গাইবান্ধা-৩ আসনে আ’লীগ প্রার্থী ইউনুস জয়ী

আগের সংবাদ

প্রসঙ্গ : উন্নয়ন ও ট্রাফিক জ্যাম

পরের সংবাদ

পুরনো চোরদের নতুন ডাকাত হওয়ার গল্প

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ২৭, ২০১৯ , ৯:১১ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ২৭, ২০১৯, ৯:১১ অপরাহ্ণ

অজয় দাশগুপ্ত

কলাম লেখক।

টাকাপয়সার ব্যাপারে সবাই এক। তখন কেউ কারো বিরুদ্ধে বলে না। শুধু রাজনীতি কেন? কোন পেশায় আজ চুরিচামারি নেই? শিক্ষক থেকে উকিল, উকিল থেকে ডাক্তার এমনকি কবি-সাহিত্যিকদের ভেতরও প্রবণতা বাড়ছে। কেউ সরাসরি চুরিচামারি করেন আর কেউ চুরি করে পুরস্কার বা পদক হাতিয়ে নেন। এসবই আমাদের নৈতিক অধঃপতনের দিক। সেটা না বলে সে বিষয়ে মনোযোগী না হয়ে পিয়ন কেরানিদের ধরলেই কি সমস্যার সমাধান হবে আদৌ? রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ আমাদের পাপ।

এসব চোর একদিনে ডাকাতে পরিণত হয়নি। কালে কালে আমরা এদের আস্ফালন দেখেছি। কোন আমলে ছিল না তারা? বঙ্গবন্ধু দুঃখ করে বলতেন, আমি যা-ই আনি চাটার দল সব খেয়ে ফেলে। এদের তখন আনাগোনার শুরু। দিনে দিনে তারা বেড়েছে। জিয়ার আমলে শুরু হয়েছিল লুটপাটের নতুন অধ্যায়। সেটা পোক্ত হলো এরশাদ আমলে।

এরশাদ তার গদি ঠিক রাখার জন্য হেন কোনো কাণ্ড নেই যা করেননি। তার আমলে যার যা খুশি করে এরশাদের ভজনা করলেই ছিল মাফ। তিনি চাইতেন স্তাবক আর দালাল। সেই দালালদের লুটপাট করার জন্য ফ্রি লাইসেন্স ছিল। রাজনীতির বারোটা বাজানো সে আমলে চোর হয়ে গেল ডাকাত।

আর সে ডাকাতরা ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠল দস্যু। সে দস্যুবৃত্তির আড্ডাঘর হয়ে উঠল হাওয়া ভবন। সে কাহিনী আমাদের অজানা না। এটা মনে করার কারণ নেই আজ তারা সবাই সাধু হয়ে গেছে। বরং নানা নামে, নানা বেশে তারা এখনো সমাজে আছে। আছে শুধু না জাঁকিয়ে বসেছে। যার নব্য সংস্করণ আবজাল।

প্রশ্ন হচ্ছে তার কাহিনী ফাঁস হলো কীভাবে আর কেন? শেখ হাসিনা এবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু নাম বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। এটা ভালো না খারাপ তার বিচার করার সময় এখনো আসেনি। তবে এটা বলব আবজাল একা না।

আবজালের চুরি ও আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার পেছনে যারা আছে তাদের নাম আসতে হবে। সমাজের চারদিকে এখন এদের দৌরাত্ম্য। সমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে তারা। সমাজ যে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে তা ভাবলেও শরীর শিউরে ওঠে। সমাজ তো এসব ভালোভাবেই গ্রহণ করতে শিখেছে এখন।

আমরা যখন বড় হচ্ছিলাম তখন সমাজে দুচারজন চোর তস্কর থাকলেও বেশিরভাগ মানুষ ছিলেন সাদাসিধে আর সহজ। মানুষের এত চাহিদা, এত চাওয়া, এত দরকার দেখিনি আমরা। একটা সীমারখা থাকা জরুরি হলেও তা কেউ মানছে না। সে রেখা মুছে গেছে অথবা মুছে যাচ্ছে ক্রমশ। সমাজের এই পতন না ঠেকালে এসব ডাকাতি কোনোদিনও যাবে না।

সমাজ বলতে কিছু মানুষ ও তাদের সমষ্টি। তারা যেভাবে চায় সেভাবেই চলে দেশ। সমাজ আসলে কি চায়? আপনি কন্যার পিতা হলে আসলে কি চান? কোন ধরনের পাত্রর সাথে আপনি মেয়ের বিয়ে দিতে আগ্রহী? এক সময় মনে করা হতো জজ ব্যারিস্টার হলেই সে সেরা পাত্র।

তারপর এল ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের যুগ। এখন তারা আর আগের জায়গায় নেই। সে জায়গায় এসেছে সরকারি কর্মচারী। এসেছে ব্যবসায়ী নামের নতুন ডাকাতের দল। সরকারি কর্মচারীরা কত বেতন পান কীভাবে রোজগার করেন এসব ওপেন সিক্রেট। তাদের উপরি বা বাড়তি পাওয়াকে এখন আর কেউ ঘুষ বলে না। বরং গোপনে জেনে নেয় সে পাওয়া নিয়মিত কিনা।

আর কত পায় সে চাকরিজীবী। দেখবেন এটা কনফার্ম হলেই উভয় দিকের আত্মীয়দের মুখে গোপন হাসি খেলে যায়। তড়িঘড়ি করে বিয়ে দেয়ার জন্য পাগল হয়ে যাব সবাই। এর মধ্যে কি ইন্ধন নেই? এই যে বিষয়কে আত্মস্থ করা বা মেনে নেয়া এখানেই আছে প্ররোচনা।

আমাদের দেশে এক সময় চোর তো দূরের কথা সামান্য উপরি নিলেও তাকে সমাজে বাঁকা চোখে দেখার রেওয়াজ ছিল। এলাকার কেউ তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করার কথা চিন্তাও করত না। বরং তাদের দেখলেই কানাঘুষা শুরু হয়ে যেত। এসব মানুষ টাকার মালিক হলেও সমাজে ছিলেন অবহেলিত। সন্দেহের চোখে দেখা হতো তাদের।

সে পরিবেশ কতটা বদলে গেছে তা গেলেই বুঝতে পারি। পাড়া-মহল্লার যে কোনো ফাংশনে এরা এখন অতিথি। সভাপতি বা সম্মানের মালিক। তাদের হাতে-পায়ে ধরে অনুষ্ঠানে নিয়ে আসা হয়।

কারণ এদের নতুন নাম ডোনার। ডোনার টাকা দেবে আর বাকিরা আনন্দ ফুর্তি করবে এই রেওয়াজ যেখানে নিয়ম সেখানে কে জানতে চায় ডোনারের টাকার উৎস কি? সবাই ভেতরে জানলেও বাইরে এই ডাকাতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সে সমাজে আবজালের জন্ম কি অস্বাভাবিক?

রাজনীতি এক সময় ছিল সাধারণ নামের অসাধারণ মানুষদের হাতে। যারা তাজউদ্দীনের মতো সাদা জামা, সৈয়দ নজরুলের মতো সাধারণ পাঞ্জাবি পরে জীবন কাটাতেন। এখন নেতাদের পোশাকই আলাদা। দামি সাফারি, দামি মুজিব কোট আর বাহারি পোশাকে তারা নেতা না অভিনেতা বোঝা কষ্ট।

রাজনীতির আরেক গুণ প্রটেকশন। আপনি কোনো একটি দলে আছেন সঙ্গে দুর্নীতি করছেন বা টাকা কামাচ্ছেন আপনাকে স্পর্শ করার সাধ্য আছে কারো? দল ছেড়ে দেবে? না ক্যাডাররা আপনার জীবন নির্বিঘ্ন রাখবে? তারা আছে কি করতে? এই যে নির্বাচনে মনোনয়নপত্র কেনাবেচা এক তারেক জিয়াই নাকি কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছেন।

সে টাকা কোথায় কীভাবে খরচ হবে তার হিসাব আছে কারো কাছে? সরকারি দলের ভেতর ও ঘাপটি মেরে আছে অবৈধ বাণিজ্য। তাদের ক্যাডারদের পোয়াবারো। তারা চাইলে নিরীহ দর্জিকেও রাস্তায় কুপিয়ে মারতে পারে। দেখবেন আহা উহু করবেন এর বাইরে যেতে পারবেন? পারবেন না।

টাকাপয়সার ব্যাপারে সবাই এক। তখন কেউ কারো বিরুদ্ধে বলে না। শুধু রাজনীতি কেন? কোন পেশায় আজ চুরিচামারি নেই? শিক্ষক থেকে উকিল, উকিল থেকে ডাক্তার এমনকি কবি-সাহিত্যিকদের ভেতরও প্রবণতা বাড়ছে। কেউ সরাসরি চুরিচামারি করেন আর কেউ চুরি করে পুরস্কার বা পদক হাতিয়ে নেন। এসবই আমাদের নৈতিক অধঃপতনের দিক। সেটা না বলে সে বিষয়ে মনোযোগী না হয়ে পিয়ন কেরানিদের ধরলেই কি সমস্যার সমাধান হবে আদৌ? রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ আমাদের পাপ।

সমাজে পাপ কতটা সহনীয় আর গা সওয়া হয়ে আছে ধর্ষণ তার বড় প্রমাণ। একেকবার এমন ঘটনা ঘটে আর মানুষ সামাজিক মিডিয়ায় পাগল হয়ে ওঠে। ক’দিন পর সব থেমে যায়। ভুলে যায় সবাই। এভাবে কি আর সমস্যার সমাধান হয়? ছেলে বুড়ো কম বয়সী সবাই এখন কোনো না কোনোভাবে বিকৃতির শিকার।

সে বিকৃতি ক্রমেই চুরি-ডাকাতি বাড়িয়ে তুলবে এটাই তো স্বাভাবিক। আসল কথা হলো পরিমিতি বোধ বলে কিছু নেই। কার কত আছে আর কত চায় সেটা কেউই জানে না। তাই এখন কোটি টাকাও ব্যাপার না। ব্যাপার শ শ বা হাজার কোটি টাকা। সেখানে আবজাল একটি নাম মাত্র।

সমাজ, সংসার, দেশ ও মানুষকে শুদ্ধ করতে না পারলে মুক্তি নেই। শেখ হাসিনা একা পারবেন না। তার দলেও এমন মানুষের সংখ্য অগুণিত। যারা শুধু দরকারের জন্য আওয়ামী লীগে আছে। তাদের বেলায় কঠোর হতে হবে। আইন ও বিচার যদি তার কাজ করতে না পারে বা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে না পারে কোনোদিনও সমস্যা যাবে না।

আবজালের আরেক নাম রক্তবীজ। একটা গেলে একশটা জন্মাবে। তাই মূলে হাত দিতে হবে । চারবারের দেশ শাসন আর পরপর তিনবার গদিতে আসা দলের কাছে এই আশা বা এই ধরনের কিছু পাওয়া একেবারেই যৌক্তিক। তারা কি তা করবেন এবার?

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা