ফিরমিনোর স্ত্রীকে চমকে দিলেন কুতিনহো

আগের সংবাদ

কোন অপশক্তি নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না : ওবায়দুল কাদের

পরের সংবাদ

যুদ্ধের মাঠ থেকে নাট্যমঞ্চে

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮ , ১২:২৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮, ১২:২৭ অপরাহ্ণ

Avatar

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। যুদ্ধের ময়দানে জীবন বাজি রেখে বীরদর্পে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, ছিলেন ঢাকার পাশেই সাভার এলাকার ক্যাম্প কমান্ডার। আর যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে জড়িয়ে পড়েছেন নাট্যচর্চায়। সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত শৈশব থেকেই। ছেলেবেলায় মীর মকসুদ-উস-সালেহীন এবং বজলুল করিমের ড্রামা সার্কেলের নাট্যতৎপরতা তার স্মৃতিপটে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। শৈশবের দূরন্তপনা এবং খেলাধুলার পর মাঝেমাঝেই ড্রামা সার্কেলের নাটকের মহড়া দেখতেন আর ভাবতেন এটা খুবই কঠিন কাজ এবং এর জন্য প্রচুর পড়াশোনা ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণের সূচনা লগ্নে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তখন তিনি হাই স্কুলের ছাত্র। এরপর ১৯৬৪ সালে শিক্ষা আন্দোলনেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। অধিকার সচেতন, প্রতিবাদী নাসির উদ্দিন ইউসুফ ১৯৬৭ সালে জগন্নাথ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হোন। এরপর ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন। ৭১-সালের ২৫ মার্চের পরপরই রওনা হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। বিজয়ীর বেশে যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরেই থিয়েটার চর্চায় জড়িয়ে পড়েন।
‘ঘুম নেই’ গ্রন্থে যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণ করে নাসির উদ্দিন ইউসুফ লিখেছেন, ‘ট্রেনিং শেষ, ঢাকায় যাচ্ছি। আমরা আখাউড়া-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেললাইনের একটা ছোট্ট কালভার্ট অতিক্রম করেছি। আর একটু এগোলে সাইদাবাদ পুল। …ওই ভয়াবহ স্থানটি পার হলে আমরা নিরাপদ। কিন্তু আমরা জানতাম না সেদিন দখলদার বাহিনী রাজাকারদের সরিয়ে নিজেরাই ব্রিজের দায়িত্ব নিয়েছে। যখন বুঝতে পারলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। অন্ধকার ভেদ করে প্রচণ্ড শব্দে শত্রুর স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান আর মর্টারের শেলে আমরা বিপর্যস্ত। …আমার নৌকার মাঝি ত্বরিৎ গতিতে নৌকা ঘুরিয়ে পিছে ফেলে আসা একটা মাটির চারের আড়ালে নৌকা নেয়ার জন্য দ্রুত বেয়ে যাচ্ছে। নৌকার চারদিকে পানিতে টুপটাপ গুলির শব্দ। আমি নৌকা থেকে দেখতে চাচ্ছি কোথায় আমাদের দলের অন্য নৌকাগুলো। মাঝি ততক্ষণে মাটির চারের কাছে নৌকা এনে বাঁক নিয়েছে। হঠাৎ সে আমাকে ধাক্কা মেরে শুইয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, শুইয়ে পড়েন। গায়ে গুলি লাগতে পারে। আমিও ওকে পাল্টা বলতে যাচ্ছি এমন সময় এক ঝাঁক গুলি ওকে উড়িয়ে নিয়ে পানিতে ফেলে দিল। আমি দেখলাম মাঝির শরীর পানিতে দাপাদাপি করছে। কিছুক্ষণ পর তাকে আর দেখা গেল না। সেই মাঝির নাম জানা হয়নি। কোনো দিন জানা হবে না। অথচ আমি বেঁচে আছি, সেই মাঝির জীবনের বিনিময়ে।’
মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ। এরপর নাসির উদ্দিন ইউসুফ যুক্ত হলেন সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাসির উদ্দিন ইউসুফ ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে এসে বন্ধু হিসেবে পেয়ে গেলেন সেলিম আল দীন, আবুল হাসান, হাশেম খান, নির্মলেন্দু গুণসহ আরো অনেক গুণী ব্যক্তিকে। ১৯৭২ সালে তৎকালীন ডাকসুর সংস্কৃতি সম্পাদক ম হামিদ এবং নাসির উদ্দিন ইউসুফ তৈরি করেন নাট্যচক্র নামের নাট্যদল। এরপর ১৯৭৩ সালের ২৯ জুলাই সেলিম আল দীনেসহ আরো কয়েকজন মিলে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ঢাকা থিয়েটার’। তারপর প্রায় ৪৫ বছর ধরে ঢাকা থিয়েটারের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা নাটক। গড়ে তুলেছেন গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন।
সেলিম আল দীন ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ জুটি বাংলা নাটককে করেছেন শেকড় সম্পৃক্ত। নাসির উদ্দিন ইউসুফের নির্দেশনায় মঞ্চে অভিনয় করে হাতেখড়ি হয়েছে হুমায়ূন ফরিদী, সুবর্ণা মুস্তাফা, আফজাল হোসেন, রাইসুল ইসলাম আসাদ, শিমূল ইউসুফ, শহিদুজ্জামান সেলিম, ফারুক আহমেদ, ফারজানা চুমকিসহ অসংখ্য অভিনয় শিল্পীদের। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ কেন্দ্রের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়াও তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দাম্পত্য সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন মঞ্চকুসুম শিমুল ইউসুফকে। এষা ইউসুফ তাদের একমাত্র সন্তান।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা