শুভ জন্মদিন হুমায়ূন আহমেদ!

আগের সংবাদ

চট্টগ্রামে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে বিএনপি

পরের সংবাদ

লেখালেখিটা আমার ধ্যান, আমার পূজা : শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ১৩, ২০১৮ , ১:১২ অপরাহ্ণ | আপডেট: নভেম্বর ১৩, ২০১৮, ১:১২ অপরাহ্ণ

বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সম্প্রতি ঘুরে গেলেন ঢাকা। বাংলা একাডেমি আয়োজিত ঢাকা লিট ফেস্টের অষ্টম আসরের সমাপনী দিনে তার সঙ্গে কথা হয় ভোরের কাগজের। বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন তিনি।
আপনি তো এই বাংলারই মানুষ? উত্তরে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, হ্যাঁ, আমি তো আপনাদেরই লোক। যদিও পিতৃভূমিতে কখনো যাওয়া হয়নি। তবে বিক্রমপুরে বানিখারা গ্রামটায় আমি একবার যাবই। ইচ্ছে আছে।
নিজের লেখক জীবন সম্পর্কে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, আমার লেখার কোনো ছক নেই। পরিকল্পনা নেই। আমার লেখার ধরন অদ্ভুত। লিখতে বসার আগ পর্যন্ত জানি না কী লিখব। তা ছাড়া আমি পাঠকের জন্য নয়, নিজের জন্যই লিখি। যতক্ষণ নিজে সন্তুষ্ট হতে পারি না ততক্ষণ স্বস্তি আসে না। নিজের লেখা পছন্দ না হওয়া পর্যন্ত আমি চেষ্টা করে যাই। আমার মধ্যে অন্যমনষ্কতা কাজ করে। অনেক সময় মনেও থাকে না আমি একজন লেখক।
লেখালেখিকে আপনি কিভাবে উপভোগ করেন? এর জবাবে তিনি বলেন, লেখালেখিটা আমার কাছে ধ্যান, আমার পূজা।
আপনার ‘দূরবীণ’ একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। এর নায়ক ধ্রুবকে চিত্রায়িত করেছেন কাপুরুষ হিসেবে। অথচ তাকে সবাই ভালোবাসে। এমনভাবে চিত্রায়ন কেন? এর উত্তরে তিনি বলেন,
প্রথম কথা হচ্ছে, দূরবীণ উপন্যাসটা জনপ্রিয় উপন্যাস হওয়ার কথা নয়। এটাকে বলতে পার দোতালার উপন্যাস। এর প্রতি অধ্যায়েই আমি পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে গেছি। আবার এগিয়েও এসেছি। প্রথম চ্যাপ্টার শুরু হলো পঞ্চাশ বছর আগে, আর দ্বিতীয়তে চলে এলাম আধুনিক যুগে। এই যে দোলাচল, এ জন্যই নামটা দিয়েছিলাম ‘দূরবীণ’। এক পিঠ দিয়ে দেখলে কাছে, অন্য পিঠ দিয়ে দেখলে দূরে। দূরবীণ যখন লিখছিলাম তখন অনেক দূর লেখার পর বুঝতে পারছিলাম এটি কেউ পড়বে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে দুই বাংলাতেই উপন্যাসটার ভালোই পাঠক আছে। অনেকেই দূরবীণের রেফারেন্স দেয়। আমার কাছে খুব অবাক লাগে যে, ধ্রুবর মতো একটি চরিত্রকে যখন পাঠকরা ভালোবাসে।
লেখক হিসেবে আকাশ ছোঁয়া সাফল্য পেয়েছেন এটা নিয়ে বিস্ময় জাগে কিনা জানতে চাইলে শীর্ষেন্দু বলেন, হ্যাঁ অবশ্যই বিস্ময় জাগে। এই যে বেঁচে আছি, এটাও আমার কাছে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। জীবন আমার কাছে কখনই একঘেয়ে নয়। সুতরাং, আমার চারিপাশে বিস্ময়ের অন্ত নেই। এসব কুড়িয়ে এনে আমি লেখার জন্য সঞ্চয় করি। জীবন আমার কাছে একটি বিস্ময় বলেই মনে হয়। একঘেয়ে নয়।
লেখালেখির বাইরে মনের আনন্দের জন্য কি করেন? টিভি দেখা হয় আপনার?
শীর্ষেন্দু বলেন, টিভি দেখি। খুব দেখি। কাজের প্রয়োজনেও দেখতে হয়, তাই একটু অবসর পেলেই আমি টিভি দেখি। কার্টুন দেখি। বেশিই দেখি কার্টুন ছবি এবং সিরিয়াল।
মানে? হেসে বললেন, হ্যাঁ কার্টুন দেখি। ‘টম এন্ড জেরি’ আমার খুব পছন্দের কার্টুন। এ ছাড়া কাজের প্রয়োজনেই কার্টুন ছাড়া বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল দেখতে হয়।
লেখালেখির শুরুটা জানতে চাইলে শীর্ষেন্দু বলেন, বিষয়টি আমার বহু সাক্ষাৎকারেই উল্লেখ করেছি। ছোটবেলা থেকেই পড়ার পোকা ছিলাম। হাতের কাছে যা পেতাম, তাই পড়তাম। খুব ছোটবেলাতেই রবীন্দ্রনাথ, শরৎ, বিভ‚তি, মানিক, তারাশঙ্কর পড়া শেষ করে ফেলি। যাকে বলে অকালপক্ব। ওই লেখা পড়তে পড়তে কখন যে নিজের ভেতর লেখালেখির এক ধরনের টান অনুভব করতাম। সেই থেকেই শুরু।
এটাকে কিভাবে এনজয় করেন বা কোন সময়টায় লিখতে বসেন? এর জবাবে শীর্ষেন্দু বলেন, লেখাটা সব সময়ই চলতে থাকে ভেতরে ভেতরে, জমাট বাঁধতে থাকে সারা দিন। তবে রাতেই লেখার জন্য বেছে নিয়েছি। ওই সময়টায় লিখতে ভালো লাগে। এনজয় করি।
আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন। বিজ্ঞানের এই যুগে ভূতপ্রেত বলে সত্যিই কিছু আছে বলে মনে করেন? এর জবাবে শীর্ষেন্দু বললেন, হ্যাঁ, ভূত আছে। এটা আমি বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাসের পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। কারণটা হচ্ছে, আমি নিজের চোখে ভূত দেখেছি। না, এটা দৃষ্টিভ্রম কিম্বা হ্যালুসিনেশনও নয়। এ বিষয়টি আমি বহু জায়গায় বলেছি। আজও বলছি, আমার কথাটা কেউ বিশ্বাস করলে করুক, বা না-ই করুক। আমি ঈশ্বর যেমন মানি, তেমনি ভূতও মানি।
তরুণ লেখকদের লেখা পড়া হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ পড়া হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই ভালো লিখছে। দুই বাংলায়ই। তবে আরো পরিশ্রম করতে হবে। আরো গভীরে যেতে হবে। আধুনিক লেখার নামে যা কিছু লিখলে সময় তাকে ধারণ করবে না। সময় বড় নিষ্ঠুর। সবাইকে সে আশ্রয় দিতে চায় না। সবকিছুর জন্য অধ্যবসায় চাই। লিখতে হলে পড়তে হবে অনেক। কারো লেখা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিজের স্টাইলটা নিজেরই তৈরি করতে হবে। নিজের স্বতন্ত্র প্রতিভাতেই টিকে থাকতে হবে।
শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ উপন্যাসে লজিকের অভাব আছে বলেছেন। কেন? শীর্ষেন্দু বলেন, হ্যাঁ শরৎচন্দ্রের দেবদাস উপন্যাসে লজিকের খুব অভাব। তিনি খুব অল্প বয়সে লিখেছিলেন। ওই বয়সে বুদ্ধি পাকে না। সে জন্য লেখায় গ্যাপ রয়েছে। তবে গল্প বলার সময় শরৎচন্দ্রের মতো ম্যাজিশিয়ান বাংলা সাহিত্যে আর দ্বিতীয়টি নেই। তার মতো লেখক গত একশ বছরেও আমরা পাইনি।
জীবনে কখনো কোনো সংকটময় মুহূর্ত এসেছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে বরেণ্য এই কথার জাদুকর বলেন, প্রতিটি মানুষেরই জীবনে কোনো না কোনো সংকটময় সময় পার করতে হয়। আমিও করেছি। ওই সময়টার কথা আমার অনেক লেখায় প্রকাশও করেছি। টানাপড়েনে নিজের জীবনের প্রতিই মায়া চলে যায় এক সময়। তখন এক বন্ধুর সহায়তায় ঠাকুর অনুক‚ল চন্দ্রের সান্নিধ্য পাই। ঠাকুরের অমিয় বাণী আমার জীবনে বাঁচার আশা জাগিয়েছে। ঠাকুরকে আশ্রয় করার পর থেকে আমার জীবনের ধাঁচটাই পাল্টে গেছে। আমি আর জীবনকে একঘেয়ে মনে করি না।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা