নেইমারের জীবনে নতুন রমণী

আগের সংবাদ

পার হয়ে যাই ২০১৮

পরের সংবাদ

সাক্ষরতার হার বেড়ে ৭৩ শতাংশ হয়েছে

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮ , ৩:৫৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮, ৩:৫৪ অপরাহ্ণ

Avatar

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে বহুদূর এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে শিক্ষার উন্নয়নে গত এক দশকে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের ফলে সাক্ষরতার হার বেড়ে ৭৩ শতাংশ হয়েছে। শহর ও গ্রামের সব শিশুকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসার নানা উদ্যোগ আর প্রচেষ্টায় সফল হয়েছে সরকার। ২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করার ক্ষেত্রে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ও উপবৃত্তি ব্যাপক ভ‚মিকা রেখেছে। শুধু শহরাঞ্চলেই নয়, গ্রামের শিক্ষার্থীরাও এখন মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষের মাধ্যমে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে সরকারের সহায়তা উচ্চশিক্ষায় গুণগত ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।
প্রাক-প্রাথামিক ও প্রথামিকে সাফল্য : সরকারের নানামুখী উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় বর্তমানে প্রায় ৯৯ শতাংশ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। তবে শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়গামী করার জন্য সরকার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিকে শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ২০১৯ সালেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
পাঠ্যপুস্তক উৎসব : প্রতি বছর পহেলা জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তক উৎসবে সারাদেশের প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পূর্ণসেট পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল অবধি বিনামূল্যে ২৬০ কোটি ৮৬ লাখ ৯১ হাজার ২৯০ কপি পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথমবারের মতো প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৮২ হাজার ৮৯৬ শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে নিজ নিজ মাতৃভাষার ২ লাখ ২৬ হাজার ৫৫৯ পাঠ্যপুস্তক দেয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে সাফল্য : প্রায় তিন দশক পর জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ৪৪টি বিষয়ে নতুন ও পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন পাঠ্যক্রম অনুসারে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রণয়ন করা হয়েছে ৩৪০টি পাঠ্যপুস্তক। মুখস্থ ও নোট-গাইড নির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সব পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে। এ ছাড়া ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় সাফল্য : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৪৮টি পাবলিক ও ১০৫টি বেসকরারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৫৩টি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত করেছে। গবেষণার মানোন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যৌথ অর্থায়নে ২ হাজার ৫৪ কোটি ৩২ লাখ টাকার উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্প (হেকেপ) বাস্তবায়ন করছে সরকার।
সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি প্রণয়ন : সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রণয়নের ফলে বদলে গেছে সনাতন ধারার পাঠব্যবস্থাপনা। ২০১০ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় দুটি বিষয় বাংলা ও ধর্মে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু করা হয়। ২০১১ সালে এতে যুক্ত হয়েছে ৫টি বিষয়। ২০১২ সালে গণিত ও উচ্চতর গণিত বাদে ২১টি বিষয়ে এ পদ্ধতি চালু হয়েছে। দাখিলে ২০১১ সালে বাংলা ও ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি শুরু হয়। সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান ও পরীক্ষার কারণে ধীরে ধীরে দেশজুড়ে গড়ে উঠছে একটি শিক্ষিত যুক্তিনির্ভর প্রকৃত আধুনিক এক প্রজন্ম।
আইসিটি শিক্ষায় অর্জন : তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে শুধু শহর নয়, এখন গ্রামের শিক্ষার্থীরাও মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষের মাধ্যমে পড়ালেখা করছে। ইতোমধ্যে ৩২ হাজার ৬৬৭টি মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ)-এর আওতায় মাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটির ব্যবহার নিশ্চিতকরণে ৬৪ জেলায় ৬৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি লার্নিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে সঠিক ইতিহাস : পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস বিকৃতি রোধে প্রথিতযশা ইতিহাসবিদদের নিয়ে সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংযোজন করেছে সরকার। বর্তমান প্রজন্ম স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় বীরদের সঠিকভাবে জানতে পারছে।
মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন : উন্নত সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে অবহেলিত মাদ্রাসা শিক্ষাকে উন্নত ও আধুনিকায়নের জন্য এক দশক ধরে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ফর মাদ্রাসা এডুকেশন প্রকল্প’-এর আওতায় ১০০টি মাদ্রাসায় ভোকেশনাল শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি চালু হয়েছে বিজ্ঞান ও কম্পিউটার শাখা। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বা এর অধিভুক্ত অন্যান্য সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস করা দাখিল ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য দেশে প্রথম ব্যাচেলর অব মাদ্রাসা এডুকেশন (বিএমএড) কোর্স চালু হয়েছে। এ ছাড়া কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষিত আলেমদের কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারণে তার শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
শিক্ষায় ই-বুক, ওয়েবসাইট : প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের সব পাঠ্যপুস্তক ই-বুক আকারে করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ওয়েবসাইট ডায়নামিক করে, ই-বুক ভার্সনে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক আপলোড করা হয়েছে। এনসিটিবি ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এটুআই প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকের ই-বুক ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ, যে কোনো সময় পাঠ্যপুস্তক ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।
অনলাইনে ভর্তি ও ফলাফল : অনলাইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলসহ শিক্ষক নিয়োগ ও নিবন্ধন পরীক্ষার ফলাফল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে। মোবাইল ফোনের এসএমএস এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ই-মেইলের মাধ্যমেও তা অতি দ্রুত প্রকাশ করা হচ্ছে।
যথাসময়ে পরীক্ষা ও ফলাফল : এখন সুনির্দিষ্ট তারিখেই প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ এবং ক্লাস শুরু হচ্ছে। এসব পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ নিশ্চিত করা হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি: দেশের ৯৮ ভাগেরও বেশি মাধ্যমিক স্কুল বেসরকারি হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের ১০০ ভাগ শিক্ষক এবং স্টাফরা বেতন পাচ্ছেন। ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩৬ হাজার ৬১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনা ২০০৯ সালেই সারাদেশে এক হাজার ৬২৪টি বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, করিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেন। বর্তমানেও এ কার্যক্রম চলমান। এসব উদ্যোগের ফলে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর জীবন বদলে গেছে।
উপবৃত্তিতে সাফল্য : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাবৃদ্ধি, ঝরেপড়া রোধ, শিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থসামাজিক উন্নয়নে বড় ভ‚মিকা রাখছে উপবৃত্তি প্রকল্প কার্যক্রম। গত ২০০৯-২০১০ থেকে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায় পর্যন্ত দুই কোটি ৮৯ লাখ ৮ হাজার ৯২১ শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে ৫ হাজার ৩১৩ কোটি ৩০ লাখ ৯০ হাজার টাকা উপবৃত্তি দেয়া হয়েছে।
নারী-পুরুষে সমতা অর্জন : বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ ও উপবৃত্তি কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে ছাত্রী ভর্তির হার বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে নারী শিক্ষার হার প্রায় ৫০ ভাগ। আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার হারও প্রায় সমান সমান। শিক্ষাক্ষেত্রে জেন্ডার সমতায় জাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জিত হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে এখন ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের ভর্তির হার ৪৪ থেকে বেড়ে ৫৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
নারী শিক্ষায় ঈর্ষণীয় সাফল্য: প্রায় শতভাগ মেয়েই এখন বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিকে ৬০ ভাগ নারী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের শিক্ষা গ্রহণে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় বাংলাদেশ বর্তমানে সবার উপরে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রথম অবস্থানে বাংলাদেশ। মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে এই অর্জনকে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা ‘বিস্ময়কর’ বলে বর্ণনা করছেন।