প্রাপ্তি শূন্য: প্রতিটি নতুন দিনে

আগের সংবাদ

বগুড়ায় বালু উত্তোলনের সময় ২ শ্রমিকের মৃত্যু

পরের সংবাদ

ভোটের পর জোটের সমস্যা

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১৮, ২০১৯ , ৯:৪২ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ১৮, ২০১৯, ১০:০৬ অপরাহ্ণ

বিভুরঞ্জন সরকার

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়েও দুই পক্ষের মতভেদ বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করবে বলেই মনে হচ্ছে। বিএনপি নেতারা এখন কামাল হোসেনের সমালোচনা করছেন। আবার কামাল হোসেনও প্রকাশ্যেই বলেছেন জামায়াতের সম্পর্ক রাখা ভুল ছিল। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি সম্পর্ক ছিন্ন করবে না। যে যত কথাই বলুক, জামায়াত নামের বোঝা বিএনপি ঘাড় থেকে নামাতে পারবে না। বিএনপি তার রাজনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার করতে আগ্রহী নয়। জামায়াত ইস্যুতেই ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে বিএনপির। নির্বাচনের আগে বৃহত্তর জোট বা ঐক্য নিয়ে বিএনপি এবং অন্যদের মধ্যে যে আগ্রহ-উদ্দীপনা ছিল নির্বাচনের পর স্বাভাবিকভাবেই তা নেই। যেনতেনভাবে ঐক্য গড়লেই তাতে সুফল পাওয়া যায় না। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি ঐক্যফ্রন্ট নাকি ২০ দলীয় জোট নিয়ে পথ চলতে চায়।

আওয়ামী লীগের তৃণমূলের একজন কর্মী ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন: ‘নির্বাচনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা কর্মীগুলো এখন বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছে আর সুবিধাবাদীগুলো নেতার দরজায় ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে’। এই এক লাইন বক্তব্যে অনেক সত্যের প্রকাশ ঘটেছে। প্রথমত, মাঠের কর্মীরা সব সময় ‘নেতা’র কাছে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হন না। দলের যে কোনো বিপদে-আপদে যারা ঢাল হিসেবে কাজ করেন, বিপদ কেটে গেলে তাদের খোঁজখবর সাধারণত খুব বেশি রাখা হয় না।

নির্বাচনের সময় মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তারাই নানা ধরনের অপপ্রচারের জবাব দিয়ে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বুঝিয়ে সাধারণ ভোটারদের দলের পক্ষে আনেন, দলের মার্কার বিজয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু দল বিজয়ী হলে কিংবা ক্ষমতায় গেলে সাধারণত ওই তৃণমূল কর্মীরা হারিয়ে যান তাদের ভিড়ে যারা কেবল নিজেদের ‘সুবিধা’ আদায়ে সচেষ্ট থাকে।

যারা এমপি হয়েছেন, যারা মন্ত্রী হয়েছেন তারা শপথগ্রহণের সময় থেকেই কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, এই বিচ্ছন্নতা দিনদিন বাড়তে থাকে। এক সময় সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে এমপি-মন্ত্রীদের দূরত্ব তৈরি হয়। আর সুবিধাবাদীরা, সুযোগসন্ধানীরা এমপি-মন্ত্রীর কাছের মানুষে পরিণত হয়। ক্ষমতার স্বাদ তারা উপভোগ করে। তারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়। সাধারণ মানুষ এসব দেখে ক্ষুব্ধ হয় কিন্তু তাদের কিছুই করার থাকে না।

এবার কি এই অবস্থার পরিবর্তন হবে? তৃণমূলের কর্মীদের উপেক্ষিত হওয়ার ধারাবাহিকতা কি অব্যাহত থাকবে? আমরা চাইব, এবার পরিবর্তন আসুক সব ক্ষেত্রেই। যারা ফুলের তোড়া নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন, মন্ত্রী-এমপিদের তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ যেন ফুল দিয়ে পরে কোনো ধরনের অন্যায় সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার ফন্দিফিকির করতে না পারে। যারা দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, যারা কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে দল করেন না তাদের কোনোভাবেই অবহেলা করা চলবে না। মন্ত্রী-এমপিরা এলাকায় গিয়ে শুধু বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিদের নিয়েই যেন ঘোরাফেরা না করেন, মানুষের কাছে যারা অপছন্দের তারা যেন মন্ত্রী-এমপিদের পছন্দের তালিকায় ঠাঁই না পায়।

সবাইকে এটা মনে রাখতে হবে যে, যেমন বড় জয় এবার আওয়ামী লীগ পেয়েছে, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও তাদের সামনে এসেছে। বিএনপি-জামায়াত এবার ভোটে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এতে উৎফুল্ল হওয়ার কিছু নেই, আনন্দে বোগল বাজানোরও কিছু নেই। বিএনপি-জামায়াত যে রাজনৈতিক মতে বিশ্বাসী সেই মতের সঙ্গে সহমত পোষণকারী মানুষ আমাদের দেশে আছে এবং সংখ্যায় তারা খুব কম নয়। তারা ক্ষতিকর প্রচারণায় পারদর্শী এবং অভ্যস্ত।

এবার ভোটাররা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে মানে এই নয় যে, তারা আর জনসমর্থন পাবে না। জনমনস্তত্ত্ব এক জটিল বিষয়। কিছু মানুষ আছেন যারা কোনোদিন, কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের সমর্থক হবে না। যারা পাকিস্তানি মানসিকতার তারা আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষমাহীন। পাকিস্তান ভাঙার মনোবেদনা তারা পুষিয়ে নেন আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে।

এরা সময় খারাপ দেখলে নিজেদের গুটিয়ে রাখে, আবার সুযোগ বুঝে মাথা বের করে। কিছু মানুষ আছেন যারা দ্রুত অতীতটা ভুলে যান। এদের জন্যই জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি অপরাধী দল বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারে, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে তারা ভোটও পায়।

অথচ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেছে। পাকিদের সহযোগী হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। এ রকম একটি দলকে যারা ভোট দেন, সমর্থন করেন তারা কেমন প্রকৃতির মানুষ?

এই মানুষরা আমাদের সমাজে আছেন। তারা সময় সময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে আওয়ামী লীগেও আশ্রয় নেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগকে শক্তি জোগানোর জন্য নয়। বরং ভেতর থেকে আওয়ামী লীগকে নীতি-আদর্শচ্যুত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থেকেই। আওয়ামী লীগকে এবার অধিক সতর্ক থাকতে হবে।

একাত্তরের বিজয়ের পর আমরা পরাজিত শত্রুদের পুনরুত্থানের আশঙ্কার দিকটি বিবেচনায় না রেখে ভুল করেছিলাম। এবারো যেন প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভেবে আত্মহারা থাকা হবে চরম ভুল। সুবিধাবাদীদের প্রশ্রয় না দিয়ে ত্যাগী নেতাকর্মীদেরই মূল্যায়ন করতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে, তাদের সঙ্গে কোনোভাবেই দূরত্ব তৈরি করা যাবে না।

দুই.
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যেমন মিত্র খুঁজেছিল, তেমনি বিএনপিও মিত্র বাড়াতে সচেষ্ট ছিল। ভোটে জেতাই ছিল মূল লক্ষ্য। তখন জোট বা মিত্রতা যে শুধু আদর্শের ভিত্তিতে হয়েছে তা নয়। ড. কামাল হোসেনের মতো বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক বিএনপির সঙ্গে মৈত্রী করেছেন আবার ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো জিয়া অনুরাগী গিয়ে আওয়ামী লীগের নৌকায় চড়েছেন। আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোট রেখেই অন্যদেরও কাছে টেনেছিল, বিএনপিও ২০ দলীয় জোট রেখেই অন্যদের নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিল।

ভোটের পর দেশের রাজনীতির চিত্র পাল্টে গেছে। আওয়ামী লীগ একাই সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট-ফ্রন্ট মিলে মাত্র আটটি আসন পেয়েছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করবে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই নতুন সরকার গঠিত হবে, সেটা বোঝা যাচ্ছিল। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসাটা ছিল প্রত্যাশিত। নির্বাচনে জামায়াত সুবিধা করতে পারবে না- এটাও বোঝা গিয়েছিল। কিন্তু বিএনপির যে এতটা শোচনীয় অবস্থা হবে, সেটা কারো এন্টেনায় ধরা পড়েনি। আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় এবং বিএনপির প্রায় মুছে যাওয়া নির্বাচনী ফলাফল দেশের রাজনীতিকেই বড় এক ঝাঁকুনি দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ এবার মন্ত্রিসভায় শরিকদের কাউকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। গত সংসদে এরশাদের জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে সরকারেও ছিল, বিরোধী দলেও ছিল। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় দশম সংসদও ছিল কার্যত বিরোধী দলশূন্য। এবার জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়নি। সংসদ বিরোধী দল মুক্ত থাকার আশঙ্কা দূর হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিত্রতার নীতি নিয়ে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা কতটুকু সম্ভব হবে সে প্রশ্নও আছে।

১৪ দলের শরিকদের মন্ত্রিসভায় না থাকা নিয়ে সব মহলেই আলোচনা আছে। ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাসদের হাসানুল হক ইনু এবং জেপির আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মন্ত্রী না হওয়ার বিষয়টি সম্ভবত কারো হিসাবে ছিল না। তবে এখন এটা নিশ্চিত যে তারা কেউ আর মন্ত্রী হচ্ছেন না। এ নিয়ে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে কিছু হতাশাও আছে। আছে টানাপড়েন। আগে থেকে এ ব্যাপারে শরিকদের সঙ্গে আলাপ না করায় কারো কারো মধ্যে হয়তো কিছুটা ক্ষোভ-অভিমানও আছে। তবে এটা বড় কোনো সংকট হয়তো এখনই তৈরি করবে না।

১৪ দলের শরিকরা সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করুক তেমনটাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান বলে গণমাধ্যমে খবর ছাপা হয়েছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে এটাকে কেউ স্বাগত না জানালেও প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ের বিরোধিতা করার মতো অবস্থাও নেই। মঞ্জু, মেনন, ইনু সংসদে যদি বিরোধী ভূমিকা পালন করেন, আরো যারা আওয়ামী জোটের হয়ে ভোট করেছেন, তারা সবাই বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলে সংসদ সরব ও সক্রিয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। তবে একদিকে সরকারি জোটে, অন্যদিকে বিরোধী দলে এটা কীভাবে কতটুকু কাজ করবে সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। দেশে ভবিষ্যতে যদি সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং বৃহত্তর ঐক্য গড়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন ১৪ দলের ভূমিকা বা অবস্থান কী হবে?

তিন.

জোট-ফ্রন্ট নিয়ে বড় ঝামেলায় আছে বিএনপি। যে গরজ ও আবেগ নিয়ে ড. কামাল হোসেন এবং আরো কয়েকজন নেতা বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তুলেছিলেন, সেই গরজ ও আবেগের সংহত প্রকাশ ঐক্যফ্রন্টে ঘটেনি। শুধু আওয়ামী লীগ, আরো স্পষ্ট করে বললে শেখ হাসিনা বিরোধিতার জন্য একটি ফ্রন্ট গঠন করলে তার খুব বেশি দূর এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। ড. কামাল হোসেনের রাজনৈতিক আদর্শিক অবস্থান এবং বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শিক অবস্থান একসঙ্গে যায় না। তাই বলা যায়, ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যটা সংহত হওয়ার আগেই শিথিল হয়ে পড়েছে। নির্বাচনের আগেও সেটা নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে, নির্বাচনের পর এই ফাটল বেড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। বিএনপির অনুপস্থিতিতেই ঐক্যফ্রন্টের জরুরি সভা হয়েছে ১৭ জানুয়ারি।

সংসদে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে বিএনপির সঙ্গে কামাল হোসেনের মতভিন্নতা প্রকাশ পেয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়েও দুই পক্ষের মতভেদ বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করবে বলেই মনে হচ্ছে। বিএনপি নেতারা এখন কামাল হোসেনের সমালোচনা করছেন। আবার কামাল হোসেনও প্রকাশ্যেই বলেছেন জামায়াতের সম্পর্ক রাখা ভুল ছিল। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি সম্পর্ক ছিন্ন করবে না।

যে যত কথাই বলুক, জামায়াত নামের বোঝা বিএনপি ঘাড় থেকে নামাতে পারবে না। বিএনপি তার রাজনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার করতে আগ্রহী নয়। জামায়াত ইস্যুতেই ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে বিএনপির। নির্বাচনের আগে বৃহত্তর জোট বা ঐক্য নিয়ে বিএনপি এবং অন্যদের মধ্যে যে আগ্রহ-উদ্দীপনা ছিল নির্বাচনের পর

স্বাভাবিকভাবেই তা নেই। যেনতেনভাবে ঐক্য গড়লেই তাতে সুফল পাওয়া যায় না। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি ঐক্যফ্রন্ট নাকি ২০ দলীয় জোট নিয়ে পথ চলতে চায়। ভোটের রাজনীতি এবং জোটের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে এবারের নির্বাচন।

বিভুরঞ্জন সরকার: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা