বৃত্তবন্দি

আগের সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ

পরের সংবাদ

দেশ ও শিক্ষা ভাবনা নিয়েই চলতে চাই

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৯ , ৯:৪৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৯, ৯:৪৭ অপরাহ্ণ

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হতে যাচ্ছে। তার আগে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের কাছে তুলে ধরার মতো করে লেখা উচিত। একইসঙ্গে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের আর্থসামাজিক রাজনীতি শিক্ষা-সংস্কৃতি ইত্যাদির বহু খণ্ডের বইপুস্তক রচনায় এখনই সরকারের প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন। তাহলেই কেবল এমন ঐতিহাসিক ঘটনার উদযাপন হবে তাৎপর্যমণ্ডিত।

গত ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ পঁয়ষট্টি বছর পূর্ণ হওয়ায় আমি শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসরে চলে এসেছি। এরই মধ্যে আমার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীর অনেকেই আমাকে অবসর সময়টি কীভাবে কাটাব তা জানতে চেয়ে ফোন করেছে আবার কেউ কেউ ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে চেয়েছে। নিজের সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। অবচেতনে যদি আত্মতুষ্টি বা প্রশংসার প্রকাশ ঘটে যায়- সেটি সুখকর হওয়ার নয়।

শিক্ষকতা জীবনটি আমি চাকরি হিসেবে নেয়নি, মিশন হিসেবেই দেখার চেষ্টা করেছি। এ সম্পর্কে আমার সাবেক ছাত্রছাত্রীরাই ভালো বলতে পারবে। কিছুটা হয়তো আমার সমকর্মীরাও বলতে পারেন। যদি বলেন, তাহলে বুঝতে পারব আমি কতটা সফল বা ব্যর্থ শিক্ষক ছিলাম।

তবে এটুকু বোধহয় বলতে পারব যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২-৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খণ্ডকালীন বা পূর্ণকালীন যেভাবেই ক্লাস নেয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলাম- চেষ্টা করেছি সময়মতো ক্লাসে যাওয়া, ক্লাসগুলো আমার সর্বোচ্চ দিয়ে নেয়ার। জানি না সে ক্ষেত্রে কতটা শিক্ষার্থীদের আমি আকৃষ্ট করতে পেরেছি।

সেই ভার তাদের কাছেই রইল। তবে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি করা আমার একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। এটিকে আমি অনেকটা বড় পরিসরের দ্বারস্থ হওয়া হিসেবেই দেখেছি। ১৯৮৫ সাল থেকে নিয়মিত পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে আসছি। এ পর্যন্ত আমি কতটি লেখা পত্রিকায় লেখেছি তার পরিসংখ্যান রাখিনি। তবে লিখতে লিখতে বেশকিছু বিষয় আমার অবচেতনেই চলে এসেছে যেগুলো পরবর্তী সময়ে দেশে অনেকের কাছেই এখন বেশ জানা বিষয়।

যেমন আশির দশকের মাঝামাঝি আমি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বকোণ এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত মাসিক শিক্ষাবার্তায় পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে লেখালেখি শুরু করি। প্রসঙ্গটি অবশ্য আমি সত্তরের দশকের শেষের দিকে আমার এমএ এবং পিএইচডি থিসিসে গবেষণায় নিয়ে এসেছিলাম।

সেটি আমি আশির দশকের শেষ দিকে পত্রপত্রিকায় সবার দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা করেছিলাম। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে ইতিহাস ‘পঠনপাঠন’ শিরোনামে প্রকাশিত বইতে এসব স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা এবং ৭ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান ইত্যাদি রাজনৈতিক ঘটনার মূল্যায়ন সূচক বেশকিছু লেখা আশির দশকের শেষ নব্বই দশকের শুরুতে বিভিন্ন জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকি।

তখন এসব বিষয় নিয়ে খুব কমই লেখালেখি হতো। ইতিহাসের একজন নগণ্য শিক্ষক হিসেবে জাতীয় জীবনের এসব দুঃখজনক ঘটনা নিয়ে তখন লেখালেখি করাটি আমার পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে মনে করেছি। তখন অনেকেই ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করে লিখতেন।

আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি এতে বিপ্লব নয় প্রতিবিপ্লব বরং। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর হত্যা এবং জেলহত্যাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রকারীদের সংঘটিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করি। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট রচনার অন্যতম প্রধান ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছি দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত কয়েকটি লেখাতে।

১৯৯৬ সালে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল স্কুল পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস সংশোধন করার কমিটিতে কাজ করার। এই দায়িত্বটি ২০০৯ সালেও আবার পালন করার সুযোগ পেয়েছি। লেখালেখির সুবাদেই ২০০০ সালের শুরুর দিকে এক সময়ের ন্যাপ নেতা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতা মোনায়েম সরকার আমাকে একদিন টেলিফোন করে তার চামেলিবাগের বাসায় দেখা করার আমন্ত্রণ জানালেন।

তিনি আমাকে বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি মৌলিক গ্রন্থ রচনায় অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানালেন। আমি দেখেছি যে এই গ্রন্থের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বেশিরভাগই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সুতরাং তারা হয়তো তাদের বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে চেনা-জানার স্মৃতি সংবলিত লেখা লিখবেন। পরে বুঝতে পারলাম না এটি স্মৃতিচারণমূলক নয় বরং নতুন তথ্য সংবলিত গবেষণাধর্মী বই হতে পারে।

কিন্তু মোনায়েম সরকার দুবছর ধরে বইয়ের কাজ খুব বেশি এগোতে পারেননি। আমি তাকে অনুরোধ করি যে এভাবে বোধহয় বইটি কোনো নতুন আবেদন সৃষ্টি করতে পারবে না। আমি তাকে প্রস্তাব দেই যে বঙ্গবন্ধুর ওপর মৌলিক কোনো বই লিখতে হলে পাকিস্তান আমলের গোয়েন্দাদের পুলিশ ফাইলগুলো সংগ্রহ করা গেলে বঙ্গবন্ধুর ওপর নতুনভাবে বই লেখা যেমন সম্ভব হবে বইটি ব্যাপক আবেদনও সৃষ্টি করতে পারবে। আমি দুই খণ্ডের বইটির শিরোনাম, সূচিপত্র নতুন করে ঢেলে সাজিয়ে বইটিকে নতুনভাবে লেখার প্রস্তাব করেছি।

প্রস্তাবটি তিনি সম্পাদনা পরিষদে উপস্থাপনের মাধ্যমে অনুমোদন করিয়ে নেন। কিন্তু সমস্যা হলো দলিলপত্র কোথায় পাবেন, কীভাবে পাবেন, সেটি নিয়ে আমি বারবার অনুরোধ করতে থাকি যে আপনি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) আর্কাইভ থেকে তাদের সহযোগিতায় তা উদ্ধার করতে পারেন।

প্রায় ছয় মাস এ নিয়ে মোনায়েম ভাইয়ের সঙ্গে আমার কথাবার্তা চলতে থাকে। বইটি লেখানোর তাড়া থাকায় তিনি আমাকে দ্রুত লেখার কাজে হাত দিতে অনুরোধ করতে থাকেন। আমিও তাকে দলিলগুলো সম্পর্কে খোঁজ নিতে বারবার চাপ দিতে থাকি। বেশ কিছুদিন তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন।

হঠাৎ একদিন তিনি আমাকে ফোন করে দলির উদ্ধারের খবর জানালে আমি তাৎক্ষণিকভাবেই তার বাসায় উপস্থিত হই। টেবিলে ১২ খণ্ডের দলিলপত্র দেখে আমি নিজেই আত্মহারা হয়ে পড়ি। সেদিন থেকেই পুলিশের এসবি ইন্সপেক্টর এই ১২টি খণ্ড এনে দিয়ে বলেছেন দ্রুত এগুলো ফটোকপি করে তাকে ফেরত দিতে।

মোনায়েম সরকার আমার পরামর্শে দলিলপত্রগুলো ফটোকপি করানোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবেই একটি ফটোমেশিন কিনে নিয়ে আসলেন। ধুলাবালি পরিষ্কার করে ফাইলগুলোর ভিতরে একদিকে বঙ্গবন্ধুর ওপর ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত অসংখ্য রিপোর্ট পত্রিকার কাটিং, ২-১টি ছবি দেখে আমি অভিভূত হয়ে যাই। এরপরই মোনায়েম সরকার আমাকে ১২টি খণ্ডের ফটোকপি হস্তান্তর করেন। আমি দ্রুত এর ওপর ভিত্তি করে প্রথম খণ্ডের দ্বিতীয় অধ্যায়টি ‘১৯৪৭-এর রাজনীতির ভাঙা-গড়ার পর্ব : মুজিব নেতৃত্বের উত্থান’ লেখা শুরু করি।

২০০১ সালে এর একটি মোটামুটি খসড়া দাঁড় করাই। এরপর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হওয়ার পর প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালে দুই খণ্ডের ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জীবন ও রাজনীতি’ বইটি প্রকাশিত হয়। এই বইতে পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর ১২টি ফাইলে থাকা অনেক তথ্যই পরিশিষ্টে দেয়া আছে। পরবর্তী সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে আরো বেশকিছু ফাইল উদ্ধার করা হয়েছে।

যেগুলো এখন প্রকাশিত হচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগ দেখে আমার বেশ ভালো লাগছে, যে বঙ্গবন্ধুর ওপর মৌলিকভাবে কিছু লেখার উপাদান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর লেখার বইগুলো পাশাপাশি দলিলসমূহ বিশেষভাবে কাজে লাগবে। তবে আমার অনুরোধ থাকল পাকিস্তান যুগের এসবি আর্কাইভে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার ওপরও কমবেশি বেশকিছু গোয়েন্দা ফাইল থাকা খুব স্বাভাবিক।

সেসব ফাইলে প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধুর বিষয় লেখা থাকতে পারে। এ ছাড়া সব নেতার ওপর গোয়েন্দা ফাইলসমূহে পাকিস্তানি শাসকদের বাঙালি নেতাদের প্রতি কি ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, বিভিন্ন ঘটনাবলিতে কার কি ভূমিকা ছিল এসবই কম-বেশি থাকা স্বাভাবিক। সেসব গোপন ফাইল এখন উন্মুক্ত করা হলে পাকিস্তান কালের রাজনীতির ইতিহাস নতুনভাবে লেখা ও গবেষণা করা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে।

২০০৯-১০ সালের দিকে দৈনিক জনকণ্ঠ ও কালের কণ্ঠে আমি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের নানা প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বেশকিছু লেখা লিখেছিলাম। তখন প্রসঙ্গক্রমে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি সরকারি দালিলিকরণ করারও আহ্বান জানিয়েছিলাম। আমার মনে হয় সরকার বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণটিকে গুরুত্ব দিতে পেরেছে। সে কারণেই বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি ইউনেস্কো কর্তৃক অন্যতম সেরা ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

তবে যে কাজটি এখনো করা হয়নি তাতে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া খুবই জরুরি, সে কাজটি হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে কারা কারা জড়িত ছিল সেটি তদন্ত করা। তাহলে ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রকৃত পরিচয় সবার কাছে জানা হবে।

বাংলাদেশের এই অধ্যায়ের নির্মম ইতিহাস তুলে ধরা সম্ভব হতো। এ ছাড়া স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাজনীতির নানা উত্থান-পতনের নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনা করা খুবই জরুরি। এ কাজগুলো এখনই সরকারের বিশেষ সহযোগিতায় করা প্রয়োজন। আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হতে যাচ্ছে।

তার আগে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের কাছে তুলে ধরার মতো করে লেখা উচিত। একইসঙ্গে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের আর্থসামাজিক রাজনীতি শিক্ষা-সংস্কৃতি ইত্যাদির বহু খণ্ডের বইপুস্তক রচনায় এখনই সরকারের প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন। তাহলেই কেবল এমন ঐতিহাসিক ঘটনার উদযাপন হবে তাৎপর্যমণ্ডিত।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।