হাইকোর্টের নির্দেশ মানুন

আগের সংবাদ

আওয়ামী লীগের ইশতেহার : প্রসঙ্গ ঋণখেলাপি

পরের সংবাদ

চট্টগ্রাম রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ২৯, ২০১৯ , ৮:৫৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ২৯, ২০১৯, ৮:৫৪ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

মহসীন কাজী

যুগ্ম মহাসচিব, বিএফইউজে।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ। শেষ পড়ালেখাও। এবার ভাবনা জীবিকা। কিছু করা। কর্মের সন্ধান। অংশ নেন প্রথম বিসিএস পরীক্ষায়। কাঙ্ক্ষিত ফল পেলেন। এবার সরকারি চাকরিতে যাওয়ার পালা। তার আগে গেলেন নেতার (জাতির পিতা) কাছে। জানালেন বিসিএস পাসের কথা। খুশি হলেন নেতা, জড়িয়ে নিলেন বুকে। জাতির পিতা বললেন, ‘তোর জন্য আরো বড় কিছু অপেক্ষা করছে। চাকরি নয়, তুই এমপি হবি- প্রস্তুত হ।’

আর গেলেন না চাকরির দিকে। হাঁটলেন জাতির পিতার দেখানো পথে। আরো সক্রিয় হলেন রাজনীতিতে। ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে পেলেন দলের মনোনয়ন। ফটিকছড়িবাসীর ভোটে হলেন প্রথম সংসদের কনিষ্ঠ সদস্য। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং মাত্র ২৭ বছর বয়সে এমপি হওয়া প্রসঙ্গ আসলেই জীবদ্দশায় নুরুল আলম চৌধুরী বলতেন জাতির পিতার এ উৎসাহের কথা।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর খুনি মুশতাক বেতার ভাষণে দাবি করেন, ‘ঐতিহাসিক কারণে শেখ মুজিবকে (খুনির ভাষায়) হত্যা করা হয়’। তারপর এমপিদের নানাভাবে চাপ দিয়ে বৈঠকে বসেন খুনি মুশতাক। সেখানে আবারো বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে নিজের যুক্তি তুলে ধরে বক্তব্য দেন খুনি। খুনির বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যান এক তরুণ এমপি।

তিনি মুশতাকের মুখের ওপর জানতে চান, ‘কোনো ঐতিহাসিক কারণে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে, তার জবাব আপনাকে দিতে হবে।’ সেই টগবগে প্রতিবাদী তরুণ এমপি হলেন নুরুল আলম চৌধুরী। শুধু কী তাই। জীবনভর ছিলেন নির্লোভ। সারাজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল থেকেছেন। তার প্রমাণ রেখে গেছেন জীবনের পরতে পরতে।

পঁচাত্তরের পর মন্ত্রিত্ব এবং অনেক লাভজনক পদের অফার পেয়েও আওয়ামী লীগের হাল ছাড়েননি। এক পর্যায়ে নেমে আসে কঠিন নির্যাতন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করায় খুনি মুশতাক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হন। তখন কারাগারে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। তবুও দুঃসময়ে আঁকড়ে রেখেছেন প্রিয় দলকে। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে খুনি মুশতাক, জিয়া ও এরশাদের লোভনীয় অফার বাদ দিয়ে এগিয়ে চলেছেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ছিল নুরুল আলম চৌধুরীর।

১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাসের পর ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে। কলেজে ছাত্রলীগের সংগঠন যাত্রিকের মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে গড়া আন্দোলনে ছিলেন প্রথম সারির নেতা। এ আন্দোলনে সহপাঠী নুরুল কুদ্দসসহ জেল খাটেন।

১৯৬৪ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হন ১৯৬৬ সালে। ১৯৬৯ সালের প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে স্নাতকোত্তর পাস করেন। মাস্টার্স পাসের পর ফতেয়াবাদ কলেজে অবৈতনিক অধ্যাপনা করেন কিছুদিন। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল তাঁর।

তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। সত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে নুরুল আলম চৌধুরী ছিলেন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর উপপ্রধান। তখন কক্সবাজার থেকে মিরসরাই পর্যন্ত বিশাল এলাকায় আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।

একাত্তরে মার্চে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার দিনই মাইক নিয়ে নেমে পড়েন। মাইকে রাখাল চন্দ্র বণিকসহ তিনজন মিলে ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। যার যা আছে তা নিয়ে দুই নম্বর গেট, ক্যান্টনমেন্টের দিকে অগ্রসর হন। বন্ধ করে দেন রাস্তাঘাট-সবকিছু’ প্রচার শুরু করেন। আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর পক্ষে নুরুল আলম চৌধুরীরা এম এ হান্নানের নেতৃত্বে সোয়াত জাহাজে অস্ত্র খালাসে বাধায় অংশ নেন।

তারও আগে ইপিআরকে রসদ জোগানোসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা সাহায্যসামগ্রী বিতরণ করতেন। পাক বাহিনীর শেলিং শুরু হলে তারা পটিয়া থেকে ফটিকছড়ি হয়ে রামগড় চলে যান। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। রামগড়ে সংঘটিত যুদ্ধে ক্যাপ্টেন কাদেরের (আফতাবুল কাদের) মৃত্যুর পর তাদের দল চলে যায় ভারতের সাব্রুম হয়ে উদয়পুর।

প্রথম ব্যাচের যোদ্ধা হিসেবে বাগাফা ক্যাম্পে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকে যোদ্ধাদের বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। নুরুল আলম চৌধুরীকে পাঠানো হয় আগরতলায়। উচ্চশিক্ষিত হিসেবে তাকে ইয়ুথ ক্যাম্পে সহকারী পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র ট্রাস্টের ভিডিও আর্কাইভে যুদ্ধদিনের এসব স্মৃতিচারণ করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সরকারি আমলা না হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া এবং প্রথম সংসদে কনিষ্ঠ সদস্য হওয়া সবই তার জীবনের উজ্জ্বল ইতিহাস। তারপরের ইতিহাস আরো কঠোর সংগ্রামের। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আমৃত্যু লড়াই করে যাওয়া নুরুল আলম চৌধুরী টিকে ছিলেন স্বকীয়তায় এবং নিজের যোগ্যতায়।

জাতির পিতার মতো তার কন্যারও আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। জননেত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে নুরুল আলম চৌধুরীকে মনোনয়ন দেন। সেবারও বিপুল ভোটে ফটিকছড়ি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তখনো প্রলোভনের হাতছানি ছাড়েনি তাকে। এরশাদ সরকারের পক্ষ থেকে অফার ছিল, জাতীয় পার্টিতে গেলেই মন্ত্রিত্ব। যথারীতি ফিরিয়ে দেন সেই লোভনীয় প্রস্তাব।

তিনি বলতেন, ‘আমার আদর্শ একটাই- সেটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু। এ আদর্শে থেকেই মরতে চাই’। জীবনের নানা বাঁকে অনেক সময় কঠোর অর্থকষ্টে পড়লেও আদর্শ বিচ্যুত হননি। কারো লোভ, প্রলোভন টলাতে পারেনি এই নেতাকে। তাই তিনি সততার উদাহরণ হয়ে থাকবেন আগামী প্রজন্মের কাছে।

তিনি ১৯৯৭ সালে রূপালী ব্যাংকের পরিচালক ও ২০১০ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য, চবি রেজিস্ট্রার্ড গ্র্যাজুয়েট ফোরামের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের আজীবন দাতা সদস্য, ঢাকার চট্টগ্রাম সমিতি, পরিবার পরিকল্পনা সমিতিসহ চট্টগ্রাম ও ফটিকছড়ির বিভিন্ন শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক রাজনীতিতে প্রচার সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সহসভাপতি ও সর্বশেষ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উচ্চবংশীয় এবং সুশিক্ষিত মানুষ হলেও ছিলেন নিরহঙ্কারী। সমাজের প্রতিটি স্তরে ছিল তার সমান গ্রহণযোগ্যতা। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ গত রবিবার ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রাম রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাল।

মহসীন কাজী : যুগ্ম মহাসচিব, বিএফইউজে।