জিকোর চোখে সেরা মেসি

আগের সংবাদ

নেইমারের জীবনে নতুন রমণী

পরের সংবাদ

মেয়েদের ফুটবল এবং ক্রিকেটে যত সাফল্য

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮ , ৩:৪০ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮, ৩:৪০ অপরাহ্ণ

Avatar

সময়ের আবর্তনে হারিয়ে গেল আরো একটি বছর। দরজায় কড়া নাড়ছে ২০১৯। নতুন স্বপ্নকে ধারণ করেই প্রতিটি নতুন বছরকে মানুষ স্বাগত জানায়। বিদায়ী বছরের প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব-ভ‚মিতেই রচিত হয় নতুন স্বপ্ন-আশা। একেকটি বছর আসে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে, নতুন প্রেরণা নিয়ে। কারণ বিদায়ী বছর কেমন গেল, সে স্মৃতির রোমন্থন যেমন হবে, তেমনি সব জরা-ক্লান্তিকে মুছে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে মেতে উঠবে সবাই। সুখবর যেমন আমাদের আন্দোলিত করে, তেমনি খারাপ খবরও করে তোলে ব্যথিত, বেদনার্ত। ক্রীড়াঙ্গনে গত বছর যেমনি সাফল্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যর্থতা। মেয়েদের ফুটবল, ক্রিকেট আর আর্চারির সাফল্য ছিল উল্লেখ করার মতো। ওয়ানডেতে অপ্রতিরোধ্য টাইগাররা যে দিনে দিনে সাদা পোশাকেও পরিণত হচ্ছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ ঘরের মাঠে উইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ। ঠিক পাঁচ মাস আগে, অ্যান্টিগায় নিজেদের সর্বনিম্ন ৪৩ রানে অলআউট হওয়া, সেই পথ ধরে পরে ইনিংস ও ২১৯ রানে হার, অতঃপর জ্যামাইকাতে ১৬৬ রানের আরেকটি পরাজয়ের মাধ্যমে হোয়াইটওয়াশ প্রচণ্ডভাবে যা মন-মননে নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা স্টিভ রোডসের শিষ্যদের। জুলাইয়ের পর ডিসেম্বর পেস তোপে বিদীর্ণ হওয়া সাকিব আল হাসানরা পাল্টা শোধ নেন ঘূর্ণি বলের গোলকধাঁধায়। সফররত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে চট্টগ্রাম টেস্টে ৬৪ রানে হারানোর পর ঢাকায় ইনিংস ও ১৮৪ রানে! যেখানে আছে এই প্রথম কোনো প্রতিপক্ষকে সর্বনিম্ন ১১১ রানে গুঁড়িয়ে দেয়ার উল্লাস, আছে প্রথমবারের মতো ফলোঅনে ফেলার মতো চ‚ড়াজয়ের উৎসব, আর স্বর্ণোজ্জ্বল এক ব্যবধান বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়।
সাকিবের বিশ্বরেকর্ড : ২৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দিন শেষেই বোঝা গিয়েছিল চট্টগ্রাম টেস্টের ফয়সালা হবে ২৪ নভেম্বর ম্যাচের তৃতীয় দিনেই। হয়েছেও তাই। সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাত্র আড়াই দিনেই জয় তুলে নিয়েছে সাকিবের দল। প্রতিপক্ষকে দুই ইনিংস মিলিয়ে সবচেয়ে কম বলে দুবার অল আউট করে ম্যাচ জেতার রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। দলের জয়ের সঙ্গে টাইগার অধিনায়কও গড়েন বিশ্বরেকর্ড। কম টেস্ট খেলে ৩ হাজার রান এবং ২০০ উইকেট প্রাপ্তির রেকর্ড এ সাকিবের দখলে। ইংল্যান্ডের ইয়ান বোথামকে হটিয়ে তিনি এ রেকর্ড গড়েন।
চট্টগ্রাম টেস্টের দলে থাকলেও ম্যাচ শুরুর একদিন আগেও সাকিবের খেলা নিয়ে শঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত কোচের অনুপ্রেরণায় ম্যাচটিতে খেলেছেন সাকিব, দলকে দিয়েছেন নেতৃত্ব, জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। এ ম্যাচেই দুর্দান্ত এক বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন সাকিব আল হাসান। ইয়ান বোথাম, গ্যারি সোবার্স ও কপিল দেবদের মতো কিংবদন্তি অলরাউন্ডারদের পেছনে ফেলে টেস্টে দ্রুততম সময়ে ৩ হাজার রান ও ২০০ উইকেট পাওয়ার ইতিহাস গড়েন টাইগার অলরাউন্ডার। এ ক্ষেত্রে তিনি পেছনে ফেলেছেন কিংবদন্তি ইংলিশ ক্রিকেটার ইয়ান বোথামকে। ক্যারিয়ারে ৩ হাজার রান ও ২০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করতে সাবেক এই ইংলিশ ক্রিকেটারের খেলতে হয়েছে ৫৫টি ম্যাচ। অন্যদিকে বোথামের চেয়ে একটি ম্যাচ কম খেলেছেন সাকিব।
তৃতীয় বাংলাদেশ : ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি ওয়ানডে ম্যাচে জিতেছে ইংল্যান্ড। তারপর ভারত। ওয়ানডেতে মাশরাফির দল। ২০টি ওয়ানডে খেলে ১৩টিতেই জয় পেয়েছে। এ ছাড়া হেরেছে ৭টি ম্যাচে। সে হিসাবে বলা যায়, এ বছর হারের চেয়ে জয়ের পাল্লাটা বেশি ভারী টাইগারদের। যা প্রমাণ করে, নিজেদের প্রিয় সংস্করণ ওয়ানডেতে সাফল্যের ধারাবাহিকতা আগের তিন বছরের মতো ২০১৮ সালেও ধরে রেখেছে টাইগাররা। শুধু ধরে রেখেছে বললে ভুল হবে, এবার অতীতের সফলতাকেও ছাড়িয়ে গেছে টাইগাররা। ২০১৮ সালে ৬টি ওয়ানডে সিরিজে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ৩টিতে শিরোপা জিতেছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। বছরের শেষ দুটি ওয়ানডে সিরিজে তো জিম্বাবুয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ করেছে স্টিভ রোডসের শিষ্যরা। গত জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতেছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে ২০১৮ সালে ৮টি টেস্ট খেলে ৩টিতে জিতেছে টাইগাররা। এ ছাড়া ড্র করেছে একটি ম্যাচ। ওয়ানডে ও টেস্টের মতো টি-টোয়েন্টিতেও বেশ সফলতা পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে ১৬টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে টাইগাররা। এর মধ্যে জয় রয়েছে ৫টি। এ ছাড়া হেরেছে অবশিষ্ট ১১টি ম্যাচে। ঘরের মাঠে না পারলেও বিদেশের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছে টাইগাররা। ২০১৯ সালের শুরুতে নিউজিল্যান্ড সফরে যাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ৩০ মে মাঠে গড়াবে আইসিসি বিশ^কাপের আসর। বিশ্বকাপকে ঘিরে স্বপ্নে জাল বুনছে টাইগাররা।
টাইগ্রেসদের দুই শিরোপা জয় : ছেলেদের মতো টাইগ্রেসরা একাধিক জয় না পেলেও ৩৫ দিনের ব্যবধানে দুটি শিরোপা জিতেছে। জুনে ভারতকে হারিয়ে মালয়েশিয়াতে অনুষ্ঠিত নারীদের এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ওই টুর্নামেন্টে টাইগ্রেসরা এক ম্যাচে হারলেও নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে সালমারা।
আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ-২০১৮-এর বাছাইপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ১৪ জুলাই ফাইনাল ম্যাচে আয়ারল্যান্ডকে ২৫ রানে হারায় সালমা খাতুনের দল। উইন্ডিজে অনুষ্ঠিত নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভালো ফল করতে পারেনি সালমারা।
চ্যাম্পিয়ন দুরন্ত মেয়েরা : বাংলাদেশের দুরন্ত মেয়েরা ফুটবলে একের পর এক সাফল্য কাব্য রচনা করেই চলছে। ছেলেরা যেখানে একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছে সেখানে বারবার দেশকে আনন্দের উপলক্ষ এনে দিচ্ছে বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা। শুরুতে পারিবারিক বাধার সঙ্গে ছিল সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। মেয়েরা ফুটবল খেলবে, তা যেন মেনে নিতেই পারেনি মৌলবাদীরা। নানা ফতোয়া দিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা ছিল ফতোয়াবাজদের। ফুটবলের প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণেই মারিয়া মান্ডা-আঁখিদের ঘরের কোণে আটকে রাখতে পারেনি মৌলবাদীরা। একে একে সব বাধা পেরিয়ে তারা ফুটবলার হয়েছে। এরপর সবুজ গালিচায় চোখ-ধাঁধানো ফুটবল নৈপুণ্য প্রদর্শন করে লাখো-কোটি সমর্থকের হৃদয় জয় করেছে। মাঠের লড়াইয়ে কঠিন সব বাধা অতিক্রম করে উড়িয়েছে লাল-সবুজের পতাকা। ৭ অক্টোবর রাতে ভুটানে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে নেপালকে ১-০ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশের দুরন্ত মেয়েরা। ভুটানের রাজধানী থিম্পুর চাংলিমিথাং স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে গোলাম রব্বানী ছোটনের শিষ্যদের সামনে পাত্তাই পায়নি হিমালয়ের কন্যারা। ম্যাচটিতে বাংলাদেশের হয়ে জয়সূচক একমাত্র গোলটি করেন মাসুরা পারভীন। এ জয়ের ফলে টুর্নামেন্টটির প্রথম আসরেই অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ৪ ম্যাচে বাংলাদেশের মেয়েরা প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছে ২৪ বার।
এর আগে এপ্রিলে জকি ইয়ুথ ফুটবল টুর্নামেন্টে স্বাগতিক হংকংয়ের বিপক্ষে ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত হতো বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল দলের। কিন্তু চার জাতির আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের দুরন্ত মেয়েরা প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়াকে ১০-১ ও দ্বিতীয় ম্যাচে ইরানকে হারায় ৮-১ গোলে। ১ এপ্রিল হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচেও সেই ধারাবাহিকতায় বজায় রাখে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। শিরোপা জয়ের ম্যাচে হংকংকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে শিরোপা জেতে গোলাম রাব্বানী ছোটনের শিষ্যরা। ৩১ মার্চ ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করা তহুরা খাতুন ১ এপ্রিল স্বাগতিকদের বিপক্ষেও হ্যাটট্রিক করেন।
তিন ম্যাচ জিতে বাংলাদেশের মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে অপরাজিত থেকে। হংকংয়ে জকি ক্লাব গার্লস ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ আমন্ত্রণমূলক চার জাতির ফুটবল টুর্নামেন্টের এই আসর ছিল লিগ পদ্ধতির। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইরান ও হংকং প্রত্যেকে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে একবার করে। ৩ ম্যাচে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ।
চল্লিশ বছরের অপেক্ষার অবসান : ছেলেদের ফুটবলে বছরজুড়ে হতাশার মধ্যে আনন্দের সংবাদ হচ্ছে এশিয়ান গেমসের ফুটবলে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা। এশিয়ান গেমসের ফুটবলে ১৯৭৮ সাল থেকে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ, সেই থেকে ২০১৮ এই ৪০ বছরে জয়ের পাল্লা ভারী না হলেও ১৯ আগস্ট জাকার্তায় কাতারকে ১-০ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে এশিয়ান গেমসের ফুটবলে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে জেমি ডের শিষ্যরা। ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের ফুটবলে গ্রুপপর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে কাতারকে ১-০ গোলে হারিয়েছে কোচ জেমি ডের শিষ্যরা। বাংলাদেশের হয়ে এ দিন জয়সূচক একমাত্র গোলটি করেছেন অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া। ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে গোলটি করে বাংলাদেশি সমর্থকদের আনন্দের বন্যায় ভাসান তিনি। গ্রুপপর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে কাতারকে হারানোর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসের ফুটবলের শেষ ষোলোতে উঠেছে বাংলাদেশ।
আর্চারিতে ৬ স্বর্ণ জয় : মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপের তৃতীয় আসরে দাপট দেখিয়েছে বাংলাদেশ। দলগত ও ব্যক্তিগত ইভেন্ট মিলিয়ে প্রতিযোগিতায় ছয়টি স্বর্ণ পদক জিতে নেয় বাংলাদেশের আর্চাররা। প্রতিযোগিতায় ১০ ইভেন্টের মধ্যে ৬টি স্বর্ণ, ৫টি রুপা ও ১টি ব্রোঞ্জ মিলিয়ে ১২টি পদক জিতে বাংলাদেশ। ৪টি স্বর্ণ, ৫টি রুপা ও ৩টি ব্রোঞ্জ জিতে ভারত। একটিও স্বর্ণ জিততে না পারা শ্রীলঙ্কা ও নেপাল ৩টি করে পদক পেয়েছে। ভুটান একটি পদকও পায়নি। কাবাডি, হকি, ভলিবল, কুস্তি, জুডো ও কারাতে সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা।