অর্থনীতির চাপে শিথিল লকডাউন

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০

আতিকুর রহমান : করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে স্থবির অর্থনীতির চাকা সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে কিছু শিল্প কারখানা চালু হয়েছে। গত রবিবার থেকে সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ও খুলে দেয়া হয়েছে। এছাড়া গতকাল সোমবার থেকে রাজধানীর পাড়া-মহল্লার নিত্যপণ্যের দোকান খোলা রাখার সময়সীমা দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের পর গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে অঘোষিত লকডাউন চলছে। আগামী ৫ মে এ লকডাউন শেষ হওয়ার কথা। আকাশ, নৌ, সড়ক ও রেলসহ সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। জরুরি জিনিসপত্রের প্রতিষ্ঠান ব্যতীত সব ধরনের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, কলকারখানাও বন্ধ রয়েছে।

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির আড়ালে অঘোষিত লকডাউনে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা থেমে গেছে। হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৩ কোটি দিনমজুরের আয়ের পথ। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় এ খাতের ৩০ লাখ শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছে। এই প্রেক্ষাপটে ৪৫ লাখ পোশাক শ্রমিক এবং মালিকের স্বার্থে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে গত রবিবার থেকে দেশের কিছু কিছু পোশাক কারখানা খুলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ২০৮টি দেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তার মধ্যে ৮২টি দেশ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে লকডাউন প্রয়োগ করেছে। লকডাউনে অনেক দেশ করোনার বিপর্যয়ের পর দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হবে। বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ রুখতে সরকারকে সর্বাত্মক প্রস্তুতির সঙ্গে মানুষকেও কৃচ্ছ্রতাসাধন ও সামর্থ্যবানদের মানুষের পাশে মানবিক কারণে সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখতে হবে। করোনা নিয়ন্ত্রণ করেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দুয়ার খুলতে হবে, নইলে বিপর্যয়ে চেহারা ভয়াবহ রূপ নেবে।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থা সতর্কবাণী দিয়েছে, অর্থনীতি এভাবে চলতে থাকলে বিশ্বের অন্তত তিন কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পূর্বাভাস দিয়েছে যে, করোনা ভাইরাসের কারণে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্বের প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশ হারিয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের অনেক দেশই লকডাউন তুলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্থনীতির চাকা সচল করার চিন্তা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লকডাউন তুলে নিতে চাইছেন। স্পেন, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কিছু দেশ বেশ কিছু কড়াকড়ি এর মধ্যেই শিথিল করেছে। ভারতেও লকডাউনের মধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ছাড়ের ঘোষণা করা হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায়, ছোট বাজার ও লোকালয়ে এখন থেকে অনাবশ্যকীয় নির্দিষ্ট পণ্যের কিছু দোকান খোলা থাকবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, লকডাউন অর্থনীতি ও মানুষের কাজের বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ। অন্যদিকে করোনার সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব ও সঙ্গরোধ বা কোয়ারেন্টাইনের বিকল্প নেই। কিন্তু যেখানে ধনাঢ্য দেশগুলোরও দীর্ঘসময় বসিয়ে খাবার দেয়া সম্ভব নয় সেখানে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য তা খুবই কঠিন।

তারা আরো বলছেন, এ বিপর্যয়ে আমদানিনির্ভর দেশের অবস্থা বেশি খারাপ হবে। তবে আমাদের ইতিবাচক দিক হচ্ছে খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এটা সচল রাখার সঙ্গে আমাদের স্থানীয় চাহিদা বাড়াতে হবে। মানুষকে কাজ দিতে হবে। তাহলে মোটা দাগের ক্ষতি হবে না। যেমন ২০০৯ এ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল ইউরোপ। আর এবার আমেরিকার। সেবারও আমরা অর্থনীতিকে নিরাপদ রাখতে পেরেছিলাম অভ্যন্তরীণ উৎপাদন আর চাহিদা সচল রেখে। চ্যালেঞ্জর এ যুদ্ধে জয়ী হলে এবারো রাখা সম্ভব।

করোনার সংক্রমণ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছেন। দেশে ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী থেকে কৃষি খাতও এ ভর্তুকির আওতায়। স্বল্পসুদে এ ঋণদান হলেও অনেকে বলছেন ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক সুদ মওকুফ করতে। প্রণোদনার এ অর্থ যথাযথ ব্যবহারের জন্যও শিল্প কারখানা চালু এবং জনজীবন সচল করা দরকার।

অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, লকডাউন অব্যাহত থাকলে অর্থনীতি নিস্পেষিত হবে এবং সরকারের গোডাউনও খালি হবে। অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি উৎপাদন ও ভোগকে যদি লকডাউনের মধ্যে দমিয়ে রাখা হলে জাতীয় অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হবে। আমি অর্থনীতি খুলে দেয়ার পক্ষের লোক। সাধারণ মানুষ যাতে কাজ করে খেতে পারে এ জন্য লকডাউন শিথিল করতে হবে। এতে অর্থনীতি উপকৃত হবে।

আস্তে আস্তে বিধিনিষেধ শিথিলের আভাস দিয়ে গতকাল এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জীবনযাপনের কিছু কিছু ক্ষেত্র ধীরে ধীরে উন্মুক্ত করতে হবে। এখন কিছু কিছু ফসল উঠছে। এরপর ফসল লাগাতে হবে। সেখানেও সবাই নিজেদের সুরক্ষিত রেখেই কাজ করবেন। সারাবিশে^ যে অর্থনৈতিক মন্দা আসবে। তার ধাক্কা আমাদের দেশেও লাগবে। কাজেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যায়ক্রমে সব প্রতিষ্ঠানেই চালু করা হবে। আমাদের সব থেকে বড় কথা, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা আর আমাদের জীবন জীবিকার পথটা উন্মুক্ত রাখা।

এ পরিস্থিতিতে করোনার সংক্রমণ মোকাবিলা করেই ধীরে ধীরে অর্থনীতির চাকা সচল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত রবিবার থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ ১৮ মন্ত্রণালয় খুলেছে। গার্মেন্ট খুলেছে স্বল্প পরিসরে। লকডাউন শিথিলে ধীরে ধীরে অন্যান্য শিল্প-কারখানাও খুলবে। গতকাল থেকে ঢাকা মহানগরীতে দোকান খোলা রাখার সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে, সেই সঙ্গে হোটেল-রেস্তোরাঁয় ইফতারসামগ্রী বিক্রিরও অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সুপার মার্কেটগুলোও সীমিত পরিসরে খুলে দেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।

গতকাল সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার নিত্যপণ্যের দোকানগুলো সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ দেয়া হচ্ছিল এতদিন। এখন বিকাল ৪টা পর্যন্ত সেসব দোকান খোলা রাখা যাবে। নগরবাসীকে এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে নিতে হবে। তবে কাঁচা বাজার ও সুপারশপগুলো আগের মতোই সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj