বরিশাল পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু ও বৃদ্ধাসহ নিহত ২

আগের সংবাদ

ছাত্র সংসদ নির্বাচনে মন্ত্রনালয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই: শিক্ষামন্ত্রী

পরের সংবাদ

নির্ভেজাল সুশাসন ছাড়া সুষ্ঠু উন্নয়ন অসম্ভব সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০১৭ , ৮:৪৪ অপরাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ৭, ২০১৭ , ৯:৩০ অপরাহ্ণ

যা বলিব সত্য বলিব

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

কয়েকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞ ব্যক্তি সংবাদ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান ইউএনবির সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রদানকালে বলেছেন যে, বাংলাদেশে কিলোমিটারপ্রতি সড়ক নির্মাণ ব্যয় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কিন্তু মান অত্যন্ত নিচু। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে শ্রমিক সস্তা। এই বিজ্ঞজনরা আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। প্রথমে তাদের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রখ্যাত নির্মাণবিদ এবং দেশখ্যাত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামসুল হক, সাবেক ইউজিসি চেয়ারম্যান এবং নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এবং বুয়েটের নগর এবং আঞ্চলিক এবং আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক সারওয়ার জাহান। এরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত খ্যাত এবং নতুন করে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন এবং জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারাও ছিলেন।

গত ২০ জুনের বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ২.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ১১.৯ মার্কিন ডলার পর্যন্ত। এই তারতম্যটা অস্বাভাবিক। এর দ্বারা এই প্রতীয়মান হয় যে, সংশ্লিষ্ট বিভাগ/দপ্তরের কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই। কোনো নির্দিষ্ট বাজেট নেই। যাত্রা শুরু করা হয়, তারপর যেখানে গিয়ে ঠেকে। এই আলোচনায় আরো যেসব বিষয় উঠে এসেছে তা হলো কাজের মনিটরিং বলে কিছু নেই। সরকারের পদস্থ ইঞ্জিনিয়াররা ঠিকমতো প্রকল্প পরিদর্শন করেন না। অথচ সরকারের কোনো বিভাগে গাড়ির অভাব নেই। প্রতিটি সরকারি দপ্তরে কত বাহারি গাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। অবশ্য তাদের গন্থব্যস্থল বিভিন্ন শপিংমল এবং শপিং প্লাজায়। অধ্যাপক শামসুল হক অত্যন্ত বলিষ্ঠ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, বেশির ভাগ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান যারা রাজনৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান তারা কদাচিৎ মানসম্মত সড়ক নির্মাণ করেন এবং তাদের কাজের মনিটরিং করা হয় না। রাজনীতিবিদদের এ ধরনের সমালোচনা করার জন্য তাকে বিচারের কাঠগড়ায় উঠতে হবে কিনা জানি না। এখন সরাসরি সুশাসনের কথায় আসি।
সুশাসন মানে তো পুলিশ র‌্যাব দিয়ে ধড়পাকড় করা নয়। প্রতিটি বিভাগ/দপ্তরে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং দুর্নীতিবাজ বা দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা এই সড়ক বিভাগের কাজ প্রসঙ্গে আসি। নির্মাণ ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ কোনো প্রকল্প যথাসময়ে তথা যুক্তিসঙ্গত বিলম্বের ভেতরেও শেষ না করতে পারা। একটি সড়ক নির্মাণ শুরু হওয়ার পর যখন শেষ হয়, তখন তার আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যায়। সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়/পরিকল্পনা কমিশনের সুশাসন থাকতে হবে।

মাঠ থেকে একটি প্রকল্প বারবার সংশোধিত হয়ে পরিকল্পনা কমিশনে এলে একবারও কার্যকরভাবে অ্যাকশন নেয়া হয় না যে, কেন বারবার বিলম্ব হচ্ছে। অবশ্য শুধু বাংলাদেশে নয়, এই উপমহাদেশের আমলারা ঢিলেমি সিনড্রমে আক্রান্ত, যার ফলে বিলম্ব এবং এর ফল কী এটাই এরা উপলব্ধি করতে পারেন না। তবে এখন সময় এসেছে কর্তৃপক্ষের সচেতন হওয়ার। পরিকল্পনা কমিশন যদি অন্তত একটি প্রকল্পে যারা বিলম্ব ঘটিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিত, তাহলে এই প্রবণতা কমে আসত। তবে ব্যবস্থা নিতে হবে উচ্চ পর্যায়ে। সড়ক বিভাগের মতো সাব অ্যাসিসটেন্ট ডেপুটি ইঞ্জিনিয়ারের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিলে চলবে না।
সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন যে, বছরে ২ হাজার কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করতে হয়। কেননা ওভার লোডেড পরিবহন চলার ফলে এই বিশাল পরিমাণ সড়ক নষ্ট হয়ে যায়। তারা আরো জানিয়েছেন তারা ২০ বছর আয়ুষ্কালের সড়ক নির্মাণ করেন এই হিসাব ধরে যে, সর্বোচ্চ ১০ টনের পরিবহন তাতে চলবে। অথচ সেখানে ৩০ টন মাল বহন করার গাড়ি চলে থাকে।

সুশাসন মানে তো পুলিশ র‌্যাব দিয়ে ধড়পাকড় করা নয়। প্রতিটি বিভাগ/দপ্তরে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং দুর্নীতিবাজ বা দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন এবং মহাসড়ক বিভাগের সচিব আক্ষেপ করে বলেছেন যে, গাড়ির মালিকদের একটু সহযোগিতা পেলে এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা যেত। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন। বাংলাদেশের যে মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বেশি অবৈধ রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়েছে সেটি হলো যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের প্রতিটি মন্ত্রিসভায় পরিবহন মালিকদের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি থেকেছেন এবং তাদের প্রভাবে বাংলাদেশ থেকে রেলপথ নিশ্চিহ্ন করার ব্যবস্থাও হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে রেলপথ রক্ষা পেয়েছে এবং উত্তরোত্তর উন্নতি করে চলেছেন। তাই সচিব এই বাংলাদেশে বাস করে কীভাবে প্রত্যাশা করেন যে, পরিবহন মালিকরা সহযোগিতা করবেন। এ ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশে অত সহজে কেউ সুবোধ বালকের মতো আইনকানুন মানতে চায় না।

কথায় কথায় আমরা পাশ্চাত্যের কথা বলি। কিন্তু সেখানে আইনের কঠোর প্রয়োগ রয়েছে। আমার বন্ধু কুটনীতিক মহিউদ্দিন লন্ডনে থাকাকালীন একাধিকবার পরীক্ষা দিয়ে তারপর ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে। আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা বলিÑ লন্ডন শহরের বাইরে থেকে আমার এক আত্মীয় এবং আমি লন্ডনে আসি। হাইড পার্কের একটা নির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্ক করা হয়। আমরা খেয়াল করিনি সময় শেষ হয়েছে। আমরা দৌড়ে এসে গাড়ি স্টার্ট দিলাম। আমার আত্মীয়টি ভয়ে কাঁপছিল এবং আমাকে বারবার বলছিল যে, পুলিশের গাড়ি তাড়া করছে কিনা। যুক্তরাজ্যে যারা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। সচিব সাহেবের দায়িত্ব হবে যে, ওভার লোডেড গাড়ির গতিরোধ করে মামলা দায়ের করা। এবার ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশ উল্টো পথে গাড়ি চলা বন্ধ করার জন্য যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা একদিকে যেমন প্রশংসার, তেমনি এই আশা সঞ্চার করেছে যে, আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তবে সেই সঙ্গে এই চিত্র ভেসে উঠেছে যে, যারা আইন তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠার কর্ণধার, তারাই আইন ভঙ্গকারী।

এই অভিযানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খবর ছিল যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা প্রদানের সচিব পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছেন। তিনি এই পদের জন্য উপযুক্ত বটে! যা হোক সড়ক বিভাগের সচিবকে বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই যে, কোনো সাহায্য- সহযোগিতার অপেক্ষা না করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য রণক্ষেত্রে নামা প্রয়োজন। যারা সড়কের ক্ষতিসাধন করছে তারা অপরাধী। অপরাধীর সহযোগিতা চাওয়াটা হাস্যকর। বরঞ্চ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম একটি প্রস্তাব রেখেছেন যেটি গুরুত্ব সহকারে নেয়া যেতে পারে। তিনি প্রস্তাব করেছেন যে, বিভিন্ন এক্সপার্ট, দুনীতি দমন কমিশনের প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করার। আমার মনে হয়, পুলিশ এবং র‌্যাবের প্রতিনিধি এই কমিটিতে রাখা প্রয়োজন। এই কমিটির প্রধান হবেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীদের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের কেউ। এই কমিটি সব ধরনের কাজ মনিটর করবে এবং মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে বিভিন্ন সুপারিশ এবং প্রস্তাব দেবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যত শক্ত প্রস্তাব দেয়া হোক না তা কার্যকর করা কঠিন হবে না। কেননা এটি কোনো একক ব্যক্তির প্রস্তাব নয়।

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ : সাবেক ইপিসিএস, কলামিস্ট।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়