সেরা ৪০ সুন্দরীদের তালিকায় জেসিয়া

আগের সংবাদ

পড়াশোনাতেও তুখোড় এই নায়িকারা

পরের সংবাদ

স্পর্শের অপেক্ষায় গল্পের রত্নভান্ডার

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ১২, ২০১৭ , ১:৩১ অপরাহ্ণ

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্মেছিলেন কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তার গল্পের জাদু শুধু পাঠক সমাজেই আটকে থাকেনি। সেলুলয়েডেও তার গল্প মুগ্ধতা ছড়িয়েছে পূর্ণ মাত্রায়। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের সিনেমাযাত্রা ও গল্পের সম্ভাবনার কথা লিখছেন এম রহমান

ঢাকাই সিনেমায় গল্পের সংকটের কথা প্রায়ই শোনা যায়। ভালো গল্পের অভাবে একের পর এক ছবি মার খাচ্ছে। ব্যবসায় ধস নেমেছে। তারকারা প্রভাব হারাচ্ছেন। নির্মাতারা বেকারত্ব বরণ করছেন। প্রযোজক ভেগে যাচ্ছেন। চারদিকে হাহাকার। ভারতীয়-বিদেশি ভাষার ছবির গল্প ধার করে বাজার চাঙ্গা হচ্ছে না। যারা চুরিবিদ্যার সঙ্গে জড়িত, তারা নিজেদের ভাবমূর্তি খোয়াচ্ছেন। অথচ গল্পের এই আকালে আলোকবর্তিকা হতে পারেন হুমায়ূন আহমেদ।
হুমায়ূন আহমেদ দেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বলেই নয়, তার লেখা গল্প সিনেমায় পরীক্ষিত বলেই তার নাম বিভিন্ন আসরে উঠে আসে। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তার আত্মপ্রকাশের আগেই হুমায়ূন আহমেদের গল্প থেকে ছবি নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ১৯৯২ সালে তার গল্প থেকে নির্মাণ করে ‘শঙ্খনীল কারাগার’। মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত ছবিটির গল্প হুমায়ূন আহমেদের একই নামের নন্দিত উপন্যাসের গল্প অবলম্বনে নির্মিত। ছবিটি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয় করে প্রশংসিত হয়। যার মধ্যে রয়েছে শ্রেষ্ঠ কাহিনীকারের পুরস্কারও। উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন, হুমায়ূন আহমেদই পুরস্কারটি পেয়েছিলেন।
১৯৯৪ সালে হুমায়ূন আহমেদ নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হোন। ওই বছর তার পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তি পায়। এখান থেকেই তার গল্পের দর্শকচিত্ত বিজয় শুরু। এরপর ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ (২০০০), ‘দুই দুয়ারী’ (২০০১), ‘চন্দ্রকথা’ (২০০৩), ‘শ্যামলছায়া‘ (২০০৪), ‘আমার আছে জল’ (২০০৮) ইত্যাদি ছবি পরিচালনা করে মধ্যবিত্ত রুচিশীল দর্শকদের সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনেন হুমায়ূন আহমেদ।
হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত ছবিগুলোতে ছিল গল্পের বৈচিত্র্য। দেশের সেরা কথাসাহিত্যিক তার গল্পের বুননে বুঁদ করে রেখেছিলেন হলবিমুখ দর্শকদের। যারা তার বই পড়তেন না, তারাও ছিলেন তার ছবির দর্শক। গল্পের গাঁথুনিতে দর্শকদের হৃদয়ে সুতীব্র আনন্দ ও বেদনার রেখাপাত করতেন হুমায়ূন আহমেদ। তার ছবির গল্পের আলোচনা চলত বছরব্যাপী। দর্শকরা অপেক্ষায় থাকতেন তার পরের ছবির জন্য।
এক সময় তার গল্পের অমূল্য রত্নভান্ডারে নজর পড়ে নির্মাতাদের। হুমায়ূন আহমেদ ১৯৯৩ সালে সুভাষ দত্তের ‘আবদার’ ছবির গল্প লেখার পর আর সিনেমার কাহিনী রচনার অবকাশ পাননি। হয়তো ইচ্ছে করেই আর ও পথ মাড়াননি। টেলিভিশনে অন্যের পরিচালনায় নিজের গল্প দিলেও কোনো চিত্রপরিচালককে গল্প দিতেন না হুমায়ূন আহমেদ। বাধ্য হয়েই তার পুরনো গল্পের দিকে ঝুঁকে পড়েন চিত্রনির্মাতারা।
আবু সাইয়ীদ ২০০৬ সালে হুমায়ূন আহমেদের গল্প থেকে নির্মাণ করেন ‘নিরন্তর’। ইলিয়াস কাঞ্চন ও শাবনূর ছিলেন মুখ্য চরিত্রে। ছবিটি প্রশংসা পায়। প্রশংসা পায় একই বছর নির্মিত বেলাল আহমেদ পরিচালিত ‘নন্দিত নরকে’। ফেরদৌস ও সুমনা সোমা ছিলেন মুখ্য চরিত্রে। মোরশেদুল ইসলাম হুমায়ূন আহমেদের গল্প থেকে শিশুদের জন্য ছবি ‘দূরত্ব’ পরিচালনা করেন। পরের বছরও হুমায়ূন আহমেদের গল্প থেকে আরো দুটি ছবি নির্মিত হয়।
২০০৭ সালে শাহ আলম কিরণ নির্মাণ করেন ‘সাজঘর’। মান্না, মৌসুমী ও নিপুণ ছিলেন মূল চরিত্রগুলোতে। নিপুণের ঘরে আসে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তৌকির আহমেদ নির্মাণ করেন ‘দারুচিনি দ্বীপ’। চ্যানেল আইয়ের রিয়েলিটি শো থেকে আগত নায়িকা মম জাতীয় পুরস্কার পেয়ে যান এ ছবির জন্য। ছবিটিও একাধিক বিভাগে জাতীয় পুরস্কার জয় করে। চিত্রনাট্যকার হিসেবে হুমায়ূন আহমেদও বাদ যাননি।
মোরশেদুল ইসলাম হুমায়ূন আহমেদের গল্প থেকে সবচেয়ে বেশি ছবি নির্মাণ করেছেন। ২০০৬ সালে শিশুদের জন্য ছবি ‘দূরত্ব’ পরিচালনা করেন মোরশেদুল ইসলাম। ২০০৯ সালে পরিচালনা করেন ‘প্রিয়তমেষু’। এমনকি হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তার গল্প থেকেও মোরশেদুল ইসলাম ছবি নির্মাণ করেন। ২০১৫ সালে তিনি নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ছবি ‘অনিল বাগচির একদিন’।
হুমায়ূন আহমেদের গল্প নিয়ে চিত্রনাট্যের কথা বলতে গেলে বিশেষভাবে বলতে হয় তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের কথা। হুমায়ূন আহমেদের জীবদ্দশায় তার গল্প থেকে নাটক-টেলিফিল্ম নির্মাণ করেছেন শাওন। লেখকের মৃত্যুর পর শাওন আস্ত একটি ছবি নির্মাণ করলেন গত বছর। ‘কৃষ্ণপক্ষ’ উপন্যাসটি রুচিশীল দর্শকদের কাছে একেবারে বাজে কদর পায়নি। এ ছবির দর্শক সাড়ায় মুগ্ধ হয়েই শাওন ‘নক্ষত্রের রাত’ উপন্যাসটি রুপালি পর্দায় আনার পরিকল্পনা করছেন এখন। মাহিয়া মাহি পর পর দুবার তার ছবির নায়িকা হতে যাচ্ছেন।
অভিনেত্রী জয়া আহসানও হাঁটছেন শাওনের পথ ধরে। তিনি তার প্রথম প্রযোজনায় নির্মাণাধীন ছবি ‘দেবী’র গল্প নিয়েছেন মিসির আলী সংক্রান্ত উপন্যাস ‘দেবী’ থেকে। ‘আয়নাবাজি’র অন্যতম রচয়িতা অনম বিশ্বাস ‘দেবী’র পরিচালক। ‘আয়নাবাজি’র অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী অভিনয় করছেন মিসির আলীর চরিত্রে। অনেকেরই ধারণা ‘দেবী’ প্রশংসিত ও সফল হলে হুমায়ূন আহমেদের গল্পের দিকে চোখ পড়বে নির্মাতাদের।
হুমায়ূন আহমেদের গল্প থেকে যারাই ছবি নির্মাণ করেছেন তারাই আলোচনায় এসেছেন। কেউ কেউ প্রশংসিত হয়েছেন। কমবেশি সাফল্যও উপভোগ করেছেন। তারপরও কলম জাদুকরের গল্প থেকে যে পরিমাণ ছবি নির্মাণ হওয়ার কথা তা হচ্ছে না বলে চিত্রজগতের অনেকেরই আফসোস রয়েছে। সিনেমার হাওয়া বদলের এই সময়ে, গল্পের সংকটের এই দুঃসময়ে হুমায়ূন আহমেদের গল্প হতে পারে নির্মাতাদের আশ্রয়স্থল।
হুমায়ূন আহমেদের গল্পের বিশাল রত্নভান্ডার থেকে কুড়িয়ে তোলা কাহিনী-বৈচিত্র্যে ঘুরে যেতে পারে ঢাকাই সিনেমার মোড়। তার লেখা শত শত গল্প-উপন্যাস থেকে তৈরি হতে পারে আকর্ষণীয় বহু ছবি। এমনটাই মনে করেন সিনেমা সংশ্লিষ্টরা।