বাড়তি দাম, যাত্রী হয়রানি বন্ধ করুন

আগের সংবাদ

গুজব নির্মূলে প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি

পরের সংবাদ

প্রসঙ্গ : প্রায়োগিক, কারিগরি ও বাস্তবসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৯, ২০১৮ , ৮:১৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ৯, ২০১৮, ৮:১৫ অপরাহ্ণ

Avatar

আমাদের এই ভূখণ্ড অন্যান্য উন্নত দেশের আয়তনের তুলনায় খুবই ছোট একটি রাষ্ট্র। কিন্তু জনসংখ্যায় অনেক বেশি। এই ছোট একটি দেশে যদি নানামুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকে তাহলে এখানে অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন মন-মানসিকতার মানুষ তৈরি হবে এটাই তো স্বাভাবিক। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা- সরকারি, বেসরকারি, কিন্ডারগার্টেন, মসজিদ ও মাদ্রাসাভিত্তিক শিশু শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব প্রতিটি বিভাগে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা প্রদান কৌশল। যার ফলে ছোট থেকেই শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন মন-মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠছে।

একটি দেশ, একটি জাতির অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষা। এই বিচেনায় বলা হয়, ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’। অর্থাৎ একজন মানুষ যেমনি মেরুদণ্ড সোজা করে স্থির দাঁড়াতে পারেন, ঠিক তেমনি একটি জাতির ভিত্তিমূল, উন্নয়ন, অগ্রগতি, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া নির্ভর করে শিক্ষার ওপর। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত, সভ্য, অগ্রসর। শিক্ষা অর্জন মানুষের জন্মগত এবং মৌলিক অধিকারও বটে। আমাদের সংবিধানে মানুষের মৌলিক যে পাঁচটি অধিকারের কথা বলা আছে তাতেও শিক্ষাতে স্থান দেয়া হয়েছে। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সার্বজনীন, অপরিহার্য, ব্যাপক ও বিস্তৃততর। একজন মানুষকে প্রকৃত মানবিক গুণাবলী, সামাজিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার বিকল্প নেই।

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সম্পদের সুষম ব্যবহারের জন্য শিক্ষা অপরিহার্য। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা সেই বিবেচনায় কতটুকু ভ‚মিকা রাখছে বা রাখতে পারছে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। বিশেষ করে সৃজনশীলের নামে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অযথা বই, গাইড বই, নোট বই, তথাকথিত সাজেশন বইয়ের ভারে ভারাক্রান্ত করে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি কোচিং, প্রাইভেট পড়ার জন্য প্রলুব্ধ আবার কখনো কখনো বাধ্য করা হচ্ছে। এতে জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধারদের মেরুদণ্ডকে সোজা রাখার পরিবর্তে বাঁকিয়ে দিচ্ছে। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে এই তরুণ প্রজন্মের মেরুদণ্ড হয়তো ভেঙে যাবে না, কিন্তু মচকাবে। এতে বাস্তবিক অর্থে জাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতিকে এই বিপদের হাত থেকে, বিশেষ করে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ দিয়ে তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হলে সম্ভাবনাময় এসব তরুণ প্রজন্মই একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। আর সে জন্য বিরাজমান সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে হাতে কলমে শিক্ষাদান, পাশাপাশি মানবিক গুণাবলী অর্জিত হয় এমন শিক্ষাদানের প্রতি মনোনিবেশ করা দরকার।

এটা বলা সঙ্গত হবে যে, এখনো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ঔপনিবেশিক ধাঁচের। কিছু কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষায় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিকুলাম সংশোধন করা হলেও তা যথেষ্ট নয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে তারা তাদের স্বার্থসিদ্ধির অনুক‚ল করে শিক্ষাব্যবস্থার বিন্যাস করেছিল। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের এত বছরেও শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন গঠন হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তাই বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা হতাশার আর সৃজনশীলের নামে ‘কোমলমতি শিক্ষার্থী’দের ‘গিনিপিগ’ খেলায় হতাশ এসব শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবক। এ নিয়ে প্রায়শই তাদের ক্ষোভ-অসন্তোষ, হতাশার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত মানসিকতা সম্পন্ন জাতি গঠনে সক্ষম নয়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী হয়তো শিক্ষার হার বাড়ছে, কিন্তু সেবাধর্মী, মানবিক এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের তাল মিলিয়ে চলার মতো উপযোগী হচ্ছে না তারা। এ দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভৃতি কারণে শিক্ষাব্যবস্থা প্রত্যাশিত মান অর্জন করতে পারেনি।

আমাদের এই ভূখণ্ড অন্যান্য উন্নত দেশের আয়তনের তুলনায় খুবই ছোট একটি রাষ্ট্র। কিন্তু জনসংখ্যায় অনেক বেশি। এই ছোট একটি দেশে যদি নানামুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকে তাহলে এখানে অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন মন-মানসিকতার মানুষ তৈরি হবে এটাই তো স্বাভাবিক। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা- সরকারি, বেসরকারি, কিন্ডারগার্টেন, মসজিদ ও মাদ্রাসাভিত্তিক শিশু শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব প্রতিটি বিভাগে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা প্রদান কৌশল। যার ফলে ছোট থেকেই শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন মন-মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠছে।

এখানে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠদানের ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বাচাই করা মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঠদান করে থাকেন এবং যাদের অভিভাবকরাও যথেষ্ট সচেতন সেখানে কর্মরত শিক্ষকদের প্রচেষ্টা না থাকলেও শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করে থাকে। আবার গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থা, আর শহরের শিক্ষাব্যবস্থায়ও রয়েছে ব্যাপক ফারাক। প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন, নানা অভিযোগ। এ ছাড়া মাদ্রাসা ও ইংলিশ মিডিয়াম বিদ্যালয়সমূহে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থাকে অনুপস্থিত। মূলত এভাবেই সমাজে, শিক্ষায় বৈষম্য ও বিভেদের দেয়াল তৈরি হয়। এরই মধ্যে আবার রয়েছে প্রতি বছর পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন, সিলেবাসের পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন যার ফলে একেক বছরের শিক্ষার্থীর সঙ্গে অন্য বছরের শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক বৈপরীত্য, অসামঞ্জ্যসতা সৃষ্টি হয়। এই বৈপরীত্য আর অসামঞ্জস্যতা নিয়েই প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আসে হাজারো শিক্ষার্থী।

অর্জিত শিক্ষা দিয়ে পরবর্তীতে কর্মজীবনে যদি সঠিকভাবে দেশ, সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখতে ব্যর্থ হয় তা হলে সেই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে। দ্রুতই ভাবতে হবে প্রায়োগিক, কারিগরি ও বাস্তবসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। তবেই দেশ জাতির মঙ্গল।

ফারিহা হোসেন : লেখক।