জমজম কূপ সংস্কারে উদ্যোগ সৌদি সরকারের

আগের সংবাদ

আইএস’র হুমকি : মেসির পর নেইমার–রোনালদো

পরের সংবাদ

প্রয়াণ দিবসে

শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩০, ২০১৭ , ৮:৩৫ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৩০, ২০১৭ , ৯:০৪ অপরাহ্ণ

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে, এর গৌরবের সঙ্গে ভারত ও তার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনন্য অবদান জড়িত। তার মতো মহীয়সী নারীর বিচক্ষণ পদক্ষেপ ও অবদান ব্যতীত আমরা স্বাধীনতা সহজে লাভ করতে পারতাম না

ফুটপাতে ফুলের গল্প

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর, যে দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী দুজন শিখ দেহরক্ষীর হাতে নিহত হলেন, সে দিন আমি চাঁদপুর জেলার একটি মফস্বল কলেজে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করি। এলাকাটি বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত। তাই লক্ষ করেছিলাম, বাংলাদেশের ধাত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর আকস্মিক মৃত্যুতে তাদের লোমহর্ষক উল্লাস। আরো একবার তাদের উল্লাস দেখেছিলাম, যখন সত্তরের দশকে নির্বাচনে মোরারজি দেশাইদের কাছে শ্রীমতি গান্ধী পরাজিত হয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে সৈয়দ নাজিমুদ্দীন মানিক সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘মুক্তিবাণী’ পত্রিকায় বঙ্গবিবেক আবুল ফজল লিখেছিলেন ‘শেখ মুজিব : তাঁকে যেমন দেখেছি’ নামের হৃদয়গ্রাহী ধারাবাহিক কলামটি। সেখানে আবুল ফজল ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার জন্য আমরা বাংলাদেশের বাইরের কারো কাছে যদি এককভাবে ঋণী হয়ে থাকি, তাহলে তিনি হচ্ছেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। এ দুঃসাহসী ও দূরদর্শিনী মহিলার সার্বিক সহযোগিতা ও হস্তক্ষেপ না হলে আমাদের স্বাধীনতা যে শুধু বিলম্ব হতো তা নয়, বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্গতিরও সীমা থাকত না। মাত্র ‘ন’ মাসে আমরা স্বাধীন হতে পেরেছি তার প্রধান কারণ ভারতের সহায়তা ও সশস্ত্র হস্তক্ষেপ। সে হস্তক্ষেপ মানে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। এ যুগের বিশ্ব ইতিহাসের এক অসামান্য নারী।’

এই সত্যোচ্চারণের জন্য আবুল ফজলকে গালমন্দ শুনতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘যখনই বলব তখনই শ্রীমতি গান্ধী বাংলাদেশ থেকে তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেবেন।’ এরপর ১০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক ভাষণের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে আমি চিনি। তাকে আমি জানাই আমার শ্রদ্ধা। তিনি পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর কন্যা, পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুর নাতনি। তার রক্তে মিশে রয়েছে রাজনীতি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বের সব রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আমার মুক্তির জন্য আবেদন করেছেন। আমার সঙ্গে দিল্লিতে শ্রীমতি গান্ধীর আলাপ হয়েছে। আমি যখনই বলব, ভারতীয় সেনাবাহিনী তখনই দেশে ফেরত যাবে। এখনই আস্তে আস্তে অনেককে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।’

একটি ঐতিহাসিক ঘটনা এখানে উল্লেখ করা দরকার, প্রয়াত লন্ডন প্রবাসী লেখক আবদুল মতিন তার একটি বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, বঙ্গবন্ধু ১৯৬২ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন এই পরিকল্পনা থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর কাছে অস্ত্র সহযোগিতা চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন তখনকার বাঙালি-ভারতীয় হাইকমিশনার শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জির মাধ্যমে। এর উত্তরে পণ্ডিতজি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিবিশেষের অনুরোধে এতবড় দায়িত্ব তারা গ্রহণ করতে পারে না। ভারতের সমর্থন পেতে হলে গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ সাহেবকে প্রমাণ করতে হবে, দেশের জনসাধারণ পশ্চিম পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্তি পেতে চায়, তারা স্বাধীনতা চায়।’ (বিজয় দিবসের পর বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ-পৃ. ৯০)।

বঙ্গবন্ধু সেই পথেই অগ্রসর হয়েছিলেন, প্রমাণ করেছিলেন বাঙালিরা স্বাধীনতা চায়। যে সাহায্য চেয়ে নেহেরুজির কাছ থেকে পাননি সেই সহযোগিতা পেয়েছিলেন তারই কন্যা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে। যেন ঐতিহাসিক যোগাযোগ।

বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. ওয়াজেদ তার লেখা ‘বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কিছু কথা ও বাংলাদেশ’ বইতে বর্ণনা করেছেন শ্রীমতি গান্ধী শেখ হাসিনাকে মমতাময়ী জননীর মতো সান্ত¡না দিয়েছিলেন যখন তারা সপরিবারে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘সামান্য কুশলাদি বিনিময়ের পর ইন্দিরা গান্ধী আমার কাছ থেকে জানতে চান যে, আমরা ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছি কিনা। এর জবাবে আমাদের জার্মানির বনে থাকাকালীন ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী আমাদের ‘রয়টার’ পরিবেশিত এবং ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশন কর্তৃক প্রচারিত যে দুটো ভাষ্যের কথা বলেছিলেন আমি তার পুনরুল্লেখ করি। অতঃপর ইন্দিরা গান্ধী সেখানে উপস্থিত ওই কর্মকর্তাকে ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য জানাতে বলেন। তখন ওই কর্মকর্তা দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ইন্দিরা গান্ধীকে জানান যে, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। এই সংবাদ শুনে হাসিনা কান্নায় ভেঙে পড়ে। ইন্দিরা গান্ধী তখন হাসিনাকে জড়িয়ে ধরে তাকে সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টায় বলেন, তুমি যা হারিয়েছ তা আর কোনোভাবেই পূরণ করা যাবে না। তোমার একটি শিশু ছেলে ও মেয়ে রয়েছে। এখন থেকে তোমার ছেলেকেই তোমার আব্বা এবং তোমার মেয়েকেই মা হিসেবে ভাবতে হবে। এছাড়াও তোমার ছোট বোন ও তোমার স্বামী রয়েছে তোমার সঙ্গে। এখন তোমার ছেলেমেয়ে ও বোনকে মানুষ করার ভার তোমাকেই নিতে হবে। অতএব এখন কোনো অবস্থাতেই ভেঙে পড়লে চলবে না।’

শেখ হাসিনা মনে হয় ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শটি সারা জীবনের জন্য মনে রেখেছিলেন, ‘তোমাকে ভেঙে পড়লে চলবে না।’ যেমন বঙ্গবন্ধু মনে রেখেছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর পরামর্শটি, ‘গণআন্দোলনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে বাঙালিরা স্বাধীনতা চায়।’

বাংলাদেশের সংকীর্ণ মনের অনেকেই মনে করে থাকে যে, ইন্দিরা পাকিস্তানকে দু’টুকরো করে দুর্বল করতেই আগ্রহী ছিলেন। অথচ বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তার এক লেখায় বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি গিরির আমন্ত্রণে আমার স্ত্রী ও আমি ১৯৭২ সালের শেষদিকে ভারত সফরে গিয়েছিলাম। ভারতীয় পার্লামেন্টে বক্তৃতাদানকালে আমি বলেছিলাম, আমার দৃষ্টিতে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও বড়; তিনি নেহেরুর কন্যা এবং নেহেরুর পৌত্রী। আমি বলতে চেয়েছিলাম, তিনি শুধু দুনিয়ার সবচেয়ে বৃহদাকার গণতান্ত্রিক দেশের পার্লামেন্ট পদ্ধতির সরকার প্রধান ছিলেন না, মতিলাল নেহেরু ও জওহরলাল নেহেরুর মতো মহান দুজন নেতার গুণাবলির উত্তরাধিকারিণীও ছিলেন। আমি যখন বললাম, আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখার পক্ষপাতী, তখন পার্লামেন্ট সদস্যরা হাততালি দিয়ে স্বতঃস্ফর্তভাবে আনন্দ প্রকাশ করেন। মিসেস গান্ধীও তাই করেন। এ ব্যাপারে রাজধানীতে আমি প্রকৃত উদ্দীপনা লক্ষ করেছিলাম। পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তানের ৯০ হাজার আত্মসমর্পণকারী সৈনিক ও অফিসারদের বিচার না করে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশকে উৎসাহ দেন।’ (স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ও অন্যান্য- বাংলাদেশের জন্ম ও ইন্দিরা গান্ধীর কথা-পৃ. ২১৪)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ইন্দিরা গান্ধীর ভ‚মিকাকে দেখতে হবে বিচারপতি চৌধুরীর মূল্যায়নের দর্পণে। অন্তরের অমৃত বাণী দিয়ে বিচারপতি চৌধুরী ইন্দিরাকে মূল্যায়ন করেছেন। ইন্দিরার মতো মহীয়সী নারীকে যারা অবমূল্যায়ন করতে বিচলিত হন না তারা ভাবেন না যে, মওলানা ভাসানী ও জিয়াউর রহমানও নয় মাস ভারতে খুব আরামে ছিলেন ইন্দিরার ছায়াতলে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে, এর গৌরবের সঙ্গে ভারত ও তার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনন্য অবদান জড়িত। উল্লেখ্য, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তাদানকালে ভারতের সেনাবাহিনীর ৩৬৩০ জন নিহত এবং ৯৮৫৬ জন আহত এবং ২৩০ জন নিখোঁজ হয়েছিল। এই ত্যাগ ইন্দিরা গান্ধীর। তার মতো মহীয়সী নারীর বিচক্ষণ পদক্ষেপ ও অবদান ব্যতীত আমরা স্বাধীনতা সহজে লাভ করতে পারতাম না। এ কথা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করার মানসিকতা থাকা উচিত আমাদের। তার আত্মা অমরতা লাভ করুক।

মাহমুদুল বাসার : কলাম লেখক।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়