আজ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন ৩ নোবেল জয়ী নারী

আগের সংবাদ

পুঠিয়ায় তিন অভিযুক্ত জেএমবি সদস্য আটক

পরের সংবাদ

মামলার তদন্ত শেষ হয় না

হত্যাকাণ্ড ধামাচাপায় ট্রেনে কাটার নাটক

প্রকাশিত হয়েছে: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৮ , ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৮, ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনের হোম সিগনাল এলাকা। শত শত পথচারী প্রতিদিনই ওই সিগনাল দিয়ে পারাপার হয়। ২০১৬ সালের ১২ জুনের দুপুরটি ছিল অনেকটা নিরিবিলি। ছিল না পথচারীদের ভিড়, ছিল না কোনো লাইনম্যান। এরই মধ্যে বেজে ওঠে ট্রেনের সাইরেন। কিছুক্ষণ পর সেটি অতিক্রম করে চলে যায় সিগনাল এলাকা। এরপর কয়েক জন পথচারী দেখতে পান ট্রেনের নিচে পড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া এক যুবকের বিভৎস লাশ।

এরপর পুলিশ পরিচয়হীন লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে পাঠায়। পুলিশ বাদি হয়ে ঢাকা রেলওয়ে থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে। এরপর দীর্ঘদিন লাশটি ঢামেক মর্গের হিমঘরেই ছিল। আর সবার মতো পুলিশও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে নিশ্চিত হয় এটি অস্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বাধায় বিপত্তি। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে চিকিৎসক উল্লেখ করেন এটি হত্যাকাণ্ড। টনক নড়ে পুলিশের। চিকিৎসকের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে গত বছরের ৮ মার্চ অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলায় রূপাান্তর করা হয়। এরই মধ্যে পরিচয়ও মিলে নিহত ওই যুবকের। নাম তানজিল হাসান মুন্না (১৯)। বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানার পশ্চিম ভাতশালা এলাকার লাল মিয়ার ছেলে। থাকতেন নয়নপুর ক্যান্টনমেন্ট বাজার এলাকায়। পড়তেন রাজধানীর তেজগাঁও কলেজে।

পুলিশ পরিবারের সঙ্গে কথা বলে মুন্নার ২ বন্ধুকে আটক করে। কিন্তু কোনো সংশ্লিষ্টতা না পেয়ে তাদের ছেড়ে দেয়। চিকিৎসকের রিপোর্ট আমলে নিয়ে হত্যা মামলা করলেও পুলিশের বিশ্বাস এটি অস্বাভাবিক মৃত্যু। তাই এটির তদন্ত আর এগোইনি। দেয়া হয়নি চার্জশিটও। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলী আকবর ভোরের কাগজকে বলেন, প্রত্যক্ষদর্শী বলছে এটি দুর্ঘটনা কিন্তু চিকিৎসক বলছেন হত্যাকাণ্ড। এর মধ্যে অনেক কাহিনী আছে।

শুধু মুন্না নয় একই ধরনের ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সকালে। মহাখালী সৈনিক ক্লাব রেলগেট সংলগ্ন এলাকা থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের (৩০) এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঢাকা রেলওয়ে থানায় করা হয় অপমৃত্যু মামলা। কিন্তু এ ঘটনায়ও ময়নাতদন্ত রিপোর্টে আসে হত্যাকাণ্ড। অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলায় স্থানান্তর করা হয়। তবে এগোইনি তদন্ত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল ভোরের কাগজকে বলেন, ময়নাতদন্তের ওপর ভিত্তি করে মামলাটি প্রায় দেড় বছর পর হত্যা মামলায় রূপান্তর হওয়ায় তদন্তে সমস্যা হচ্ছে। তার পরও নিহতের পরিচয় শনাক্তের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। পরিচয় শনাক্তের পর বিষয়টি আরো তদন্ত করে দেখা হবে।

এ ঘটনা দুটির ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ফরেনসিক বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক ডা. আ খ ম শফিউজ্জামান ভোরের কাগজকে জানান, আলামত পেয়েছি বলে হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছি। আর হত্যার পরে ট্রেনের নিচে ফেলবে এটি অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এখন তদন্তের ব্যাপার পুলিশের।

এদিকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহতের সংখ্যা। এদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা আবার অজ্ঞাত থেকে যায়। এদের ক্ষেত্রে অপমৃত্যু মামলা হলে সেটির আর কোনো তদন্ত হয় না। মর্গে পাঠিয়েই নিশ্চুপ হয়ে যায় থানা-পুলিশ। মর্গ কর্তৃপক্ষও যখন দেখে পরিচয় মিলছে না তখন বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমানে হস্তান্তর করছে। পুলিশ তদন্ত করে যদি অজ্ঞাত লোকদের পরিচয় শনাক্ত করা যেত, তাহলে তার পরিবার অন্তত লাশটি পেয়ে স্বজন হারানোর বেদনায় কিছুটা হলেও সান্ত¡না খুঁজে পেত।

অপরদিকে একই সিগনাল এলাকা দিয়ে দিনের পর দিন সাধারণ মানুষ কাটা পড়ে মারা গেলেও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয় না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অথচ ওই সিগনালগুলোতে সচেতনতামূলক ব্যানার ও লাইনম্যান নিয়োগ দিলে বেঁচে যাবে অকালে ঝড়ে পড়া অনেক প্রাণ।

সূত্র জানায়, ট্রেনের নিচে পড়লে লাশ বিভৎস হয়ে যাওয়ায় ধরে নেয়া হয় কাটা পরেই মৃত্যু হয়েছে। অথচ অনেক সময় হত্যার পর নাটক সাজাতে ফেলে দেয়া হয় ট্রেনের নিচে। এ মামলাগুলোর যথার্থ তদন্ত হলে বেরিয়ে আসবে পর্দার আড়ালে থাকা খুনিরা। ন্যায়বিচার পাবে পরিবার। আর তা না হলে খুনিরা খুন করে পার পেতে বেছে নিবে ট্রেনে কাটা নামক ভয়াবহ নাটকের। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রত্যেকটি ঘটনারই যথোপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, যারা ট্রেনে কাটা পড়ে যারা মারা যান তারা স্বনামধন্য ব্যক্তি না হওয়ায় মিডিয়ায় ভালোভাবে আসে না। ফলে ঘটনাগুলো গুরুপ্ত পায় না। তবে ময়নাতদন্ত রিপোর্টে যদি সেটি হত্যাকাণ্ড হয় তাহলে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এ ধরনের ভিকটিম কম হলেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করতে অবশ্যই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। না হলে এ অপরাধীরা এ ধরনের পন্থা বেছে নিতে পারে।

ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াছিন ফারুক মজুমদার ভোরের কাগজকে বলেন, ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মৃত্যুর পর হত্যা মামলা হয়। আমরা ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করি। অজ্ঞাত লাশের ক্ষেত্রে মেডিকেলে বুঝিয়ে দেয়া হয়। ট্রেনে কাটা পড়ার বিষয়ে ওসি বলেন, এর জন্য মূলত দায়ী অসচেতনতা। এ ছাড়া অবৈধ স্থাপনার কারণে ট্রেন না দেখতে পেয়ে ও হেডফোন ব্যবহারে মৃত্যু হয় বেশি। এটি রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমরা বিভিন্ন লিফলেট বিতরণ করছি। প্রতি স্টেশনে ব্যানার টানানো হয়েছে।

রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ আবুল কাশেম ভোরের কাগজকে বলেন, মানুষ নির্দিষ্ট ক্রসিং ব্যবহার না করায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক সময় কাটা পড়া লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে আসে এটি হত্যাকাণ্ড। সে ঘটনাগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করি।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা