নতুন বছরের প্রথম দিনেই স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি

আগের সংবাদ

যশোরে ব্যবসায়ীর গলা কেটে হত্যা

পরের সংবাদ

এক হাতে পূর্ণ কর সুধা অন্য হাতে চূর্ণ কর পাত্র

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১, ২০১৯ , ৮:৫২ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ১, ২০১৯, ৯:০১ অপরাহ্ণ

শেখর দত্ত

রাজনীতিক ও কলাম লেখক

২০০৮ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট পেয়েছিল ৩৩টি আসন। নিঃসন্দেহে এখনকার অবস্থার চাইতে তখন অবস্থা ছিল তাদের অনেক ভালো। এবারে প্রার্থীরা গণফোরামের সুলতান মনসুরের মতো মাঠে কামড় দিয়ে পড়ে থাকলে আরো বেশ কিছু আসন নিঃসন্দেহে বিএনপি হয়তো পেত। কিন্তু তা একেবারেই হয়নি। তবে দুই পক্ষের সামনেই রয়েছে হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। প্রত্যাশার পারদ যেখানে চড়া, সেখানে প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা সুউচ্চ ও প্রবল হতে বাধ্য। অভিজ্ঞতা বলে, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক থেকেই ঘটে যত অঘটন।

নির্বাচনী ফলাফলে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই পক্ষ একচেটিয়া-নিরঙ্কুশ বিজয়ী আওয়ামী লীগ এবং ধরাশায়ী-বিধ্বস্ত পরাজিত বিএনপি ইতোমধ্যে বক্তব্য দিয়েছে। বিএনপি নির্বাচন ‘প্রত্যাখ্যান’ করে ‘পুনর্নির্বাচন’ দাবি করেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ শান্তি-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার কথা বলে বিজয় মিছিল করতে মানা করে দিয়েছে।

এই দুই অবস্থানের বাইরে নিরপেক্ষ দাবিদার সুশীল সমাজ নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক বক্তব্য বলতে শুরু করে দিয়েছে। নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে তারা বলতে চাইছেন, বহুত্ববাদী সমাজ গঠন এবং পরমতসহিষ্ণুতা ও বাকস্বাধীনতা এতে বাধাগ্রস্ত হবে এবং গণতন্ত্রের ঘাটতি থাকায় উন্নয়ন মুখথুবড়ে পড়বে।

নিরপেক্ষ দাবিদার এই মহল ১/১১ জরুরি আইনের ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দিন শাসনামলে ‘মাইনাস টু’ তত্ত্ব সামনে এনে বাস্তবায়ন এবং ‘কিংস পার্টি’ গঠন করার পাঁয়তারা করেছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় কার্যত বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তখন কোথায় ছিল তাদের পরমতসহিষ্ণুতা ও বাকস্বাধীনতা! উন্নয়ন মুখথুবড়ে পড়া আর বহুত্ববাদী সমাজ গঠনের বিষয়! তাদের তথাকথিত জ্ঞানগর্ভ ও নৈতিকতাপূর্ণ আলোচনা বিবেচনায় নিলে মনে হয়, গণমানুষ সব ভুলে যায়। আসলে যে তা নয়, এবারের উন্নয়ন ও নির্বাচনে নৌকার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থেকে আর উৎসাহ ভরে অবস্থান নিয়ে জনগণ এর প্রমাণ রেখেছে।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রথমেই বলতে হয় যে, আমাদের মতো দেশে শতভাগ সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন বর্তমান পর্যায়ে আদৌ সম্ভব নয়। এটা চলমান কঠিন এক গণসংগ্রাম। বলাই বাহুল্য রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলকে হেয় করে, বাদ দিয়ে কিংবা অতীতের মতো বিরাজনীতিকরণের ধারা আমদানি করে পরমতসহিষ্ণুতা ও বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রের ঘাটতি দূর করা সম্ভব নয়।

এখানে বলতেই হয় যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চড়াই-উৎরাই, বাধাবিঘ্ন, ঘাটতি-দুর্বলতা অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হয়। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ যে চরম ক্ষতিকর, তা আমরা অভিজ্ঞতা থেকে হাড়ে হাড়ে টের পাই।

এই দিকটিতে আলোচনায় না গিয়ে বলতে হয় যে, কোনো দলের পক্ষেই সব সময় অনুকূল বা প্রতিকূল তথা একই রকম পরিবেশ পাওয়া সম্ভব নয়। দলের কর্মই আসলে দলের ভাগ্যকে নির্ধারণ করে। সদা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে জনমনস্বত্ত্ব ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাই টিকে থাকা ও গণআস্থা লাভের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। যে দল তা পারে না সেই দল যায় কালস্রোতে হারিয়ে।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বিগত বছরগুলোতে নির্বাচন, সংসদ ও গণতন্ত্র নিয়ে নানামুখী অনভিপ্রেত ঘটনার পর এবারে সংলাপ সফল হওয়ার ভেতর দিয়ে শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। আওয়ামী লীগে মনোনয়ন ইচ্ছুক প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে যতটা উৎসব করে কেন্দ্রীয় অফিসে গিয়েছে, তার চাইতে একটুও কম উৎসব দিয়ে শুরু হয়নি বিএনপি মনোনয়ন পর্ব। কিন্তু অবাধ অধিকারের সুযোগ নিয়ে শুরুতেই বিএনপি নেতৃত্ব মারাত্মক এক ভুল করে বসে।

বিএনপির এক বড় নেতার মিছিল থেকে অহেতুক কোনো উসকানি ছাড়া নয়া পল্টনে পুলিশের ওপর হামলা হলে পুলিশের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। এই হামলা ২০১৪ ও ২০১৫ সালে নির্বাচন বয়কট ও সরকার পতনের আন্দোলনের সময় আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে পুলিশ হত্যার নৃশংসতার স্মৃতিকে জাগ্রত করে দেয়।

ড. কামালের ‘জানোয়ার লাঠিয়াল বাহিনী’ বক্তব্য ছিল পুলিশকে আরো বৈরী করারই নামান্তর। সর্বোপরি পুলিশ যখন আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে, তখন তাদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে আর্মির নিয়োগের প্রশ্নটি বিএনপি সামনে আনে। সিভিল প্রশাসন সম্পর্কেও নানা বিরূপ কথা বলা শুরু করে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বিএনপি এটা লক্ষ করেনি যে, ২০০১-২০০৬ শাসনামলে ‘হাওয়া ভবন’ করে তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের সব অংশকে এবং এমনকি ‘ক্যান্টনমেন্টের দল’ বিএনপি ক্যান্টনমেন্টকেই ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। বিএনপি এবারে নির্বাচনে নেমেই তাদের কথাবার্তা ও কাজকর্ম দিয়ে সেই কাটা জায়গাগুলোকেই খুচিয়ে দগদগে করে তোলে। কাচের ঘরে বসে কেউ কি কখনো ঢিল দেয়? নিজেদের ২০১৪/১৫-এর আগুন সন্ত্রাসী কৃতকর্মের জন্য বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপরে মামলা ছিলই। বিএনপি এটা বুঝে নাই যে, অতীতের ট্রেক রেকর্ড নিয়ে তারা নির্বাচন নেমেছে।

সর্বোপরি রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বস্তরে ধিকৃত দ-িত পলাতক আসামি তারেক রহমানকে তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শামিল করে। নির্বাচনী মাঠে নেমেই মারমুখী হয়ে আওয়ামী লীগের চারজনকে খুন করে। কোথায় তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি স্বাভাবিক ও সুকৌশলী অবস্থান নিবে তা নয়, তীব্র বিরোধী ও গরম-মারমুখী অবস্থান নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নামে। এটা কার না জানা যে, নির্বাচনী যুদ্ধে প্রতিপক্ষ থাকে সুযোগের সন্ধানে। যুদ্ধে সবকিছু ছাপিয়ে বিজয়টাই প্রধান।

সুযোগ যদি দেয়া হয় তবে প্রতিপক্ষ তার সদ্ব্যবহার করবেই। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করার কারণে বিএনপি ক্ষমতায় গেলেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে তাদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলে। ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চ এবং ২০০৬ সালে তারেকের কার্যত মুচলেকা দিয়ে বিদেশ যাওয়া এর প্রমাণ। বিপরীতে আওয়ামী লীগ প্রশাসনের ব্যাপারে কীভাবে কুশলী হতে হয় সেটা ভালোই রপ্ত করেছে। বিএনপি মহাসচিব অভিযোগ করেছেন, এই নির্বাচনে রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল তাদের প্রতিপক্ষ। আসলে অতীত ও বর্তমান কর্মকা- দিয়ে বিএনপি নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রকে।

প্রসঙ্গত হাওয়া ভবনের দুঃশাসন প্রেক্ষাপটে রেখে বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে ২০০৬ সালে। ১৮ বছর ধরে দলটি ক্ষমতার বাইরে। ক্ষমতায় থাকতে যেমন তেমনি ক্ষমতার বাইরে গেলেও বিএনপি কেবলই করতে থাকে ভুল। এমন ভুল করা দলটির জন্মফল বলা যায়। ক্যান্টনমেন্টে প্রতিষ্ঠা পাওয়া দলটি এই সময়কালে নিজ কৃতকর্মের জন্য বিপদের মাঝে থেকে যা কিছু করেছে, তা সবই গেছে দলটির বিরুদ্ধে।

সংসদ-টেলিফোন-নির্বাচন বয়কট, দুই দুইবার আগুন সন্ত্রাস প্রভৃতি সবই ছিল দেশ ও জনগণের জন্য নেতিবাচক ও ক্ষতিকর কাজ। উগ্রসন্ত্রাসী অপতৎপরতায় যখন বিভিন্ন সম্প্রদায় ও পেশার মানুষ মরছে, বিএনপি তখন ওই সব কাজের প্রতিবাদ পর্যন্ত করেনি। হেফাজতকে ব্যবহার করতে চেয়েছে ক্ষমতা দখলের হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। কিন্তু হেফাজত যখন শাপালা চত্বরে বিপদে পড়েছে, তখন পাশে এসে দাঁড়ায়নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সর্বোপরি জামায়াতকে ২০ দলীয় জোটে রেখে পাকিস্তানি মদদে আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে, দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপগুলো যখন নেয়া হচ্ছিল, তখন বিএনপির সংগঠন ছিল কার্যত স্থবির ও ছত্রখান। বিএনপির নেতৃত্ব দলের ক্যাডারদের আগুন সন্ত্রাসের দিকে দুইবার ঠেলে দিয়েছিল, কিন্তু যখন ক্যাডাররা ওইসব বেআইনি ও অবৈধ কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ার কারণে মামলায় পড়ে, তখন পাশে এসে দাঁড়ায়নি।

নেতা তারেক রহমান থাকবেন মামলা এড়িয়ে আরামে লন্ডনে, সেখান থেকে বলবেন নানা বিরূপ কথা এবং জীবনযাপনের নানা উচ্ছৃঙ্খল গল্পকথা শোনা যাবে, আর তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ভুল রাজনীতির পরিণতিতে শাস্তি ভোগ করবে, এমনটা কোনো সংগঠনের নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারে না। ফলে যেমনটা হওয়ার তেমনটাই হয়েছে।

উল্লিখিত ১৮ বছরে জেলাসহ তৃণমূলকে চাঙ্গা করার জন্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তেমন কোনো ধারাবাহিক বৈঠক ও সভা করেছে বলে জানা যায় না। বিপদে পড়লে আওয়ামী লীগের তৃণমূল যেভাবে ঐক্যবদ্ধ ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যায়, বিএনপি ক্ষেত্রে হয় ঠিক তার উল্টো।

১/১১-এর পর নেতা খালেদা জিয়া জেলে গেলে এবং দ্বিতীয় নেতা তারেক রহমান বিদেশে যেতে বাধ্য হলেও দলটি কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়। স্থবির ভগ্ন ও বিপর্যস্ত দশা সেখান থেকেই শুরু। বিএনপিকে বলা হয় বড় দল, তিনবার ছিল ক্ষমতায়।

কিন্তু এটাই বাস্তব যে, এবারে খালেদা জিয়াকে যখন বিচারের রায়ে জেলে যেতে হয়, তখন সংগঠন সামান্যতম প্রতিক্রিয়া দেখাতেও ব্যর্থ হয়। যে দল নেত্রীকে জেলে নেয়ার পর আন্দোলন দূরে থাক, হিসাবে নেয়ার মতো কোনো জমায়েত ও মিছিল করতে ব্যর্থ হয়, সেই দল নির্বাচনে জনগণকে নামানো দূরে থাক, সমগ্র সাংগঠিক শক্তি নিয়ে কখনো মাঠে নামতে পারে না।

তবুও হয়তো নামত। কেননা আমরা হচ্ছি নির্বাচন পাগল জাতি। কিন্তু প্রথমত ড. কামালের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট করে বিএনপি নেতৃত্ব দলকে দিকভ্রান্ত করে দেয়। বিএনপি হচ্ছে জিয়ার পার্টি। ভুল ইতিহাস হলেও এটাই বাস্তব, জিয়া হচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’।

এমন একটি বড় দল যদি এই বিষয়ে গোঁজামিল দিয়ে নির্বাচনের কয়েকদিন আগে কোনো প্রস্তুতি ও মোটিভেশন ছাড়া হঠাৎ করে ড. কামালের সঙ্গে ঐক্য করে এবং বিএনপির মঞ্চ থেকে যদি জয় বাংলা ও জয় বঙ্গবন্ধু শব্দ উচ্চারিত হয়, তবে দলীয় নেতাকর্মীদের হতবুদ্ধি ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়ই হয়ে যাওয়ার কথা।

‘জামায়াত থাকবে জানলে ঐক্যফ্রন্টে যেতাম না’- এই কথা নির্বাচনের কয়েকদিন আগে বলে জামায়াত-বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের পায়ে কুড়াল মেরেছেন ড. কামাল। জামায়াত সম্পর্কে বিএনপির উল্টোপাল্টা বিভ্রান্তিকর অবস্থান এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে কটূক্তি বিএনপির সর্বনাশ ডেকে এনেছে। সর্বোপরি এই ত্রিভঙ্গ রূপী ঐক্যের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ছিল না।

তবুও যতটুকু সচল হতে পারত, তারেক রহমানের মনোনয়ন বাণিজ্য সেই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়। সুদীর্ঘ বছর বিভক্ত ছত্রখান ও অচল থাকার পর যদি মনোনয়ন বাণিজ্যের জন্য তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলীয় অফিস আক্রমণ করে, তবে সেই দল আদৌ নির্বাচন সর্বোতভাবে করতে পারে না। দুটো নির্বাচনী গল্প বললেই বুঝা যাবে, মনোনয়ন বাণিজ্য কীভাবে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে কার্যত পঙ্গু করে দেয়।

প্রথম গল্প এলাকা থেকে পাওয়া। ঝালকাঠিতে প্রবীণ জননেতা আমির হোসেন আমুর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জেবা আমিন খান। এলাকায় তাকে কেউ চিনে না। খবর রটেছে স্বাভাবিক প্রার্থী ইলেন ভুট্টোর কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল, তিনি দিতে পারেননি। ৩ কোটি টাকা দিয়ে তিনি নাকি তারেক থেকে মনোনয়ন কিনেছেন।

দ্বিতীয় গল্প পত্রিকা থেকে জানা। কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোরশেদ কনকচাঁপাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল প্রবীণ জননেতা মোহাম্মদ নাসিমের বিরুদ্ধে। প্রচারণার শুরুর পর প্রথম ১১ দিন তিনি এলাকায়ই যাননি। যে দিন তিনি প্রথম যেতে চান কাজিপুরের নির্বাচনী এলাকায়, সে দিন একটি কালো গাড়ি দেখে ভয় পেয়ে তিনি ফিরে আসেন।

বিএনপির এমন প্রার্থীরা যদি যথাক্রমে ৫৯৮২ ও ১১১৮ ভোট পায়, তবে দোষ দেয়া যাবে কাকে! তৃণমূলের খবর থেকে জানি, দুবাই থেকে নাশকতার জন্য টাকা আসা এবং ধরা পড়ার খবরে বিএনপির নেতাকর্মীরা ভয়ে যায় আরো চুপসে। বিএনপি চরম দুর্ভাগ্যের কবলে পড়ে কার্যত যিনি মনোনয়ন বাণিজ্য ও নাশকতার জন্য টাকা পাঠানোর নায়ক, সেই তারেককেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারা কার্যত প্রজেক্ট করে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, কোনো বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে তারা পোলিং এজেন্ট নাই অভিযোগ তুলেন।

ড. কামাল যখন নির্বাচন কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে এজেন্ট নেই বলে অভিযোগ করলেন, তখন তিনি কেন সেই কেন্দ্রের এজেন্টদের নাম ঘোষণা করে এজেন্ট বসিয়ে দিয়ে আসলেন না? বাস্তবে এত এজেন্ট ঠিক করার মতো অবস্থায় ছিল না ঐক্যজোটের প্রার্থীরা। পরাজয় নিশ্চিত জেনে কেউই টাকা খরচ করেনি, কর্মীদের কাছে যায়নি।

প্রার্থী বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর প্রতিবাদে এলাকায় কেউ রাস্তার নামেনি। তাদের ভাবটা ছিল এই, যেন কেউ দয়া করে তাদের এজেন্টকে এনে কেন্দ্রে বসিয়ে দেবে এবং নির্বাচনের দিনে জনগণ তাদের পক্ষে ভোট বিপ্লব করে দিবে।
কার্যত ধানের শীষের যখন এলাকায় এলাকায় এমন ধরনের ভগ্নদশাপ্রাপ্ত অবস্থা, তখন নৌকার পক্ষে গণজোয়ার চলছে।

ওয়ামী লীগের ইস্যু হলো উন্নয়ন। ইশতেহারে প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্জন ও সাফল্য তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে আশু ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য দেশবাসীর সামনে দলটি তুলে ধরেছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন কোনো ভুল হয়ে থাকলে মাপ চেয়েছে। উল্টোদিকে বিএনপি উন্নয়নের ইস্যু সামনে রাখেনি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইস্যু সামনে এনেছে।

হাওয়া ও খোয়াব ভবন খ্যাত তারেক রহমানকে সামনে রেখে এই ইস্যুর পক্ষে জনগণকে নামনো আদৌ সম্ভব ছিল না। তাই একপক্ষ যখন নির্বাচনী উৎসবে শামিল হয়েছে, তখন অন্যপক্ষ নিজেদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে নিয়েছে। ফলে অতি উৎসাহ বেড়েছে এবং ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।

নির্বাচন-পর্ব এখন শেষ। ২০০৮ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট পেয়েছিল ৩৩টি আসন। নিঃসন্দেহে এখনকার অবস্থার চাইতে তখন অবস্থা ছিল তাদের অনেক ভালো। এবারে প্রার্থীরা গণফোরামের সুলতান মনসুরের মতো মাঠে কামড় দিয়ে পড়ে থাকলে আরো বেশ কিছু আসন নিঃসন্দেহে বিএনপি হয়তো পেত।

কিন্তু তা একেবারেই হয়নি। তাই কবিগুরুর কবিতার লাইন : ‘ডান হাতে পূর্ণ করা সুধা/বাম হাতে চূর্ণ কর পাত্র’- কথাটা সত্যে পরিণত হয়েছে। তবে দুই পক্ষের সামনেই রয়েছে হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। প্রত্যাশার পারদ যেখানে চড়া, সেখানে প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা সুউচ্চ ও প্রবল হতে বাধ্য।

অভিজ্ঞতা বলে, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাক থেকেই ঘটে যত অঘটন। অপরদিকে খরার আগুন থেকে উদ্ধার পাওয়াটা বিএনপির জন্য সহজ নয়। জাতিসত্তার ভিত ছাড়া বিএনপি শূন্যের ওপর যে দল গড়ে তুলেছিল, তা ঝড়ের তোড়ে বালির বাধের মতো উড়ে যাবে কিনা কে জানে! তবে এটা ঠিক ভুল কাউকেই ক্ষমা করবে না। কালস্রোত কাকে কোন দিকে ভাসাবে বা ডুবাবে, তা আগামী পাঁচ বছরে নির্ধারিত হয়ে যাবে।

শেখর দত্ত : রাজনীতিক ও কলাম লেখক