সীমাবদ্ধতা ও বৈষম্যের মধ্যে পড়াশোনায় অনলাইনই ভরসা

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য : করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। ধাপে ধাপে বন্ধের দিন আরো বাড়ছে। পরিস্থিতির জেরে বহু স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে অনলাইন ক্লাস। টেলিভিশনেও ক্লাস সম্প্রচার হচ্ছে। বাড়ি থেকে ক্লাসে অংশ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরাও বাড়িতে বসেই পড়াচ্ছেন। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল এক ভিডিও কনফারেন্সে বলেছেন, পরিস্থিতি যদি উন্নতি না ঘটে তাহলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।

মূলত প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য আসার পরই শিক্ষা প্রশাসন, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। অনেকেরই ভাবনা ছিল, ঈদের ছুটির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া হবে। দীর্ঘ ছুটির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হলে কিভাবে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া হবে তারও একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে রেখেছিল শিক্ষা প্রশাসন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কথার পর নতুন করে ভাবনা শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, এ ক্ষেত্রে শিক্ষায় অনলাইনই এখন একমাত্র ভরসা। এতে হয়তো পরীক্ষা নেয়া যাবে না। কিন্তু পাঠদান এগিয়ে রাখা যাবে।

করোনায় পাল্টে যাওয়া এই সময়ে সব সেক্টরেই চলছে স্থবিরতা। পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকলে এই দীর্ঘ সময়ে কী করবেন শিক্ষার্থীরা? শিক্ষাবিদরা বলছেন, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে চলতে পারে পাঠ কার্যক্রম।

তবে অনলাইনে পাঠদানের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হয় বলে মন্তব্য করেছেন জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। গতকাল তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, পড়াশুনার চেয়ে জীবন বড়। ভ্যাকসিন বের হওয়ার আগ পর্যন্ত এই অবস্থা চলবে। সবাই একটা দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে অনলাইনে লেখাপড়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সবাই কি অনলাইনে পাঠদান নিতে পারছে। সবার কাছে তো ইন্টারনেট সুবিধা নেই। এতে নতুন করে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। যাই করা হোক, ক্লাসরুমের কোনো বিকল্প নেই।

অভিভাবকরা প্রশ্ন তুলে বলেছেন, চলতি বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ কবে হবে? এ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করতে না পারলে একাদশ শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হবে না। আর ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ না হলে পয়লা জুলাই থেকে একাদশ শ্রেণির ক্লাসও শুরু হবে না। একইসঙ্গে চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার কি হবে? পরীক্ষাটি গত পয়লা এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন কি পরীক্ষাটি সেপ্টেম্বরে চলে যাবে? উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা যদি সেপ্টেম্বরেই হয় তাহলে বিশ^বিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা কি ডিসেম্বরে চলে যাবে? সবমিলিয়ে চলতি বছরের শিক্ষাপঞ্জি বাস্তবায়ন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, নি¤œ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগামী জুন মাসে অনুষ্ঠেয় অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। আর দীর্ঘসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনলাইন কিংবা টেলিভিশনেই ক্লাস এখন শিক্ষায় চলার পথের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেখানেও বাধা রয়েছে। বহু শিক্ষার্থীর সঙ্গে ইন্টারনেটের সংযোগ নেই। একইসঙ্গে তাদের কাছে একটি ল্যাপটপ, ডেস্কটপ বা স্মার্টফোন নেই। ফলে চাইলেই অনলাইন শিক্ষা সর্বজনীন করা যাচ্ছে না। এছাড়াও সংশ্লিষ্টরা আরো কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো- প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুবিধার অভাব, শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টারনেট কিনতে টাকার অভাব এবং বেশিরভাগ শিক্ষার্থী গ্রামে থাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারও অপ্রতুলতা। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসার পরে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাতে তারা অতিরিক্ত ক্লাস নেবে এবং বিভিন্ন ছুটি কমিয়ে দেবে।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন গতকাল ভোরের কাগজকে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষায় জুন পর্যন্ত কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার একটি হিসাব আমরা করে রেখেছি। কিন্তু যদি সত্যি সত্যি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয় তাহলে আমাদের শিক্ষা কি পরিমাণ ক্ষতি হবে তার হিসাব করা হয়নি। তবু আমরা কিছু পরিকল্পনা প্রণয়ন করার জন্য বলেছি। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুনে স্কুলগুলোর অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও যদি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা হয় সে ক্ষেত্রে ৬০ দিনের পরিবর্তে আমরা ৪৫ দিনে ফলাফল দেয়ার চেষ্টা করব। সেই হিসেবে নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শেষ করার হিসাব করা হচ্ছে। অন্যদিকে বছরের শেষে জেএসসি পরীক্ষা কিভাবে হবে সে বিষয়েও কাজ শুরু হয়েছে। তবে ক্ষতি পোষাতে আমরা যে পরিসংখ্যানই করি না কেন, আপাতত আমাদের সামনে অনলাইন ও টেলিভিশনে পাঠদান ছাড়া বিকল্প কিছু নেই এবং এটিই চালিয়ে যেতে হবে। বাকি ভবিষ্যৎ বলবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহ ভোরের কাগজকে বলেছেন, বসে থাকলে হবে না। কিছু একটা পথ বের করতে হবে। সেই পথটি কি- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনতো টেলিভিশনে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঠদান চলছে। কিন্তু টেলিভিশনের মাধ্যমে সবার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। সবার কাছে কিভাবে পৌঁছানো যায় বিকল্প চিন্তা শুরু হয়েছে।

নি¤œ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা টেলিভিশন, অনলাইনে পাঠদান করার মধ্য দিয়ে কিছুটা সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও উচ্চ শিক্ষা একেবারেই নীরব নিথর হয়ে আছে। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় শুরুতে অনলাইনে ক্লাস চালু করলেও ইউজিসির একটি নির্দেশনার কারণে তা ঢিমেতালে চলছে। আর সরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে।

এক সময় জনপ্রিয় ছিল বিটিভির নানা শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান। বিদ্যালয়ে শিক্ষকের শিক্ষাগ্রহণের পাশাপাশি এই অনুষ্ঠানগুলো বাড়তি রসদ জোগাতো শিক্ষার্থীদের। কালের বিবর্তনে বিটিভির এসব অনুষ্ঠানের চাহিদা এখন তলানিতে। শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, টিভির মাধ্যমে সারাদেশে স্কুল-কলেজের পাঠ সময়সূচি করে দেয়া উচিত। যেখানে আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা জানবে কখন কোনো বিষয়ে পাঠদান করা হয়েছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj