আগে সারদা ও রোজভ্যালি কেলেঙ্কারিতে এমএলএম ব্যবসার ফাঁদে ফেলে সাধারণ মানুষের হাজার হাজার কোটি রুপি হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টি জানাজানি হয়। এ সময় মমতার তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের আঙুল ওঠে। সেবার ওই কেলেঙ্কারি তদন্তের জন্য কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়। কিন্তু পরে অভিযোগ ওঠে, তদন্তে যেসব তথ্যপ্রমাণ তিনি জব্দ করেছিলেন সেগুলো তিনি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেননি। সিবিআই এখন বলছে, ওইসব প্রমাণপত্র তিনি নাকি ধ্বংস করে ফেলেছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা বিজেপি নেতারাও বলছে, মমতাসহ তৃণমূল নেতাদের বাঁচাতেই তথ্যপ্রমাণ গায়েব করেছেন রাজীব কুমার। ইনডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য কয়েক দফা নোটিশ দিয়েও রাজিবের সাড়া পাননি তারা। এ কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে গুঞ্জন চলছিল বেশ কয়েক দিন ধরে। মমতার এ কর্মসূচির জন্য তাকে রাময়ণের ‘তাড়কা’ রাক্ষসীর সঙ্গে তুলনা করেন বিজেপি নেতা অনিল ভিজে।
আনন্দবাজার জানায়, নাটকীয়তাকে নতুন মাত্রা দিয়ে সিবিআই অভিযানের পরপরই পুলিশ কমিশনারের বাসায় হাজির হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। সেখানে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ, রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র এবং এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) অনুজ শর্মাকে নিয়ে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকশেষে বেরিয়ে মমতা সাংবাদিকদের বলেন, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ, বিজেপির দুই গুণ্ডা মিলে বাংলায় ‘ক্যু’ করার চেষ্টা করছেন। এই ত্রাস জরুরি অবস্থার থেকেও ভয়াবহ। ক্ষমতায় ফিরবেন না বুঝে মোদি পাগল হয়ে গেছেন। এবার কি রাজ্যে ৩৫৫ ধারা জারি হবে, না কি ৩৫৬? মমতা ঘোষণা দেন, মোদি সরকারের হাত থেকে ভারতের ‘সংবিধান বাঁচাতে’ তিনি ধরনায় বসছেন। অপর এক গণমাধ্যম জানায়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে প্রথমে রাস্তার উপরে একটি চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। পরে পাশেই একটি মঞ্চ তৈরি হয়। মঞ্চের পাশেই তৈরি হয় অস্থায়ী ছাউনি, যেখানে মন্ত্রিসভার বৈঠক হবে বলে জানা যায়। মমতা বলেন, সোমবার বিধানসভার বাজেট ঘোষণার সময় তিনি অধিবেশনে উপস্থিত থাকবেন না। বাজেট পেশের আগে মন্ত্রিসভার যে বৈঠক করতে হয় তা তিনি মঞ্চের পাশে ওই ছাউনিতে বসেই করবেন। মমতার ধরনায় ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে রাতেই নেতাকর্মীদের ভিড় লেগে যায়। তৃণমূলের নেতা ও মন্ত্রীদের পাশাপাশি পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকেও দেখা যায় সেখানে। তাকে পাশে নিয়ে মমতা বলেন, কলকাতা পুলিশের বর্তমান কমিশনার বিশ্বের সেরাদের মধ্যে একজন। তার সততা ও সাহসিকতা প্রশংসাতীত। উনি ২৪ ঘণ্টাই কাজে মগ্ন থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকার সময়ও রাজপথে এরকম প্রতিবাদী আন্দোলনে বহুবার দেখা গেছে মমতাকে। সিঙ্গুর আন্দোলনের সময়ে এই মেট্রো চ্যানেলেই টানা ২৬ দিন অনশন করেছিলেন মমতা। এ প্রসঙ্গ টেনে আনন্দবাজার জানায়, লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে বিরোধী দলগুলো যখন সম্মিলিতভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে জোট বাঁধার চেষ্টা করছে এবং কলকাতার ব্রিগেড সমাবেশে শপথ নিয়েছে, তখন তাৎপর্যপূর্ণভাবে মমতার ধরনা দেশের বিরোধী রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেও অভিমত।