সাগরে হঠাৎ ঝড়ে ট্রলার ডুবে মৃত ১, নিখোঁজ ১৪

আগের সংবাদ

দেশ ও শিক্ষা ভাবনা নিয়েই চলতে চাই

পরের সংবাদ

বৃত্তবন্দি

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৯ , ৯:৩৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৯, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ

মযহারুল ইসলাম বাবলা

নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।

যে জাতি যুদ্ধ করে সর্বোচ্চ ত্যাগে নিজ ভূখণ্ড স্বাধীন করেছে, সে জাতির ললাটে এমন পরিহাসতুল্য ভাগ্য লিখন নিশ্চয় ভাবা যায় না। অথচ বাস্তবতা এমনই নিষ্ঠুর যে সেটা খণ্ডাতে আমরা পারলাম না। একের পর এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলেও আমরা যে তিমিরের সেই তিমিরেই রয়ে গেলাম।

আমাদের সামষ্টিক মানুষের বৃত্তবন্দি জীবনের কিন্তু অবসান ঘটল না। ইংরেজ আমল, পাকিস্তানি আমল বিদায় নিয়ে স্বজাতির শাসনামলেরও প্রায় অর্ধ শতক হতে চলল কিন্তু কই আমাদের সমষ্টিগত মানুষ তো সেই বৃত্তবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারল না।

যেখানে ছিল সেখানেই আটকে রয়েছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। কোনো শাসনব্যবস্থাই আমাদের মুক্তি দেবে কি আরো দৃঢ়ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। বাঁধনটা ক্রমান্বয়ে আরো দড় হয়েছে। আমরা হাঁসফাঁস করছি অথচ বৃত্তটা ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারিনি এবং পারছিও না।

অনেকবার সম্ভাবনা উঁকি দিয়েছিল বটে কিন্তু ওই পর্যন্তই, কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি, সম্ভাবনার সব সুযোগই হাতিয়ে নিয়েছে আমাদের শাসকগোষ্ঠী। সমষ্টিগত জনগণকে বঞ্চিত করে।

আমাদের ভূখণ্ডে ঘটে যাওয়া এ যাবৎকালের রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোকে পরখ করলে স্পষ্ট হবে আমরা বড় রাষ্ট্র ভেঙে ছোট রাষ্ট্র নির্মাণ করেছি, বহু ত্যাগ-তিতিক্ষায় একের পর এক আন্দোলন-সংগ্রাম সংঘটিত করেছি, অর্জনও হয়েছে কিন্তু সব অর্জন চলে গেছে কতিপয়ের করতলে।

মূল কারণটি ব্যবস্থার বৃত্তটা ভাঙতে না পারার মধ্যে নিহিত। ওই ব্যবস্থার একই বৃত্তে কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছি। এর অন্তর্নিহিত কারণটা কি? ওই কারণটি অনুসন্ধানে কিংবা শনাক্তে বারবার ব্যর্থ হয়েছি বলেই আমাদের সামষ্টিক মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। আমরা শাসক বদলেছি, রাষ্ট্র বদল করেছি কিন্তু রাষ্ট্রকে গণমুখী করতে পারিনি।

তেমনি পারিনি শাসকশ্রেণির বৃত্ত অতিক্রম করে জনগণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করতেও। ওই কাজটি করতে না পারার কারণেই এত ত্যাগ-আত্মদানেও ইপ্সিত লক্ষ্যে আমরা পৌঁছতে পারিনি। যেখানে ছিলাম সেখানেই আটকে আছি। কেন আটকে আছি? উত্তরণের উপায় কি?

এ প্রশ্নের সদুত্তর শনাক্তে পরিত্রাণের পথটি আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে। যতদিন এসব প্রশ্নের মীমাংসা করা সম্ভব না হবে ততদিন আমরা বৃত্তটি অতিক্রম করতে পারব না। কেবল অপচয় হবে সময়ের, জীবনের এবং সর্বোপরি ত্যাগ-আত্মত্যাগেরও।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনতা থেকে ভূখণ্ডে মুক্তি ঘটেছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা রয়ে গেছে ব্রিটিশদের অনুগত শাসকশ্রেণির করতলে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের ভূখণ্ড স্বাধীন হলেও রাষ্ট্রের ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটেছে স্বজাতি জাতীয়তাবাদী শাসক শ্রেণির কাছেই।

সর্বস্তরের জনগণের সর্বোচ্চ ত্যাগে-আত্মদানেও জনগণের ক্ষমতা লাভ ঘটল না। ক্ষমতা রয়ে গেল ওই বিজাতীয় শাসকদের অবিকল স্বজাতি শাসকদের করতলে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ পৃথক পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পেলেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি সমষ্টিগত মানুষের অধিকার ও সুযোগের সমতা।

ধন-বৈষম্য তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও নির্ধনদের সংখ্যাও কিন্তু অগণিত। এই যে শ্রেণি বিভাজনের স্থায়ী মীমাংসা না হওয়া; ব্যক্তিমালিকানার স্থলে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা না হওয়ার মধ্যেই আমাদের সব সম্ভাবনা-আকাক্সক্ষা পরাভূত হয়েছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ঘোষিত যে তিনটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র। সে ঘোষণা দিয়েছিলেন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। অথচ স্বাধীনতার পর তিনটি মূল ভিত্তি থেকে শাসক দলগুলো একে একে সরে দাঁড়ায়। এক কথায় পশ্চাৎপসারণ।

ওই অতীতের ব্রিটিশ, পাকিস্তানি রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই অপরিবর্তিত রেখে স্বজাতি শাসকদের বৃত্তাবরণে আমরা বাঁধা পড়ে যাই। মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনার অন্তর্গত গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা বলে বাস্তবে কিছু নেই। কাটা-ছেঁড়ার পরও সংবিধানে রয়েছে সত্য তবে সেটা কাগুজেই বলা যায়। বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তার ছিটেফোঁটাও আচারে-প্রয়োগে নেই।

যে জাতি যুদ্ধ করে সর্বোচ্চ ত্যাগে নিজ ভূখণ্ড স্বাধীন করেছে, সে জাতির ললাটে এমন পরিহাসতুল্য ভাগ্য লিখন নিশ্চয় ভাবা যায় না। অথচ বাস্তবতা এমনই নিষ্ঠুর যে সেটা খণ্ডাতে আমরা পারলাম না। একের পর এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলেও আমরা যে তিমিরের সেই তিমিরেই রয়ে গেলাম।

আমাদের শাসকরা সব সম্ভাবনাকে একে একে হরণ করে সমষ্টিগত মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটতে দিল না। তারাই যেমন পেয়েছে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা তেমনি ক্ষমতাও। ওই ক্ষমতার ছড়ি হাতে করছে শাসন, শোষণ, নিপীড়ন। আমাদের অপ্রাপ্তির পাশাপাশি প্রাপ্তিও কিন্তু কম অর্জিত হয়নি।

অথচ সব প্রাপ্তি কেবলই কতিপয়ের অধীন হয়েছে, সমষ্টিগতদের কাছে ধরা দেয়নি, অধরাই রয়ে গেছে। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলে আমাদের মধ্যে যে হতাশা ছেয়ে পড়েছে। সেটা অস্বীকার করা যাবে না। এই হতাশার কারণেই মানুষ কোনো ব্যক্তি বা দলের ওপর আর ভরসা রাখতে পারছে না।

তাই দেশের চরম দুঃসময়েও মানুষ জেগে জেগে ঘুমাচ্ছে। কারো ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। তাদের মস্তিষ্কে ঢুকে পড়েছে, অনেকবার তো হলো আর কাঁহাতক। ত্যাগ-আত্মত্যাগের দীর্ঘ পরম্পরায় তাদের তো ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, তবে কেন অহেতুক ত্যাগ-আত্মত্যাগ করা!

বাস্তবতা হচ্ছে হতাশ হলে তো আর সম্ভবনার কোনো উপায়ই থাকবে না। তাই হতাশার জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতেই হবে। অতীতে হয়নি বলে আগামীতে যে হবে না এটা ভাবি কেন। ইতিহাসের শিক্ষা তো আমলে নিতেই হবে। দাসযুগ, সামন্তযুগের অবসান এমনি এমনি ঘটেনি। যুগ-শতাব্দীব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ঘটেছে।

বর্তমান বুর্জোয়া ব্যবস্থাধীনের শোষণ-বঞ্চনারও অবসান ঘটবে সংঘটিত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। স্বীকার করতে হবে, হতাশ হওয়া পরাজয় স্বীকার করারই নামান্তর। হতাশ হলে চলবে না। আমাদের এগুতে হবে, সামনে আরো সামনে। বন্ধুর সেই পথ মসৃণ নয়। সে পথ কণ্টকাকীর্ণ। থামলে চলবে না, হতাশ হলেও নয়। সব প্রতিকূলতাকে পরাস্ত করেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

আমার প্রয়াত বাবা কৌতুক করে বলতেন, তার এই জীবনে পৃথক তিন রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছেন, দেশের মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু বদল ঘটেনি রাষ্ট্র ব্যবস্থার, অতীতের অভিন্ন ব্যবস্থারই অধীনতা লাভ করেছেন তিন ভিন্ন রাষ্ট্রাধীনে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ পৃথক তিন রাষ্ট্র হলেও ব্যবস্থা কিন্তু এক এবং অভিন্নই রয়ে গেছে। তাই আক্ষেপে বলতেন, বাড়ির রং বদলেছে কিন্তু কাঠামোর বদল কোনো রাষ্ট্রেরই ঘটল না। সমষ্টিগত মানুষের হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় কি!

আমাদের সমষ্টিগত মানুষরা ধোঁকা খেয়ে খেয়ে বোকা-বধির হয়ে পড়েছে। তাদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে নতুন দিনের বার্তা পৌঁছাতে হবে। প্রশ্ন থাকে কাজটি কারা করবে। করবে তারাই যারা দেশপ্রেমিক এবং যারা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে মেনে না নিয়ে এই ঘৃণ্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস রাখেন।

তারা নিজেরা সংগঠিত হলেই সবাইকে সংগঠিত করতে পারবে, তার আগে নয়। তাই সর্বাগ্রে জরুরি তাদের নিজেদের মধ্যকার ঠুনকো মতপার্থক্য, বিভাজন, বিভক্তিকে উৎপাটিত করে সংগঠিত হওয়া। তাদের সংগঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের সমষ্টির মুক্তিলাভ সম্ভব হবে বলেই মনে করি।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পরই জাতিগত সমস্যার নিরসন হয়েছে। কিন্তু শ্রেণি সমস্যার সমাধান স্বাধীন দেশের একটি সরকারও করেনি। অথচ মুক্তিযুদ্ধে ঘোষিত ওই তিন রূপরেখার মধ্যেই শ্রেণি সমস্যার সমাধানের স্পষ্ট ঘোষণা ছিল। শ্রেণি সমস্যার সমাধান না হওয়ার কারণেই সমাজ ও রাষ্ট্রে শ্রেণি বৈষম্য তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে।

শ্রেণি সমস্যার নিরসনেই সব মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব। যেটা আমাদের শাসক শ্রেণি করেনি, করবে না, তাদের শ্রেণিস্বার্থেই। এই শ্রেণি সমস্যা নিরসনে সংগঠিত আন্দোলন-সংগ্রামের বিকল্প কিছু নেই। একমাত্র সংঘটিত আন্দোলনেই সমষ্টিগত মানুষের মুক্তি সম্ভব। বিদ্যমান বৃত্তবন্দিত্ব থেকে মুক্তিও।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।