খাদ্যে ভেজাল ও আমাদের করণীয়

আগের সংবাদ

সাগরে হঠাৎ ঝড়ে ট্রলার ডুবে মৃত ১, নিখোঁজ ১৪

পরের সংবাদ

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন

লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৯ , ৯:২৩ অপরাহ্ণ

বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা বর্ণমালা, বাংলা সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের গৌরব ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ছিলেন ভাষাতাত্ত্বিক ও পণ্ডিত, বহু ভাষাবিদ একজন যুগশ্রেষ্ঠ বাঙালি। যখনই বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে তখনই তিনি গর্জে উঠেছেন। বাংলা ভাষা-বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা কি না- এ বিষয়ে বিতর্ক শুরু হলে তিনি একাধিক প্রবন্ধে ও ভাষণে বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।

১৯১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলন’-এর দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমরা বঙ্গদেশবাসী। আমাদের কথাবার্তার, ভয়, ভালোবাসার, চিন্তা কল্পনার ভাষা বাংলা।’ উপমহাদেশে বৃহত্তর ক্ষেত্রে ভাষাতাত্ত্বিকের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।

১৯২০ সালে ভারতের সাধারণ ভাষা (লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা) নির্ধারণের জন্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক প্রবন্ধের মাধ্যমে হিন্দির বিরোধিতা করে বাংলা ভাষার দাবি উপস্থাপন করেন।

আলোচ্য প্রবন্ধে তিনিই সর্বপ্রথমে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করে বলেন, ‘শুধু ভারতে কেন, সমগ্র এশিয়া মহাদেশেই বাংলা ভাষার স্থান হবে সর্বোচ্চ’ (সূত্র : মুসলিম ভারত : ১ম বর্ষ, কার্তিক, ১৩২৭)। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শহীদুল্লাহর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়।

তমদ্দুন মজলিসের পক্ষে ১৫ সেপ্টেম্বর ভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ওইদিন বিকেল ৪টায় নূপুর ভিলায় (তৎকালীন সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ছাত্রাবাস, আজকের ঢাকা কলেজ) একটি ঘরোয়া সেমিনারে ভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকার ওপর বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং ঘোষণাপত্র অনুযায়ী আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার কর্মকৌশল নির্ধারণী এ মহতী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯৪৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর গঠিত হয় প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারাদেশে পালিত হয় প্রথম ধর্মঘট।

ড. শহীদুল্লাহ তখন বগুড়া আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপাল। শুধু লেখা আর আলোচনায় নয়, তিনি সশরীরে সেদিন মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। ওই মিছিল শেষে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বগুড়া জেলা স্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত জনসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন।

পাকিস্তানি শাসকচক্রের বাংলা ভাষাকে ধ্বংসের চক্রান্তের ব্যাপারে যারা সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাদের মধ্যে অন্যতম। ৪ মার্চ, ১৯৪৯ তারিখে ফজলুল হক হল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত তমদ্দুন মজলিসের এক সাহিত্য সভায় তিনি আরবি হরফে বাংলা লেখার বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন (সূত্র : সাপ্তাহিক সৈনিক, ১১ মার্চ, ১৯৪৯)।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং আন্দোলনের প্রেরণার উৎস ছিলেন ড. শহীদুল্লাহ। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলি চালানোর পূর্ব উত্তেজনার মুহূর্তে তিনি কলাভবন চত্বরে আটকেপড়া শিশুদের রক্ষা করেন।

পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে শিশু-কিশোরদের নিরাপদ আশ্রয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। ড. শহীদুল্লাহর তাৎক্ষণিক ও বুদ্ধিদীপ্ত নির্দেশে কিছু ছাত্র কলাভবন আর মেডিকেল কলেজের মাঝে যে প্রাচীর তার এক অংশ ভেঙে ফেলেন। কলাভবন হতে বের হওয়ার একমাত্র পথ লৌহকপাট বা গেট তখন সম্পূর্ণভাবে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে।

ড. শহীদুল্লাহর নির্দেশিত কলাভবন ও মেডিকেল কলেজের মাঝে ভাঙা প্রাচীরের বিকল্প পথে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা ও শিশু-কিশোররা বের হয়ে যায় এবং মূল মিছিলটি এই পথ দিয়েই অগ্রসর হয়ে মেডিকেল ব্যারাকে জমায়েত হয় এবং আজকের শহীদ মিনার চত্বরে এসে পৌঁছেছিল।

সেই বৃদ্ধ বয়সে ময়দানে যুদ্ধ করার মতো অবস্থা তাঁর না থাকলেও তিনি নিশ্চুপ বসে ছিলেন না তিনি গুলি হওয়ার ঘটনা শোনার পর আবার দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছুটে আসেন। আহত ছাত্র-জনতার সেবা-যত্ন করার মতো মহতী কাজ নিজ হাতে করেন।

একুশের নৃশংস হত্যাকা-ের বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি করেছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১ মার্চ ১৯৫২ তারিখে মুন্সীগঞ্জে অনুষ্ঠিত ঢাকা জেলা শিক্ষক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি ওই দাবি করেন (সূত্র : দৈনিক আজাদ, ৩ মার্চ ১৯৫২)।

বায়ান্নর ঐতিহাসিক মিছিলে তিনি নিজে যেমন অংশগ্রহণ করেছেন তেমনি নিজ সন্তানদেরও অংশগ্রহণের জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন। ১৯৫২ সালের পরও বাংলা ভাষাকে যখন রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে নানা ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিল, তখনো ড. শহীদুল্লাহ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে।

১৯৫৪ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকার কার্জন হলে ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘… যারা জবরদস্তিক্রমে সব পাকিস্তানের ওপর কোনো একটি ভাষা (উর্দু) চাপিয়ে দিতে চায়, তারাই পাকিস্তানের দুশমন, তারাই পাকিস্তানের ধ্বংস করবে।’

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন : লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।