মিশরে বোমা বিস্ফোরণে ৪ পর্যটক নিহত

আগের সংবাদ

রাজধানীতে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র নেই : ডিএমপি কমিশনার

পরের সংবাদ

অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই ছিল ঊর্ধ্বমুখী

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮ , ২:৫৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ২৯, ২০১৮, ২:৫৬ অপরাহ্ণ

Avatar

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়েই কেটে গেল আরো একটি বছর। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের মতো কোনো রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। ফলে স্বস্তিতে ছিল দেশের অর্থনীতি। বজায় ছিল স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা। যা স্বস্তি দিয়েছে সরকারকে। অর্থনীতির প্রায় সবগুলো সূচকই ছিল ঊর্ধ্বমুখী। অর্থনীতির সঙ্গে উন্নয়নও ছিল এক সূত্রে গাঁথা। নিজস্ব অর্থায়নে শুরু করা পদ্মা সেতু বর্তমানে ৭৫০ মিটার দৃশ্যমান হয়েছে। অর্থাৎ ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। একইসঙ্গে এগিয়ে চলেছে রাজধানীবাসীর স্বপ্নের মেট্রোরেলের কাজ। আগামী এক বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২০ সাল নাগাদ মেট্রোরেলে চড়ে রাজধানীর উত্তরা থেকে আগারগাঁও যেতে পারবেন রাজধানীবাসী। এগুলোকে এ বছরের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বছরটিতে অপ্রাপ্তিও আছে কম-বেশি। ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ছিল মূল্যস্ফীতি, বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে নানা দুর্নীতি, অনিয়ম ও খেলাপিঋণের ঊর্ধ্বমুখিতায় নড়বড়ে ছিল ব্যাংকিং খাত। ব্যাংক ঋণের সুদ হারও ছিল আলোচনার শীর্ষে। অবকাঠামো দুর্বলতা এ বছরও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। শিল্প কারখানায় ছিল গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট। এ ছাড়া ঘাটতি ছিল সুশাসনেরও। পাশাপাশি শেয়ারবাজারের লেনদেনের পরিমাণও ছিল কমের দিকে। বছরের শেষদিকে নির্বাচনী ডামাডোলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা কিছুটা স্থবির ছিল। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্যাস সংকট মেটাতে কয়লার ব্যবহারে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে মত দেন তারা। তবে সবকিছুর ওপর তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন ২০১৯ সালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
চলতি অর্থবছরটি ছিল নির্বাচনের বছর। ফলে দেশের অর্থনীতির গতি কিছুটা শ্লথ লক্ষ করা গেছে। কারণ নির্বাচনের ডামাডোল এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগে অন্তত তিন মাস দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর থাকে। সরকারি অর্থ ব্যয়ও বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন কমে যায়। যার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়াটা স্বাভাবিক। যদিও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব পড়বে না। তার মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন অনেক উঁচুতে অবস্থান করছে। গত ১০ বছরে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় দেশে এমন একটি উপযুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যেটা বজায় থাকবে। ফলে কোনো কিছুতে এটা বাধাগ্রস্ত হবে না।

স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে গত তিন বছরের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল বিদায়ী বছরেও। ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির এ চাকাকে আরো সচল করার চেষ্টা করছে সরকার। অর্থবছরটিতে ৭ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে ৮ শতাংশের মাইলফলক অর্জনের পথে রয়েছে দেশের অর্থনীতির এই মাপকাঠিটি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশ সরকার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ঠিক করেছে। অবশ্য বিশ^ব্যাংক ৭ শতাংশ জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তার ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক ২০১৮’ তে বলেছে, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকায় চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। আর জিডিপির আকার ২৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
বছরের মাঝামাঝিতে মূল্যস্ফিতি কিছুটা লাগামছাড়া হলেও বছর শেষে মূল্যস্ফীতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। গত অর্থবছর মূল্যস্ফীতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও পরে তা নেমে আসে। গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছর মূল্যস্ফীতি আরো স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শেষে গত নভেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি স্বস্তি দিয়েছে সাধারণ মানুষকে।

রেমিট্যান্সে নিম্নগতি
চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে ১১ মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৪২৬ কোটি ডলারের বেশি। যেখানে ২০১৭ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ৩৪৭ কোটি ডলারের কিছু বেশি। বিশ্বব্যাংকের অভিবাসন ও উন্নয়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে প্রায় ১৬০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে আসবে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এতে বাংলাদেশ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশ হিসেবে বিশ্বে নবম অবস্থানে থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিট্যান্স সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৬২৮ কোটি ৬৩ লাখ (৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন। গত বছরেরর জুলাই-নভেম্বর সময়ে বাংলাদেশে ৫৭৬ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। এই হিসেবে পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৯ শতাংশ।
সরকারের বেপরোয়া ব্যাংক ঋণ
আর্থিক সংকট মেটাতে সরকার আলোচিত বছর ব্যাংক থেকে বেপরোয়াভাবে ঋণ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে তিন হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা নতুন ঋণ নিয়েছে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময় ব্যাংক থেকে সরকার কোনো ঋণ নেয়নি। উল্টো আগের নেয়া ঋণের ৬ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল। এদিকে ১৯ ডিসেম্বর সরকার ট্রেজারি বন্ড ও বিল বিক্রি করে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৩০৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৬৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিয়েছে সরকার। এদিকে গত জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেয়া আগের ঋণ বাবদ এক হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। গত অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধ করেছিল এক হাজার ১১০ কোটি টাকা। ১৯ জুন নতুন করে ৬৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের অঙ্ক বেড়ে গেছে।

ব্যাংকিং খাতে গলার কাঁটা খেলাপি ঋণ
যথাযথ ডাউন পেমেন্ট ছাড়া ঋণ নবায়ন, ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও খেলাপি ঋণের উচ্চ হার কমছে না। বরং দিন দিন তা বেড়ে পাহাড় সমান হয়ে যাচ্ছে। দেশে প্রথমবারের মতো অবলোপন ছাড়াই গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মাত্র ৯ মাসে এ খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে মোট ঋণের ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে মন্দ ঋণই ৮২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৮৪ শতাংশ। মন্দ ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতের মুনাফার হার কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা।
যেখানে গত ২০১৭ সালে পুরো বছর খেলাপি ঋণ বাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এদিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য গত মাসে প্রভাব খাটিয়ে ছাড় গ্রহণের রেকর্ড করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। কতজন গ্রাহক কী পরিমাণ খেলাপি ঋণ নবায়ন করে নিয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনো জানা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড় সমান খেলাপি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলো। খেলাপি ঋণের এ পরিমাণ স্বাধীনতার পর এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ। অবলোপনসহ ঋণের পরিমাণ যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি দাঁড়াবে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
রিজার্ভে টান
রেমিট্যান্সের ধীরগতির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও টান পড়েছে। গত সপ্তাহে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২.০২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬ সালের পর রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নামেনি। সর্বশেষ ১৩ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১.৩৫ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ১৩৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। আমদানি বাড়ার কারণেও রিজার্ভে চাপ পড়েছে বলে মনে করেন অনেকেই। গত বছরের ২৮ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২.৫১ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের ৩০শে জুন শেষে তা বেড়ে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। ৩১ অক্টোবর তা কমে ৩২.০৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
রাজস্ব ঘাটতি
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নির্বাচনী বছর বিবেচনায় নিয়ে মূসক আইন বাস্তবায়ন করা হয়নি। কর আদায়ে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগে অনেকটাই বিরত রাজস্ব বোর্ড। এর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে রাজস্ব আয় বেড়েছে মাত্র ছয় শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় সাড়ে ২২ শতাংশ বেড়েছিল। দেখা গেছে, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস (জুলাই-আগস্ট) রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৫ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা। আর রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। এর আগের বছরে এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৮৭৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। খাত হিসেবে দুই মাসে কাস্টমসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা।
শেয়ারবাজার
শেয়ারবাজারে ২০১০ সালের বড় বিপর্যয়ের পর গত ৫ বছরে প্রণোদনার জোয়ার এসেছে। এরপরও অজ্ঞাত কারণে সংকট কাটছে না। বাজারে দুর্বল আইপিওর ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভ‚মিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। বছর শেষে পুঁজিবাজারের লেনদেনের পাশাপাশি সূচকও ছিল নি¤œগতিতে। ডিএসইর সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৩৫৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা। যা গত বছরের চেয়ে ৮৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা বা ৩৮.৪৩ শতাংশ কম।