ডেসটিনির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ

আগের সংবাদ

বাসযোগ্য নগর : সমস্যা ও করণীয়

পরের সংবাদ

স্বাস্থ্যসেবায় মানবিক হতে হবে

ড. মিহির কুমার রায়

কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০১৭ , ৬:৫০ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৩১, ২০১৭ , ৬:৫১ অপরাহ্ণ

চিকিৎসকদের নৈতিকতা বা মানবিকতা যাচাইয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ দেশে আছে বলে মনে হয় না, যা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে রয়েছে। ফলে চিকিৎসা পেশা এক অনৈতিক অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। প্রতিনিয়তই যার বলি হচ্ছে রোগীরা এবং প্রতারিত হচ্ছে গোটা সমাজ। এর একটি স্থায়ী সমাধান জরুরি।

বিগত ২৫ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে ৭১ টেলিভিশন চ্যানেলে মাঝ রাতের একটি টকশো হচ্ছিল। সেখানে আলোচিত অনেক বিষয়ের মধ্যে দুটি বিষয় আমার মনে দাগ কেটেছে- (১) গত সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরে এক বেসরকারি হাসপাতালের রোগিণীর বাচ্চা প্রসবের ঘটনা; (২) টেকনাফে ৭ ডিবি পুলিশ কর্তৃক এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ ধৃত। প্রথমটির বিবরণে প্রকাশ- এক রোগিণী বাচ্চা প্রসবের নিমিত্তে এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং চিকিৎসক নির্ধারিত তারিখে রোগিণীর অপারেশন সম্পন্ন করে একটি বাচ্চা প্রসব করিয়ে রোগিণীকে যথারীতি অব্যাহতি দিয়ে দেন। কিন্তু রোগিণী পেটে গোলাকার বৃত্তাকার একটা কিছুর অনুভব হলে রোগিণী আবার সেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তিনি টিউমার শনাক্ত করে রোগিণীকে বিদায় করে দেন। কিন্তু রোগিণী ক্রমাগতভাবে অসুস্থ হয়ে উঠলে প্রায় এক মাস পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ভর্তি করা হয়। সেই হাসপাতালের চিকিৎসক পরীক্ষা করে রোগিণীর পেটে আরো একটি বাচ্চার অস্তিত্ব খুঁজে পান। এরই মধ্যে বাচ্চাটির মৃত্যু হয় এবং সে অবস্থাতেই অস্ত্রোপ্রচার করে বাচ্চা প্রসব করা হয়। এখন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দাঁড়ায়, চিকিৎসকের অদক্ষতা তথা অবহেলায় এক রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হওয়া ও চিকিৎসকের যমজ বাচ্চা শনাক্তকরণে ব্যর্থতা। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় বিপুল সাড়া পড়ে যায় এবং প্রশাসন, স্থানীয় নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধিরা এর বিচার বিভাগীয় তদন্ত তথা চিকিৎসকের বিচার দাবি করেন। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ প্রদান করে যা একটি গতানুগতিক প্রক্রিয়া। সাংবাদিকের ভাষ্য- দোষী চিকিৎসকের আর কিছু হবে না এবং এভাবেই এই দোষী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যাচ্ছে প্রশাসনের সহযোগিতায়। অথচ এই চিকিৎসকের অবহেলাজনিত কারণেই বাচ্চার মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত রোগিণী। কাজটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিধায় ফৌজদারি আইনে চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা যেত, আদালতে প্রেরণ করা যেত, জেলখানায় প্রেরণ করা যেত। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি।

এই তো গেল মফস্বলের ঘটনা। সম্প্রতি ঢাকার আজিমপুরের সরকারি মাতৃমঙ্গল কেন্দ্রে এক দরিদ্র মহিলা সন্তান প্রসবের জন্য ভর্তি হতে এলে টাকা না দেয়ার কারণে তাকে সেখানকার আয়া/সেবিকারা ঘর থেকে বের করে দেন। পরবর্তী সময় ক্লিনিকের বারান্দার রোগিণী একটি বাচ্চা প্রসব করেন এবং ক্লিনিকের সব রোগী একসঙ্গে জড় হয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানায়। বিষয়টি মিডিয়াতে আসলে তখন এই সরকারি ক্লিনিকের তত্ত্বাবধায়ককে (মহিলা চিকিৎসক) ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে এর কারণ জানতে চাইলে গতানুগতিক ধারায় একই ভাষা- দোষীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এখন প্রশ্ন হলো কেন এই চিকিৎসালয় আয়া কিংবা সেবিকানির্ভর? এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক, যার কারণে দরিদ্র রোগীরা সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো স্থান পান না।

বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা মানবিকতার ভিত্তিতে এখনো সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে ওঠেনি যা ভারতে অনেক আগেই শুরু হয়ে এবং অনেক সফলতার স্বাক্ষর বহন করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, পশ্চিম বাংলায় (যা বর্তমানে বাংলা নামে পরিচিত) সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের কোনো সুযোগ নেই এবং বেসরকারি খাতে কোনো প্রকার মেডিকেল কলেজেও নেই যা বাংলাদেশে রয়েছে যার ফলে ‘বাংলায়’ মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে যা মানবিকতা তথা নৈতিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। অপরদিকে বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা মানের মানদণ্ডের বিচারে বিদেশে স্বীকৃত নয় যা আমাদের জন্য একটি দুঃসংবাদ। তাহলে আমরা কি মানসম্মত চিকিৎসা শিক্ষা চাই কিংবা চিকিৎসা সেবা চাই? এই প্রশ্নটি নিয়ে আমাদের ভাবনার এখনই প্রকৃষ্ট সময়। কারণ দুই হাজার একুশ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এক অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণে বর্তমান সরকার রূপকল্প (ভিশন ২০২১) অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য দৈনিক ন্যূনতম ২১২২ কিলো ক্যালরির ঊর্ধ্বে খাদ্যের সংস্থান, সর্বপ্রকার ব্যাধি নির্মূলকরণ, সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, গড় আয়ু ৭০ বছরে উন্নীতকরণ, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসকরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অনেক সাফল্য রয়েছে যেমন দেশব্যাপী স্বাস্থ্য পরিচর্যা তথা অবকাঠামো নির্মাণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের হ্রাস, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার কমানো ইত্যাদি। তারপরও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা ভিন্ন। আর তা হলো এই সেবার মাধ্যমে দেশে একটি সুবিধাভোগী (opportunist) চিকিৎসক শ্রেণি তৈরি হয়েছে যাদের মূল লক্ষ্য অর্থ উপার্জন, মানবতার সেবা নয়। এর বিনিময়ে তারা ভোগ করে এক বিলাসী জীবন যা তাদের মূল পেশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অর্থের অবশ্যই প্রয়োজন আছে তবে এর শেষ কোথায় তা কি নিরূপিত হয়েছে? বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘টাকা কামানোর জন্য সন্তান প্রসবে অস্ত্রপ্রচার করে চলছে চিকিৎসকরা’ যা এই পেশায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের জন্য সম্মানজনক নয়। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় হলো-
প্রথমত, স্বাস্থ্যনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে- যা হবে মানবিক, নৈতিক, ব্যয়সাশ্রয়ী ও সমাজমুখী। যদিও কাজটি কঠিন তবুও সম্ভব। এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকারের প্রতিশ্রুত জরুরি। আশির দশকের মাঝামাঝি দেশের প্রথিতযশা চিকিৎসক, সামাজিক উদ্যোক্তা ও সংগঠক ডা. জাফর উল্লা চৌধুরী স্বাস্থ্যনীতিতে আমূল পরিবর্তনের এক উদ্যোগ নিয়েছিলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সরকারি চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করা। তখনকার জাতীয় পার্টির সরকার সমর্থন দিলেও বিএমএর আন্দোলনের মুখে তা আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকদের প্রশাসনিক কাঠামোতে অমানবিক বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িয়ে পড়ার বিষয়গুলো বন্ধ করতে হবে। যেমন চিকিৎসক-হাসপাতাল-ওষুধ কোম্পানির মধ্যে যে লম্বালম্বি স্বার্থ স্বাস্থ্য খাতে গড়ে উঠেছে, তা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো প্রশাসনিকভাবে বিষয়টিকে মোকাবেলা করা অর্থাৎ উপজেলা পর্যায়ে টিএইচএ, জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জন ও জাতীয় পর্যায়ে মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিষয়টির ব্যাপারে তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করবে এবং সরকারের ওষুধ প্রশাসন দপ্তর এ ব্যাপারে নজরদারি বাড়াবে;

তৃতীয়ত, চিকিৎসকদের নৈতিকতা বা মানবিকতা যাচাইয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ দেশে আছে বলে মনে হয় না, যা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে রয়েছে। ফলে চিকিৎসা পেশা এক অনৈতিক অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। প্রতিনিয়তই যার বলি হচ্ছে রোগীরা এবং প্রতারিত হচ্ছে গোটা সমাজ। এর একটি স্থায়ী সমাধান জরুরি। যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। প্রায়শই শোনা যায় চিকিৎসক দ্বারা রোগী লাঞ্ছিত কিংবা রোগীর লোকজন দ্বারা চিকিৎসক লাঞ্ছিত যা খুবই অনাকাক্সিক্ষত;

চতুর্থত, বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভের তথ্য মতে, বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে শতকরা ২৩ ভাগ প্রসবজনিত অপারেশন হয় এবং শতকরা ৭৭ ভাগ হয় বেসরকারি ক্লিনিকে যা টাকার অঙ্কে রোগীর ওপর এক আর্থিক চাপ অথচ এটি সম্পূর্ণ উল্টোও হতে পারত। কিন্তু তা হয়ে উঠছে না কারণ এসব বেসরকারি ক্লিনিক সরকারি চিকিৎসকের নিজের বা তার নিকটতম আত্মীয় দ্বারা পরিচালিত। এই ক্লিনিক ব্যবসা কিংবা রোগ নির্ণয় কেন্দ্র (ডায়গনোস্টিক সেন্টার) ব্যবসা এমন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে, যার মানের কথা বলাই বাহুল্য। এই ব্যবস্থার আরো একটি কুৎসিত রূপ হলো অর্থে বিনিময়ে ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রদান অথবা এক সিনিয়র চিকিৎসকের প্যাড/সিল ব্যবহার করে জুনিয়র চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দান, যা অনৈতিক। এসব অনুশীলন বন্ধের জন্য সামাজিক সচেতনতা জরুরি; ষষ্ঠত, রোগী হয়ে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে যাতে রোগে আক্রান্ত না হওয়া যায় সেটাই শ্রেয়। তার জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যরক্ষার নিয়মাবলি পালনসহ পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কার্ডিওলজিস্ট ড. দেবী শেঠী বলেছেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মনের স্বাস্থ্য সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাকে আমরা অবহেলা করছি প্রতিনিয়ত। তাই মনের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ, উৎসাহব্যঞ্জক মনোভাব (পজিটিভ এটিটিউট) পোষণ, যোগ ব্যায়াম, প্রাতঃভ্রমণ, নিরামিষ খাদ্যের প্রাধান্যতা; তৈলাক্ত খাদ্যসামগ্রী পরিহার, নৈতিকতার চর্চা, আশা ও প্রাপ্তির মধ্যে দূরত্ব কখনো বাঞ্ছনীয়। গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, মনোস্বাস্থ্যই সব সুখের মূল। কারণ যার সঙ্গে নৈতিকতা ও মানবিকতার বিষয়টি জড়িত। অপরদিকে মানসিক স্বাস্থ্যরক্ষার ক্ষেত্রে যে চিকিৎসা ব্যবস্থা খুব নাজুক অথচ এটির প্রয়োজন শারীরিক চিকিৎসা ব্যবস্থার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।

সপ্তমত, সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং তা ভোগের মধ্যে বিশাল পার্থক্য বিদ্যমান যা দেশের স্বাস্থ্য খাতে সামগ্রিক উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। অপরদিকে তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রেফারেল ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান ব্যবস্থা সেবা গ্রহীতাদের সন্তুষ্টি বিধানে ব্যর্থ হয়েছে বলে শোনা যায়, যার জন্য স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা ও মানসিকতাকে দায়ী করা হয়। এর পরিবর্তন প্রয়োজন। সর্বশেষে বলা যায় স্বাস্থ্য মানব সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ সূচক যাকে মানবিকতার আলোকে সাজাতে হবে- এই হল চিকিৎসাসেবার কাছে প্রত্যাশা।

ড. মিহির কুমার রায় : কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়