নতুন বছর ব্যস্ততায় কাটবে আলিয়ার

আগের সংবাদ

ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন সাবের হোসেন চৌধুরী

পরের সংবাদ

সিলেটে বিএনপির ভরাডুবি

সাংগঠনিক দুর্বলতার পাশাপাশি জামায়াতের নির্লিপ্ততাও দায়ী

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ২, ২০১৯ , ১:২৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ২, ২০১৯, ১:২৪ অপরাহ্ণ

Avatar

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটে ৬টি আসনের মধ্যে একটিতেও জয়লাভ করতে পারেনি বিএনপি। নির্বাচনে ভরাডুবির পর সিলেট বিএনপিতে বিরাজ করছে রাজ্যের হতাশা। যদিও দলটির সমর্থন নিয়ে সিলেট-২ আসনে গণফোরামের একজন প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। অপরদিকে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোটের জয়জয়কার। সিলেট-২ ছাড়া বাকি ৫টি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে চমক দেখিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ মুহূর্তে বিএনপির শোচনীয় পরাজয় নিয়ে সর্বত্রই চলছে আলোচনা। এ পরিস্থিতিতে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে ‘মুখরক্ষা’র চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ অভিজ্ঞ মহলের ধারণা সাংগঠনিক দুর্বলতার পাশাপাশি শক্তিশালী প্রার্থীর অভাব এবং জামায়াতে ইসলামীর নির্লিপ্ততার কারণেই বিএনপির এই ভরাডুবি।
দুই সপ্তাহের প্রচারণা এবং নির্বাচনের দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতের ঘটনা ঘটলেও তুলনামূলক শান্ত ছিল সিলেট অঞ্চল। তারপরও সিলেটে বিএনপির কোনো প্রার্থীই পরাজয় ঠেকাতে পারেননি। দল সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের অভাব, শক্তিশালী প্রার্থী দিতে ব্যর্থতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মামলা-হামলায় বিপর্যয়, এজেন্ট দিতে না পারা এবং সর্বোপরি সিলেট বিএনপির দুই কাণ্ডারি শমসের মবিন চৌধুরী ও ইনাম আহমদ চৌধুরীর দল ত্যাগে ভোটে বিএনপির বিপর্যয় হয়েছে। গ্রেপ্তারের ভয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঠে সেভাবে সক্রিয় দেখা যায়নি। নির্বাচনের দিন তারা মাঠে থাকতে পারেনি। এর মধ্য দিয়ে দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। তা ছাড়া গত সিটি নির্বাচন থেকে সিলেট জামায়াত-বিএনপির সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। সিটি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলীয় প্রার্থী দিয়েছিল। এর রেশ ধরেই সংসদ নির্বাচনে সিলেটে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দলটি থেকে এক্যফ্রন্টের কোনো প্রার্থী না দিতে প্রচারণা চালায় বিএনপি। শীর্ষ নেতৃত্বও তৃণমূল বিএনপির এ দাবি মেনে নিয়ে সিলেটে জামায়াতের কাউকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়নি। এতে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপি দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নানা নেতিবাচক মন্তব্য করেন। সিলেট জামায়াতের শীর্ষ কয়েকজন নেতা মাঝেমধ্যে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের প্রচারণায় থাকলেও অন্যরা নিজেদের ঘরের ভিতরেই আবদ্ধ রাখেন। অনেকে বিএনপিকে শিক্ষা দিতে নৌকায় ভোট দিয়েছেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ ভোরের কাগজকে বলেন, মামলা-হামলায় বিপর্যয়ের মধ্যেও সিলেটে বিএনপি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ভোটের আগের রাত প্রশাসনের সহায়তায় ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপক ভোট কারচুপি আমাদের প্রার্থীদের হারিয়ে দিয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসনে এবার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের ড. এ কে আবদুল মোমেন ও বিএনপির খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। দুজনই বিরামহীন নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যান। তবে বিএনপির সাবেক ‘হেভিওয়েট নেতা’ ইনাম আহমদ চৌধুরী নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ায় সুবিধাজনক অবস্থায় চলে আসেন ড. এ কে আব্দুল মোমেন। ইনাম আহমদ চৌধুরী সিলেট-১ আসনে বিএনপির বিকল্প প্রার্থী ছিলেন। বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ভোটের মাঠে ইনামকে কাছে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী থাকলেও উনি আওয়ামী লীগে যোগদান করে উন্নয়নের স্বার্থে মোমেনের পক্ষে ভোট চান। এর ফলে ভোটের মাঠে কার্যত ইনাম মোমেনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় বিএনপির প্রার্থী মুক্তাদিরকে।
নির্বাচনের পর ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, সিলেট-১ আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন মহাজোট মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। ড. মোমেন পান ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ধানের শীষে ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির পান ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৫১ ভোট।
সিলেট-২ আসনটি মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাওয়ায় আসনটি ছেড়ে দেয়া হয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামকে। ফলে নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক বিহীন নির্বাচন ছিল প্রায় উত্তাপহীন। এর মধ্যে গণফোরামের মোকাব্বির খান (উদীয়মান সূর্য) ৬৯ হাজার ৪২০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী আওয়ামী লীগ ঘরানার স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহিবুর রহমান ‘ডাব’ প্রতীকে পেয়েছেন ৩০ হাজার ৪৪৯ ভোট। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ঘরানার অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী সিংহ প্রতীকে ২০ হাজার ৭৪৫ ভোট এবং লাঙ্গল প্রতীকে মহাজোট প্রার্থী ইয়াহহিয়া চৌধুরী ১৮ হাজার ৩২ ভোট পেয়েছেন।
সিলেট-৩ আসনে মহাজোট প্রার্থী মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৮৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির শফি আহমদ চৌধুরী পেয়েছেন ৮৩ হাজার ২৮৮ ভোট। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী শফি আহমদ চৌধুরী ভোটের আগের রাত প্রশাসনের সহায়তায় ক্ষমতাসীন দলের ভোট কারচুপি ও অনিয়মকে দায়ী করেছেন। কিন্তু তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকেই এটাকে পরাজয়ের একমাত্র কারণ মানতে নারাজ। তারা সাংগঠনিক দুর্বলতার পাশাপাশি বিএনপির প্রার্থী শফি আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে স্থানীয় জামায়াতের বৈরী সম্পর্ককে দায়ী করেছেন।
সিলেট-৪ আসনে আওয়ামী লীগের ইমরান আহমদ নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৭২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী বিএনপির দিলদার হোসেন সেলিম ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৪৪৮ ভোট। ১ লাখ ৩০ হাজার ২২৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন ইমরান। এ আসনে জাতীয় পার্টি (জাপা) প্রার্থী শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের ইমরান আহমদকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তা ছাড়া চা-বাগানের ভোটার, সংখ্যালঘু ও উপজাতীদের ভোট ব্যবধান গড়ে দিয়েছে।
সিলেট-৫ আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাফিজ আহমদ মজুমদার। নৌকা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক (ধানের শীষ) পেয়েছেন ৮৬ হাজার ১৫১ ভোট। এখানেও পরাজয়ের বড় কারণ জামায়াতে ইসলামীর নির্লিপ্ততা। অনেকের মতে, এ আসনে জামায়াতের প্রার্থীকে বাদ দিয়ে তাদের চরম শত্রু জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীকে বিএনপি বেছে নেয়ায় জামায়াতের সমর্থকরা নৌকায় ভোট দিয়েছেন। ক্লিন ইমেজের অধিকারী আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাফিজ আহমদ মজুমদারকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়ে গোপনে নৌকার পক্ষে কাজ করেছে জামায়াতের সমর্থকরা। এখানেও চা-বাগানের ভোটার ও সংখ্যালঘুরা ব্যবধান গড়ে দিয়েছে।
সিলেট-৬ আসনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৯৬ হাজার ১৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত বিএনপির প্রার্থী ফয়সল আহমদ চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৮৯ ভোট। এখানেও পরাজয়ের বড় কারণ জামায়াতে ইসলামীর নির্লিপ্ততা। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে বিএনপি নেতা ফয়সলকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ফলে জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে মাঠে নামেনি ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে। গোপন আঁতাত করে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ আসনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে ভোট দিয়েছেন এমন অভিযোগ বিএনপি নেতাকর্মীদের। অবশ্য বিএনপি দলীয় প্রার্থী, এ জন্য ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপক কারচুপিকে দায়ী করেছেন।