পারুলের জন্য ‘নারী-দেয়াল’ হয় না?

আগের সংবাদ

খুলনাকে হারিয়ে জয়ে ফিরলো রংপুর রাইডার্স

পরের সংবাদ

বঙ্গ বাহাদুরের বিদায়

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ৬, ২০১৯ , ৯:৩৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ৬, ২০১৯, ৯:৩৭ অপরাহ্ণ

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর; অর্থনীতি বিশ্লেষক

বঙ্গ বাহাদুর ক্ষুদ্র স্বার্থে কিংবা নিছক অভিমান করে বাড়ির বাইরে বের হননি। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে তার জন্ম- মন তার বিশাল। সে বাড়ির বের হয়েছিল সবার প্রতি সহমর্মিতা জানাতে। জেলায় জেলায় লোকালয়ে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে বেড়ানোর সময় কাউকে আঘাত করেনি অহিংস এই ঐরাবত। অথচ আসাম থেকে রীতিমতো সরকারি প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছিল ঘরের ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে।

‘আসামের আবাসস্থল ছেড়ে কোন কুলক্ষণে সে পথে বেরিয়েছিল জানে না তার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর কেউ। তার খেয়ালই ছিল না আন্তঃদেশীয় আতিথেয়তায় আদর আপ্যায়নে সম্মান সমীহে সমস্যা বিস্তর। সার্কভুক্ত দেশের একজনকে এভাবে বন্যার তোড়ে পাহাড়, দেশ, নদী সাঁতরে ঘুরে বেড়াতে হবে সে ভাবেনি। তার ভিসা ছিল না ঠিকই কিন্তু সীমান্ত পাড়ি দিতে সমস্যা হয়নি, সে ভেবেছিল একই ভূমিতে তার যাতায়াতে বাধা হবে কেন।

রাবিশ র‌্যাডক্লিফ সাহেব কি খেয়ে যে মাতালের মতো দেশ ও মাটিকে ভাগ করেছিলেন, মুহূর্তের মধ্যে নিজের দেশ পর হয়ে গেল। আজ বিদেশ বিভূঁইয়ে তার বিদায় নিতে হলো প্রবাসীর পরিচয়ে। অথচ এই জামালপুর জেলায় সরিষাবাড়ীতে তার পূর্বপুরুষরা আগে বেড়াতে আসত এক সময় নতুন জামাই হয়ে। র‌্যাডক্লিফ সাহেব এ সব বুঝতে চাননি, তাহলে আজ এমনভাবে তাকে চেতনানাশক ওষুধ খেয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ডোবায় পড়ে সহস্রজনের কৌতূহলের মাথায় মারা যেতে হতো না’।

সুন্দরবনের বাঘ, বানর, হরিণ ও কুমির (বাবাহকু) পর্ষদের কেন্দ্রীয় প্রচার দপ্তর থেকে একটি প্রেসনোটে উপরের কথাগুলো বলা হয়। কচিখালিতে প্রচারমন্ত্রকের শীর্ষ কর্মকর্তা হরিণা হাঁপানের স্বাক্ষরে প্রেসনোটটিতে লোকালয়ের একটি গ্রামে বঙ্গ বাহাদুর খ্যাতিপ্রাপ্ত প্রায় ৫ টন ওজনের একটি হাতির অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়।

বাবাহকুর প্রেসিডিয়াম প্রধান সুন্দর মিয়া এ মুহূর্তে কটকায় বর্ষা অবকাশ কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। বার্তা সংস্থা উবিসসস (উড়ো বিভ্রান্তিকর সংশয় ও সন্দেহ)-এর সঙ্গে এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রাণিসম্পদ সম্প্রদায়ের এই বর্ষিয়ান নেতা ‘বঙ্গ বাহাদুরের’ মৃত্যুতে তার সমাজ ও সংস্কৃতি একজন প্রজ্ঞাবান পরিব্রাজক হারাল বলে মন্তব্য করেছেন।

ইতিহাসের সূত্র টেনে সুন্দরমিয়া বলেন, ‘সংস্কৃতি ও ব্যবসাবাণিজ্যের বনেদি সিল্ক রুটের পথেই বেরিয়েছিলেন বঙ্গ বাহাদুর। তিনি সম্প্রতি লোকালয়ে বিশেষ করে কয়েকদিন আগে আসামে, লোকালয়ের রাজধানীতে, পাশের জেলার উৎসব সম্মেলনের প্রাক্কালে যে জঙ্গি আক্রমণ হয় সম্ভবত তার উত্তেজনা প্রশমনে কৌতুকপ্রদ আগ্রহ সৃষ্টির উদ্দেশে তিনি দুর্গম পথযাত্রা শুরু করেছিলেন’।

সুন্দর মিয়া শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, বাবাহকুর পর্ষদের প্রভাবশালী ঐরাবত গ্রুপের সম্মানীয় সদস্য ‘বঙ্গ বাহাদুর’ প্রজ্ঞাবান ও ইতিহাস সচেতন ছিলেন। ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাঙের একজন অনুরক্ত ভক্ত ছিলেন তিনি। আসামের পাহাড় থেকে অসম্ভব পানি গড়িয়ে লোকালয়ের ভরাট হয়ে যাওয়া নদ-নদীগুলো উপচে ছাপিয়ে চারদিকে যে বন্যা ও বেদনার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তা দেখতে, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করতে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ এবং জামালপুরে পা রেখেছিলেন তিনি। এক সময় গৌতমবুদ্ধও এ লোকালয়ে এভাবে একাধিকবার পা রেখেছিলেন।

বঙ্গ বাহাদুর ক্ষুদ্র স্বার্থে কিংবা নিছক অভিমান করে বাড়ির বাইরে বের হননি। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে তার জন্ম- মন তার বিশাল। সে বাড়ির বের হয়েছিল সবার প্রতি সহমর্মিতা জানাতে। জেলায় জেলায় লোকালয়ে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে বেড়ানোর সময় কাউকে আঘাত করেনি অহিংস এই ঐরাবত।

অথচ আসাম থেকে রীতিমতো সরকারি প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছিল ঘরের ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে। বঙ্গ বাহাদুর স্থানীয় জনগণের খাতির, যত্ন ও আগ্রহ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তাকে বঙ্গ বাহাদুর উপাধি দেয়া হয়েছে তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে। হাতি গর্তে পড়লে চামচিকায়ও তাকে লাথি মারে- এমন প্রবাদ তার মনোবল ভাঙাতে পারেনি। উদ্ধারকারী দল ব্যর্থ মনোরথ হয়ে দেশে ফিরে যায়।

বঙ্গ বাহাদুরের বিশেষ আনন্দ ও তৃপ্তি এই যে এ দেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় তাকে ব্যাপকভাবে সচিত্র (‘সরাসরি’ও) দেখানো হয়েছে। সুন্দর মিয়া বঙ্গ বাহাদুরের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে কবিতার চরণ উচ্চারণে বলেন, ‘সাথে করে তিনি এনেছিলেন যে মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণ, প্রচার মাধ্যমে তাকে করে গেলেন অকাতরে দান’।

হাতি বাঁচলেও লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা- এ মহাজন বাক্য বিবেচনায় নিয়ে তার সমাধিস্থলে বিশেষ কমিউনিটি পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে এটা জেনে বাবাহকুর তরফ থেকে বিশেষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়।

স্থানীয় সালিশালয়ে বঙ্গ বাহাদুরের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান নিয়ে একটি রিট মোকদ্দমাও দাখিল হয়েছে এবং লোকালয়ের জাদুঘরে বঙ্গ বাহাদুরের কঙ্কাল রাখার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে জেনে বাবাহকু পর্ষদ পরিস্থিতির প্রতি বিশেষ নজর রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। সুন্দরবনের পাশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে চলমান সুন্দরবনের সার্বিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্দোলনের প্রতিও বাবাহকু থেকে বিশেষ সমর্থন জানিয়ে পরিস্থিতি পরিবীক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।

সুন্দর মিয়া বাবাহকু পর্ষদের উচ্চকক্ষে ‘বনে জঙ্গলের’ আগামী অধিবেশনে বঙ্গ বাহাদুরের বিদায় এবং ‘সুন্দরবনের সার্বিক স্বার্থ’ সংক্রান্ত দুটি বিষয়ে আলোচনার জন্য বিশেষ মুলতবি অধিবেশন ডাকতে আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যক্ষ শিয়ালেন্দু মামাইয়াকে। বাবাহকুর বিবৃতিতে লোকালয়ের প্রচার মাধ্যমের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে, তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে বিশেষ তদন্তে অনুষ্ঠানের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্রেসনোটে সে তদন্ত প্রতিবেদন যাতে যথাসময়ে প্রকাশ পায় তা নিশ্চিতকরণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আসামের পাহাড়ি বন থেকে সেখানকার বাবাহকুর অন্যতম মিশন প্রধান ঐতরিক ঐতরিয়া এক বিবৃতিতে বঙ্গ বাহাদুরের অনুসন্ধিৎসু মন ও সহমর্মিমতার দর্শনকে যুগ যুগ ধরে প্রাণিকুল মনে রাখবে বলে উল্লেখ করেছেন। ঐতরিয়া বলেন, এটা কম কিসে যে প্রায় দুই মাস স্থানীয় মিডিয়ায় শিরোনামে এসেছিলেন তিনি।

সেখানকার বন্যা আক্রান্ত মনুষ্যকুলের অভুক্ত থাকার খবরের চাইতে বঙ্গ বাহাদুরকে তৃপ্ত রাখার আয়োজন দেখে ঐতরিয়া যুগপৎভাবে বিস্মিত ও বেদনাবোধ প্রকাশ করেছেন। চেতনানাশক ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিব্রাজক শ্রেষ্ঠ এই মহান প্রাণীর জীবন সংহার ঘটানো হয়েছে কিনা তা তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন ঐতরিয়া। ঐতরিয়া তার বিবৃতির উপান্তে লোকালয়ের সামাজিক মাধ্যম থেকে ভেসে আসা একটি ইচড়ে পাকা ছড়া উদ্ধৃত করেন-

ব্যাংকের রিজার্ভ চাপা পড়েছে তনুর তলে,
তনু চাপা পড়েছে মিতুর তলে,
মিতু চাপা পড়েছে জঙ্গির তলে,
জঙ্গি চাপা পড়েছে পিস টিভির তলে,
পিস টিভি চাপা পড়েছে রামপালের তলে,
রামপাল চাপা পড়েছে বন্যার পানির তলে,
বন্যার পানি চাপা পড়েছে হাতির তলে।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর; অর্থনীতি বিশ্লেষক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা