কুমিল্লায় নিহত ১৩ শ্রমিকের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর

আগের সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রে অচলাবস্থার সাময়িক অবসান

পরের সংবাদ

একটি দেশের গানের গল্প

সব ক’টা জানালা খুলে দাও না

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ২৬, ২০১৯ , ৩:০১ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ২৬, ২০১৯, ৩:০৯ অপরাহ্ণ

Avatar

অগণিত দেশের গান সৃষ্টি করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। সেসব গানের অধিকাংশই কালোত্তীর্ণ হয়েছে। তার দেশের গানগুলোর মধ্যে একেবারেই অন্যরকম ‘ সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’। জীবদ্দশায় এই গানের গল্প তিনি বলে গেছেন বহুবার। আরো একবার পাঠকদের জন্য গানটির নেপথ্যের কাহিনী…

আমি মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছি। তখন আমার বয়স ১৪ বছর। আমরা কমবয়সী কয়েকজনের কাজ ছিল, কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত হানাদাররা কোথায় ঘাঁটি গেড়েছে, তা দেখে আসব। একবার ধরাও পড়েছিলাম। আমার সঙ্গীরা শহীদ হলেও আমি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম। স্বাধীনতার পর সহযোদ্ধা বন্ধুদের হারিয়ে উদভ্রান্তের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। তখনই গানকে আঁকড়ে ধরি আমি। একটানা আট বছর শুধু দেশের গান করেছি। একদিন মনে হলো, যারা মুক্তিযুদ্ধে মারা গেছেন, তাদের তো আসলে মৃত্যু নেই। তারা আমাদের আশপাশেই কোথাও আছেন। প্রয়াত গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু তখন আমার সঙ্গেই থাকেন। আমার গানগুলো তিনিই লিখতেন। বাবুকে ডেকে বললাম, এই থিমের ওপরে একটি গান লিখতে। বাবু লিখলেন, ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’। জানালা শব্দটা শুরুতে ছিল না। সেখানে ছিল ‘দরজা’। ‘দরজা’ শব্দটা আমার কাছে মনে হলো কর্কশ। সেই তুলনায় জানালায় নরম একটা ব্যাপার আছে। অনেকক্ষণ তর্ক-বিতর্কের পর ‘জানালা’ শব্দটি রাখার ব্যাপারেই দুজনে একমত হলাম। গানটি গেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন। আমরা দুজন তখন বিটিভিতে একসঙ্গে পঁচিশটি দেশের গান করি। বিটিভি তখন যে পারিশ্রমিক দিত, তাতে যাতায়াতের ভাড়াও উঠত না। কিন্তু দেশপ্রেমের টানে গান করে গেছি। ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গান। এই গান প্রমাণ করে, মানুষ দেশের গান শুনতে চায়। তা না হলে এত বছর ধরে এই গান টিকে থাকত না। গানটি করেছিলাম ১৯৮২ সালের দিকে ২৬ মার্চ বিটিভির বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য। ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করেছিলাম। রেকর্ডিস্ট ছিলেন শাফায়াত আলী খান। গিটার বাজিয়েছিল টিপু এবং প্রয়াত শেখ ইশতিয়াক। তবলায় দেবু ভট্টাচার্য। পারকেশনে ইমতিয়াজ। আর ভায়াব্রোফোন বাজিয়েছিল মানাম আহমেদ। আমি কিবোর্ড আর বেজ গিটার বাজিয়েছিলাম। গানটি টানা আট-নয় বছর বিটিভির খবরের আগে ও পরে বাজানো হয়েছে।

 

                                            একটি সিনেমার গানের গল্প                           
                              আম্মাজান আম্মাজান                         

সিনেমার গানে আহমেদ ইমতিয়াজ ছিলেন সফল ও সার্থক। দশকের পর দশক তার গানে বুঁদ হয়ে আছেন শ্রোতারা। হাটে-মাঠে-মঞ্চে তার গান বেজে চলেছে বছরের পর বছর। যার মধ্যে ‘আম্মাজান আম্মাজান’ গানটির জনপ্রিয়তা অবিশ্বাস্য। গানটি তৈরির নেপথ্যের গল্প তিনি শুনিয়ে গেছেন জীবদ্দশায়। সেই গল্প পাঠকদের জন্য আরো একবার…

‘আম্মাজান’ সিনেমাটি নির্মাণ করেন কাজী হায়াৎ। তিনি কখনো গান নিয়ে আমার সঙ্গে বসতেন না। এ বিষয়ে তিনি আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেন। তার বিশ্বাস আমাকে স্বাধীনতা দিলে ভালো কিছুই হবে। স্বাধীনতা ঠিকই দিয়েছিলেন কিন্তু আমাকে বলেছিলেন, ‘বুলবুল তুমি এমন একটা গান লিখবে যে গানটির কথা ও সুর দেয়ার পর মাকে নিয়ে লেখা অন্য কোনো গান তোমার লেখা গানের সামনে দাঁড়াতে না পারে।’ সিনেমার গল্পটাও তিনি আমাকে শুনিয়েছিলেন। এই সিনেমায় মায়ের সুখের জন্য পৃথিবীতে সবকিছু করতে পারেন নায়ক মান্না। তারপর আমাকে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে গানটি লিখতে ও সুর করতে হয়েছে। ‘আম্মাজান’ গানের গভীরতাÑ মাকে নিয়ে আরো অনেক গান রচিত হয়েছে। আমি ভাবলাম, এমন একটি গান লিখব যার কথার মধ্যে অনেক গভীরতা থাকবে। মক্কার ধুলো, মদিনার ধুলো, এই মাটি দিয়ে গড়া মায়ের দেহ। এসব কথাগুলো খুব চিন্তা-ভাবনা করে আনতে হয়েছে। ধর্মীয় অনুভ‚তিতে যেন আঘাত না লাগে এবং সুরটা এমনভাবে করেছি যা একটি শিশুও গাইতে পারবে। এই গানের সুর এমনভাবে তৈরি করেছি যা কেউ ভাঙতে পারবে না। অন্যভাবে গাওয়ারও উপায় নেই। গানের কথা ভালো হলে, সুরটা সাধারণ হলে সাধারণ মানুষও তা গাইতে পারেন। আইয়ুব বাচ্চুর কথা মাথায় রেখেই এই গানটি আমি তৈরি করেছিলাম। কারণ এই সিনেমায় মান্না একজন ‘অ্যাংরি হিরো’ ছিল। তখন আমার চোখে মুখে বাচ্চুর মুখটাই ভাসছিল। বাচ্চু তখন ফিল্মে গান করেনি। বাচ্চুকে দিয়ে অনেক কষ্ট করে গানটি করানো হয়েছিল। আমার কাছে কয়েকবার শোনার পর বাচ্চু খুব স্বাভাবিকভাবে গানটি গাইল। রেকর্ডিং করতে যখনই যেতাম তখনই অনেক মানুষ গানটি শোনার জন্য চলে আসত। তখনই আমি বুঝতে পারছিলাম গানটি হিট হবে। শ্রুতি স্টুডিওতে গানটির রেকর্ডিং হয়েছিল। ‘আম্মাজান’ গানটি নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়েই গেয়েছেন শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু।