কারিগরি শিক্ষার ওপর উন্নয়ন নির্ভর করছে : শিক্ষামন্ত্রী

আগের সংবাদ

তালাবদ্ধ বাড়িতে মিলল দম্পতির লাশ

পরের সংবাদ

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোন পথে

ডা. এস এ মালেক

বিশিষ্ট রাজনীতিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০১৭ , ৬:২০ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৬, ২০১৭ , ৭:৪২ অপরাহ্ণ
ডা. এস এ মালেক

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিণতি যে কী হবে সে ব্যাপারে আজ অনেকেই সন্দিহান। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আন্তঃরাষ্ট্রিক সংকটগুলোর সমাধান বিশ্ব সংস্থাই দিয়ে থাকে। সাধারণত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সব সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত কার্যকর করে সংকট নিরসন করতে হয়। অবশ্য নিরাপত্তা পরিষদের সব সিদ্ধান্ত যে কার্যকর করা যায়, বাস্তবতা এরূপ নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, প্যালেস্টাইন ও কাশ্মির প্রসঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত কার্যকর আজো হয়নি। বছরের পর বছর পার হলেও সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না।

বাস্তব পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায়নি। শুধু এক সম্প্রদায় হওয়ার কারণে একটা অঞ্চল স্বাধীন হবে এরূপ দাবি অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তিবাদী নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী হলেও আর্থসামাজিক কারণে বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তান হতে বের হয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। অথচ ফিলিস্তিনিরা নিজেদের মাটিতে স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে পারেনি। এখনো স্বাধী

ন রাষ্ট্রের জন্য ওই অঞ্চলে রক্ত ঝরছে এবং যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। অশান্তি বিরাজ করছে। অবশ্য বিশ্ব সংকটগুলোর সমাধানের দায়িত্ব জাতিসংঘের ওপর ন্যস্ত হলে জাতিসংঘ অনেক সময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়।

বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর ভেটো দেয়ার অধিকার অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য রাষ্ট্র (স্থায়ী ও অস্থায়ী) ভেতর ৫টি স্থায়ী রাষ্ট্র যারা ভ‚-রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেন, তারা অনেক সময় নিজেদের স্বার্থেই তা করে থাকেন। তাই ন্যায়বিচারের মানদন্ড জাতিসংঘ সঠিকভাবে সমুন্নত রাখতে পারে না। বর্তমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধান বেশ কিছুটা সুদূরপ্রসারী বলে মনে হচ্ছে। পার্শ¦বর্তী যে দুটি বৃহৎ রাষ্ট্র চীন ও ভারত তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থে এমনভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত নেন বলে মনে হচ্ছে না। সবাই আশা করেছিল, অন্তত রোহিঙ্গা প্রশ্নে নিরাপত্তা পরিষদ একটা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে। কিন্তু চীন, রাশিয়া এবং ভারতের কারণে ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। অবশ্য ওই তিনটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ না। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে তারা বাংলাদেশে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে চলেছে।

বাংলাদেশের বড় বড় প্রকল্পগুলো চীনের সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। সম্প্রতি সময়ে চীন সরকার ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প রাশিয়ার প্রযুক্তি ও অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তাই অর্থনৈতিক বিষয়গুলো যদি আন্তঃরাষ্ট্রীয় মূল কারণ হয়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে মিয়ানমারকে এককভাবে তুষ্ট করার বিশেষ কোনো সিদ্ধান্ত এই ৩টি দেশ গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না। বরং বাংলাদেশে লাখ লাখ শরণার্থীর উপস্থিতিতে তারা উদ্বিগ্ন ও ইতোমধ্যেই তারা ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে ও আরো পাঠাতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার সংকট নিরসনে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। বিদেশ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী আসছে। তবে জাতিসংঘকে এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দায়িত্ব নিতে হবে, যতদিন তারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন না করে। আর রোহিঙ্গারা যদি স্বদেশে ফিরে যায়, সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের প্রধান দায়িত্ব হবে যাতে তারা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব পায়, মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা পায় সেই উদ্যোগ কার্যকর করা।

এখন প্রয়োজন ধৈর্য ও পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির অবসান। এমন নয় যে, ৬ মাস বা ১ বছরে বিষয়টি সমাধান করা যাবে। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া খুব তাড়াতাড়ি শুরু করা দরকার। এ ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন। যে ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ মিয়ানমার সেনাবাহিনী করেছে, তা বিশ্ব বিবেককে বিস্মিত করেছে। নির্মম, নিষ্ঠুর কাহিনী এখন যেভাবে প্রচার হচ্ছে, তাতে নির্দ্বিধায় বলা যায় সম্প্রতি রাখাইনে যা ঘটেছে তা বিশ্ব মানবতার জন্য এক কলঙ্কময় অধ্যায়। এভাবে জাতিগত নিধন করে একটা জনগোষ্ঠীকে জাতিসত্তা ধ্বংস করা, নিজেদের ভিটাবাড়ি থেকে চিরদিনের জন্য তাড়িয়ে দেয়া বিশ্ব ইতিহাসের এক বর্বর অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই ঘটনার সঠিক বিচার না হলে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের জাতিগত নিধনযজ্ঞ চলতে থাকবে। শুধু একটা ধর্মের অনুসারী হওয়ায় যদি একটা জনগোষ্ঠীর দেশত্যাগ করতে হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী সংকটের সৃষ্টি হবে। জাতিসংঘের পক্ষে তা সামাল দেয়া সম্ভব নয়। এটা সহজ কথা যে একটা দেশের সৃষ্ট সংকটের কারণে আরেকটা দেশ মাসের পর মাস আর্থসামাজিক বিপর্যয়ে থাকবে। দেশের মানুষ তা মেনে নেবে কেন?

একবার ভেবে দেখুন তো, বিগত বন্যা ও ভ‚মিধসে এবং ঘূর্ণিঝড়ে যেখানে প্রায় (৭০-৮০) লাখ লোক ঘরছাড়া, প্রায় ৩০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি, পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি, তখন সেদিকে দৃষ্টিপাত কমিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে সর্বাত্মকভাবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। যাদের প্রতি দৃষ্টি দেয়া সরকারের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব তাদের ওপর যথাযথ দৃষ্টি দেয়া হচ্ছে না। আর যেহেতু দুই-চার মাসের মধ্যে সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়, সে কারণে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার সংকট নিরসনে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। বিদেশ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী আসছে। তবে জাতিসংঘকে এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দায়িত্ব নিতে হবে, যতদিন তারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন না করে। আর রোহিঙ্গারা যদি স্বদেশে ফিরে যায়, সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের প্রধান দায়িত্ব হবে যাতে তারা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব পায়, মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা পায় সেই উদ্যোগ কার্যকর করা।

স্বদেশে ভিনদেশিদের মতো অবস্থান করার অবস্থা থেকে বিরত থাকতে হবে। জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে। জাতিসংঘের মাধ্যমেই হোক বা দ্বিপাক্ষিক বা ত্রিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই হোক এ ব্যাপারে একটা সমঝোতায় আসতে হবে। বাংলাদেশের মতো একটা উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর পেছনে বছরের পর বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে অনির্দিষ্টকালের জন্য তা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। তাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার ব্যয়ভার জাতিসংঘকে বহন করতে হবে।

ডা. এস এ মালেক : বিশিষ্ট রাজনীতিক ও কলামিস্ট।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়