লিটন-ওয়ার্নারের ব্যাটে সিলেটের সংগ্রহ ১৮৭

আগের সংবাদ

জাতি ও শ্রেণির প্রশ্নে

পরের সংবাদ

আন্দোলনের ব্যর্থতা এবং জনমুখী ইস্যু

ফারুক যোশী

লন্ডন থেকে কলাম লেখক।

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১৬, ২০১৯ , ৮:৩৯ অপরাহ্ণ

আন্দোলন করতে হলে জনগণের নিত্যদিনের দাবি নিয়েই মাঠে নামতে হবে। সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র আর ভোটাধিকারের জন্য খুব একটা উদগ্রীব নয়। ন্যূনতম বেঁচে থাকার দাবি আছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের, সমস্যা আছে সাধারণ মানুষদের। শিক্ষায়-চিকিৎসায়-যোগাযোগে কিংবা কোটি বেকারত্বের চিহ্নিত সমস্যা আছে। বিগত দশ বছরে ক’বার নেমেছে বিএনপি জনগণের এসব মৌলিক দাবি নিয়ে।

২০ কোটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ভারতে বামপন্থিরা সফল একটা আন্দোলন করেছে। এ খবরটাই উঠে আসছে এমনকি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে ১২ দফা দাবি নিয়ে বাম দলগুলো এ ধর্মঘটের ডাক দেয়।

কলকাতার তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়া ভারতের প্রায় সব বিরোধী রাজনৈতিক দলই বামদলগুলোর এ দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। সবার জন্য শিক্ষা, ফসলের সহায়ক মূল্যবৃদ্ধি, কৃষিঋণ মওকুফসহ ১২ দফা কর্মসূচি নিয়ে ৮ ও ৯ জানুয়ারি বামদলের ডাকা এ ধর্মঘটে সারা ভারতই যেন কেঁপে উঠে। ভারতের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মতে ভারতের ইতিহাসে এটিই হলো বৃহত্তম ধর্মঘট।

এ রকম ধর্মঘট বামদলগুলো কমাস আগেও করেছিল, কিন্তু দলগুলোর বাইরে থেকে খুব একটা জনসম্পৃক্ততা আসেনি। কিন্তু তারা হাল ছাড়েনি। দলগুলো জনগণের দাবি নিয়েই মাঠে ছিল। বৈষম্য, ধর্মীয় বিদ্বেষ, কৃষকের সমস্যা, নিরাপত্তা প্রভৃতি নিয়ে লাগাতার তারা জনসংযোগ করেছে।

বিজেপির দুঃশাসনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। তাইতো শুধু বামদলের কর্মীরাই নন, সাধারণ মানুষকেও তারা ওই দুদিনের কাফেলায় শরিক করতে পেরেছে। এমনকি সত্যি কথা হলো বামদলগুলোরও অনেক কর্মী যারা হতাশ হয়ে মিছিল-মিটিং থেকে ছিটকে পড়েছিল তারাও সমবেত হয়েছে জনমুক্তির এই মিছিলে।

আমি রাজনীতিকে দেখি কলামিস্টদের কলাম লেখার মতো। সমসাময়িক ইস্যুগুলোকে জনমুখী করে, জনগণের জীবন নির্বাহের দাবি-দাওয়াকে ফোকাস করে জনগণকে সঙ্গে নেয়ার মতো ইস্যুগুলোকেই রাজনীতির প্রাধান্য দেয়াটাই রাজনীতির নীতিনির্ধারণ হওয়া উচিত।

শুধু ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে কিংবা মৃত কিংবা জীবিত মানুষের আবেগকে কেন্দ্র করে কোনো ইস্যু দীর্ঘদিন চালিয়ে নেয়া যায় না। যদিও বা তা জিইয়ে রাখার চেষ্টা চলে, তাতে এটা মানুষের গা সওয়া হয়ে যায় এবং স্বতঃস্ফূর্ততা ক্রমেই বিলীন হয়ে যায়। বাংলাদেশের আবেগী রাজনীতি দেখলে কেন যেন তা-ই মনে হয়।

আমাদের রাজনীতিটা যেন ক্রমেই ঘোরপাক খাচ্ছে, এমনি এক ঘেরাটোপের মাঝে। গত প্রায় দশ বছর থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। এ আন্দোলন শুধুই যেন ক্ষমতার পালাবদলের আন্দোলন। আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন গত দশ বছর থেকে, এবারো তারাই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। সরকার গঠন করেছে।

বিরোধী দলসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো কোনো কিছুতেই সরকারের যাত্রা প্রতিহত করতে পারছে না। কারণ উন্নয়ন নামক স্লোগানটা দেশে এই সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও তারা এই সার্টিফিকেট পেয়ে গেছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সমস্যার শেষ নেই। সকাল হলেই কাগজ কিংবা পোর্টাল কিংবা প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে জাতীয় সমস্যাগুলো উঠে আসে। সমস্যা আছে কৃষি ক্ষেত্রে, শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যের চিত্র আছে। চিকিৎসা ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মানুষ মরছে, ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবায় কসাইয়ের মতো আচরণ করছে মালিকপক্ষ।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন লক্ষণীয়, কিন্তু যানবাহন আর মানুষের শহরমুখী যান্ত্রিকতার কাছে এ যোগাযোগ ব্যবস্থায় রাস্তাঘাটের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নবিদ্ধ। সড়ক দুর্ঘটনা যেন একটা জাতীয় দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাও প্রশ্নবিদ্ধ, ধর্ষণ বাড়ছে ক্রমশ। বিদ্বেষী রাজনীতির বিষবাষ্পে সামাজিক সম্প্রীতি ক্রমেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি গ্রাস করছে উন্নয়ন নামক সব স্লোগান। এসব অসংখ্য সমস্যা বাংলাদেশের নিত্যদিনের।

বিরোধী শিবির থেকে উচ্চারণ করলেই এ সমস্যাগুলো শেষ হয়ে যাবে না। অথচ রাজনীতি তো এসবের জন্যই। সরকার কিংবা জনপ্রতিনিধি এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েই এগুবে, এটাই স্বাভাবিক। মানুষের আকাক্সক্ষাই হলো এটা। জনগণ এবং জনগণের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খোলে দিতেই জনগণ জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে। সুতরাং এ দায়বোধ থেকেই জনপ্রতিনিধিদের এসব দেখতে হবে।

বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অন্যতম প্রধান উন্নয়নমুখী খাত হলো গার্মেন্টস শিল্প। অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকদের অধিকারের পুরোপুরি মূল্য দেয়া হচ্ছে না। সে জন্যই সরকারি অনেক সমর্থন-সহযোগিতা কিংবা আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকার পরও এ শিল্পক্ষেত্র ক’দিন পরপরই ফুঁসে ওঠে।

শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম মজুরির ব্যাপারে যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে ফুঁসে ওঠা আন্দোলনে গুলি চালানো নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বোত্তম পথ ছিল না। বছরের শুরুতে গার্মেন্টস শ্রমিক সুমনের মৃত্যু সরকারের পথচলাকে আরো সমালোচিত করে তুলল। কিন্তু বিরোধী দল কি এ নিয়ে বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি দিতে পারছে, আন্তরিকতা নিয়ে কতটুকু শ্রমিকবান্ধব হতে পেরেছে তারা এ ইস্যুকে সামনে রেখে।

বরং বাংলাদেশের বামপন্থিরা তাদের সীমিত শক্তি দিয়ে এ আন্দোলনকে শ্রমিক শ্রেণির কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। খেয়াল রাখতে হবে, পাশের দেশে ২০ কোটি মানুষের ধর্মঘট ও ভারত অচল করে দেয়ায়ও বড় রকমের কোনো রক্তক্ষয় হয়নি।

গণতান্ত্রিক নীতিমালায় আন্দোলন করার যেমন অধিকার আছে, ঠিক তেমনি সংগঠকদেরও সেই দায়বোধ থাকতে হয়। কীভাবে আন্দোলনকে শৃঙ্খলিত করা যায়, যা দেখিয়েছে ভারতের বামদলগুলো। বিএনপির ইতিহাস বলে তারা সুশৃঙ্খল ছিল না অতীতে। আগুন সন্ত্রাস শব্দটা তাদের জন্যই এসেছ এবং সে জন্যই এগুলো এখন আওয়ামী লীগ কিংবা সরকার জোরেশোরে প্রচার করতে পারে।

তবুও বলি, জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকার আমাদের দেশের এ সমস্যাগুলো যে নজরে আনছেন না তা নয়, সে জন্যই উন্নয়ন নামক স্লোগান। বিগত দশ বছরে কোনো কাজ হয়নি, এটা বলার কোনোই অবকাশ নেই। কৃষি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনা এসেছে অনেক, কিন্তু এ ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে আশাতীত। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনমান উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে এ সরকার। এভাবে হয়তো অনেক কিছুই বলা যাবে তেমনিভাবে চিহ্নিত করা যাবে ব্যর্থতাও।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা আছে। সম্প্রতি ব্রিটেনভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট তাদের এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক দেশ’গুলোর মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান নেই এমনকি ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক’ দেশের সারিতেও নেই বাংলাদেশ। একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য তাই হয়তো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো, বিগত এক দশক থেকে।

কিন্তু সত্যিকার অর্থে বিরোধী দলগুলো এ আন্দোলনে ব্যর্থ হচ্ছে। বাস্তবতার সঙ্গে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে, তবে এটাই সঠিক, বাংলাদেশের জনগণ পালাবদলের রাজনীতিকে খুব একটা গুরুত্বের চোখে দেখছে না।

বিএনপি বাংলাদেশের একটা বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, অথচ গণতন্ত্রের ইস্যু কিংবা ভোটাধিকারের দাবিতে জনগণকে মাঠে নামাতে পারছে কি তারা? অন্যদিকে বিএনপি শাসনামলেও সেই একই চিত্র ছিল, গণতন্ত্র তখনো ছিল ভূলুণ্ঠিত। এবার নির্বাচন-পরবর্তী সুবর্ণচরের একজন মা ধর্ষিত হওয়ার লোমহর্ষক ঘটনা উঠে এসেছে বাংলাদেশের মানসপটে, ঠিক সেভাবেই তো পূর্ণিমাও উঠে এসেছিলেন বিএনপি আমলে।

আমাদের অনেকেরই মনে থাকার কথা বিরোধী দলে থাকাকালীন সংসদের অভ্যন্তরেই সাবেক বিরোধীদলীয় উপনেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে স্পিকারকে ফাইল ছুড়ে মারার কথা। সংসদের ভেতরেই স্লোগান দেয়া, খিস্তি-খেউড় উচ্চারণ করা। সুতরাং বিশ্বাসের জায়গাটুকুতে বিএনপি কিংবা সেই ঐক্যজোটের কাছেও আস্থা রাখতে পারবে কি মানুষ?

গণতন্ত্রের আন্দোলন নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এগুনো যাবে না, এটা নিশ্চিত। আন্দোলন করতে হলে জনগণের নিত্যদিনের দাবি নিয়েই মাঠে নামতে হবে। সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র আর ভোটাধিকারের জন্য খুব একটা উদগ্রীব নয়। ন্যূনতম বেঁচে থাকার দাবি আছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের, সমস্যা আছে সাধারণ মানুষদের। শিক্ষায়-চিকিৎসায়-যোগাযোগে কিংবা কোটি বেকারত্বের চিহ্নিত সমস্যা আছে।

বিগত দশ বছরে ক’বার নেমেছে বিএনপি জনগণের এসব মৌলিক দাবি নিয়ে। গণতন্ত্র ভোটাধিকারকে মানুষ এখন ক্ষমতার পালাবদল হিসেবেই দেখছে। নিশ্চিত করে বলা যায় এ দাবিগুলো দিয়ে আন্দোলন দাঁড় করানো যাবে না। যে সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে, নির্বাচন নিয়ে অনুযোগ-অভিযোগ-প্রমাণ কোনো কিছু দিয়েই এ সংসদ সহসা ভেঙে দেয়া যাবে না।

তাই এ প্রশ্নের উত্তরও পাবে না বিরোধী দল। সরকার পতনের ডাক দিলেও কাজ হবে না। জনসংযোগ না বাড়িয়ে সংবাদ সম্মেলন আর বিবৃতি দিয়ে কোনো আশাব্যঞ্জক ফলাফল নিযে আসতে পারবে না তারা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে ৮টি আসনে নির্বাচিত হওয়া সংসদ সদস্যরাও শেষ পর্যন্ত যদি সংসদে না যান, তাহলে সে আসনগুলোও আরো পাঁচ বছরের জন্য আওয়ামী লীগই পেয়ে যাবে।

এখন মহাজোট এমন পর্যায়ে আছে যে, তাদের শরিকরাও আর ভাগ বসাতে পারবে না কোনো কিছুতেই। বিগত মন্ত্রিপরিষদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী সে নির্দেশনাই দিয়েছেন। সুতরাং আট আসন নিয়ে সংসদে ঢোকাই হতে পারে আন্দোলনেরই একটা অংশ।

ভারতের মতো লাল পতাকার মিছিলে বাংলাদেশ ছেয়ে দিতে পারবে না বামপন্থি দলগুলো হয়তো, তাদের মিছিল দিয়ে বাংলাদেশ অচলও করে দিতে পারবে না। কিন্তু বামদলগুলো অন্তত জ্বলছে টিম টিম করে। বিএনপি কিংবা ঐক্যফ্রন্ট জ্বলে উঠতে পারত, কিন্তু তারা তা করছে না।

অথচ এখন আন্দোলন দাঁড় করাতে হলে জনগণের মৌলিক দাবি নিয়েই আগাতে হবে, কারণ ক্ষমতার পালাবদলের রাজনীতিতে মানুষের আস্থা নেই। টিকে থাকতে হলে বিএনপিকে সে পথেই আগাতে হবে।

ফারুক যোশী : লন্ডন থেকে কলাম লেখক।