উত্তরাঞ্চলে দ্রুতগতিতে বাড়ছে নদ-নদীর পানি

আগের সংবাদ

আজ পারবে তো ইংল্যান্ড?

পরের সংবাদ

যে কারণে আস্থা নেই দেশের স্বাস্থ্যসেবায়

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০১৮ , ১২:৫২ অপরাহ্ণ আপডেট: জুলাই ৭, ২০১৮ , ১২:৫২ অপরাহ্ণ

বহির্বিশ্বে প্রশংসিত হলেও দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারছে না বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা। দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এই আস্থার সংকট তৈরি করেছে। শুধু তাই নয়, সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক বেশি। আর এসব কারণেই চিকিৎসার জন্য অনেকে ছুটছেন বিদেশে। রোগী এবং স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের অভিযোগ, দেশে চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মানসিকতাই বেশি। যারা স্বাস্থ্যসেবা দেন তাদের বেশির ভাগেরই আচরণ ভালো নয়। চিকিৎসক রোগীর কথা না শুনে আগেই প্রেসক্রিপশন লিখে ফেলেন। তাছাড়া ভুল চিকিৎসা ও ডায়াগনসিসের অভিযোগও রয়েছে।
২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুরে শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে হাসপাতাল উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের মাটিতেই চিকিৎসা নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রæয়ারি তিনি ওই হাসপাতালেই নিজের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করান। যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি তার আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিত্তবানরা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। যা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ও ডাক্তারের প্রতি তাদের অনাস্থার প্রমাণ দেয়।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের চেয়েও ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে ক্যান্সার, কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় আমরা এখনো কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। সে কারণে দেশ থেকে রোগীরা বিদেশে চলে যাচ্ছে। প্রতিবছর ১০ লাখ রোগী দেশের বাইরে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো নীতিমালা এবং কৌশল নির্ধারণ করা নেই। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে বিদেশগামীদের বিষয়ে কোনো তথ্যও সংরক্ষণ করা নেই।

এদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেটের এক গবেষণা জরিপ প্রকাশিত হয় চলতি বছরের মে মাসে। এতে বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবার মানের দিক দিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে। সারা বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার মান ও সহজপ্রাপ্যতার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম এবং ভারতের অবস্থান ১৪৫। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩৯তম ও ভারতের অবস্থান ছিল ১৫৪। গবেষণায় দেখা গেছে, সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষ চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন দেশে যায়। তবে বেশি যাচ্ছে ভারতে। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায়ও যাচ্ছে। ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশটিতে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা প্রতি তিনজনের একজন বাংলাদেশি।

স্বাস্থ্যসেবা রপ্তানি নিয়ে ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব কমার্শিয়াল ইন্টেলিজেন্স এন্ড স্ট্যাটিস্টিকসের (ডিজিসিআইঅ্যান্ডএস) সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভারতে চিকিৎসা গ্রহণকারী বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ছিল বাংলাদেশি। ওই অর্থবছর ভারত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের এক লাখ ৪১ হাজার ২৮৭টি মেডিকেল ভিসা দেয়। এর মধ্যে ৫৮ হাজার ৩৬০টি ভিসা নিয়েছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। অর্থবছরটিতে ভারতে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার জন বিদেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই গেছে এক লাখ ৬৪ হাজার ৪৭০ হাজার জন। ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ১৯৯৭-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় বাংলাদেশে। এ খাতের যে খরচ হয় তার ৬৭ শতাংশই ব্যক্তির নিজ পকেট থেকে খরচ করতে হয়। বাকি ২৩ শতাংশ বহন করে সরকার।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ভোরের কাগজকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অগ্রগতি আছে কিন্তু আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। দেশের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বেড়েছে। অর্থ খরচ করে হলেও মানুষ এখন ভালো সেবা নিতে চায়। অনেক সময় সেকেন্ড ওপিনিয়নের জন্যও মানুষ বিদেশ যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের আহŸায়ক অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ স্বাস্থ্য খাতকে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলেছে। তারা ‘হেলথ ট্যুরিজম’ শব্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে টুরিস্ট ভিসায় গিয়েও চিকিৎসা করান। আমাদের চিকিৎসকদের দক্ষতার অভাবের পাশাপাশি ব্যবহারও অনেক ক্ষেত্রে রোগীবান্ধব নয়। এসব কারণেই মূলত বেশি সংখ্যক রোগী দেশের বাইরে পাড়ি জমাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, রোগ নির্ণয়ে নির্র্ভুল পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দেশে ডায়াগনস্টিক টেস্টের মান ভালো না হওয়ায় অনেক সময় চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থ হন। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ভারতে যাতায়াতের সুবিধা, থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা খরচ অনেকাংশে কম এবং ভিসা প্রাপ্তির সহজলভ্যতা, ভাষাগত সুবিধার কারণেও বাংলাদেশের মানুষ ভারতে বেশি যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়