লকডাউন

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০

মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

কাজেম কাকা ঢাকা ছেড়ে আসলেন। বায়িং হাউসে ব্যবসা ছিল রমরমা। ঢাকার লকডাউনের আগাম খবরে ভীষণ একটা চাপ মাথায় নিয়েই নিজ গ্রামে ঢুকলেন।

আহ্ কী শান্তি! অজ¯্র সবুজ গাছপালা, ক্ষেতের আইলে ছাগল ছানার এক্রোবেটিং, লাউ ঝিঙার মাচায় প্রজাপতি, ফিশারির পুকুরে চিরল চিরল ঢেউয়ের আড়ালে শিং মাছের মলৈ খেলা, কবুতরের খোঁপে লালচে বড় মাংসপিণ্ডের মতো দুটো বাচ্চার সংসার পাহারায় পায়রা দম্পতি। এসব দেখে তার মন ভরে, চোখ জুড়ায়।

কাজেম কাকার সঙ্গে এসেছেন কাকি আর তাদের সুঠামদেহী দুই ছেলে। এছাড়া পাঁচ গৃহকর্মী লায়লা, শিফা, ময়না, লাবলু আর মাতাবকেও নিয়ে এসেছেন।

ওরা বাড়ি যায়নি। যেতে দেয়া হয়নি। ওদের ছাড়া চলে কী করে! বাড়ির জন্য কান্নাকাটি করেও কাকির জ্বলজ্বল চোখের সামনে সবাই গুটিয়ে যায়।

গ্রামে এসে বাবার গুদাম খালি করতে মাত্র এগারো দিন লাগলো। হাঁসের খোঁয়াড়, মুরগি, কবুতর, পুকুর সবই সাবাড়। টুকটাক সবজিও। এত খেয়ে যাদের অভ্যেস, তাদের কি আর অল্পতে চলে? ওজন কমানোর ডাক্তারি উপদেশ এখন শিকেয় ঝুলিয়েছেন কাকা। ভার্গন, নরডিস্ক, ওমেপের ওপরই টিকে আছেন তিনি।

সকালে ময়না আভাস দিলো, মামা বাজার লাগব। বাড়ির ঘাস-পাতা, আকশা-পাকশা সব শ্যাষ।

গুঞ্জরালীর মা যোগ করে, বইয়া খাইলে রাজার ভাণ্ডারও ফুরায়।

ঢাকাতে বইসা বইসা পেলান করো আর খাও। গেরামের মাইনষে ক্যামনে মাডির বুক চিইরা ফসল ফলায় টের পাও নাই- হাতেম চাচার অনুযোগ।

বিকেলেই লাবলু আর মাতাবকে সঙ্গে নিয়ে বের হয় কাজেম কাকা। গঞ্জের বাজারই ভরসা।

চালের পট্টি, ডালের গুদাম, মুরগির পাইকার, সবজির মোকাম, মুদির ভাণ্ডার তছনছ করে একটা পিকআপ ভরে। আর তারই আঁচ পেয়ে বিকালের রংটা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বাজার গরম হয়ে পড়ে। রাতের মধ্যে একটা বিহিত না করতেই পরদিন উপজেলার ব্যক্তিরা এলেন। বাজার টহল দিলেন।

বিক্রেতারা দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে কোথায় যেন লুকালো। সাধারণের জিহ্বার ডগায় গালি আর গালি- হারামজাদারা, সারা বচ্ছর ব্যবসা করছস এহনো তগোর করোনা অয়না ক্যা।

কাজেম কাকার বৈঠকখানায় লোকজনের ভিড়। চাকরি-টাকরি, বিয়া-শাদি, জমি বেচাকেনা, পুলাপানের মারামারি ইত্যাদি বিষয়াদি। সেইসঙ্গে আলোচনায় থাকে করোনা, লকডাউন, দেশ-বিদেশ।

এদিকে এলইডি টিভির সামনে কাকি মজে থাকেন স্টার জলসা আর জি বাংলায়।

মাতাবের বাড়ি থেকে ফোন। মায়ের যাওইয়া অবস্থা। হাসপাতালে ভর্তি করতে গিয়া ফিরা আইছে। পেরাইভেটের চেম্বারের সব পলাইছে। গার্মেন্টসের ছালেহা খালার বাড়ি লকডাউন। ম্যাসাকার অবস্থা। লোকজন গরুর টেরাকে হুইত্যা বইয়া আসতাছে। ফটিক চেরম্যান চাইলের বস্তাসহ ধরা খাইছে।

কাজেম কাকার মাথা নষ্ট। মাতাব ছাড়া একপাও তার চলে না।

নিজেকে বুঝিয়ে সুজিয়ে টাকা-টুকা দিয়ে ছেড়ে দিলেন।

এবার ময়না, শিফা- ওরাও সামনে দাঁড়ানো।

পুলাডারে মাদ্রাসায় দিছিলাম। ওইখানে থাকতে ঝামেলা ছিল না। বন্ধ দেইখখা বাড়িতে খালি ভাদাইম্যার মতো ঘুরে। ইতালি থাইককা কেডা জানি আইছে এহন হারা গেরাম লকডাউন। আমার লাইগগা চিনতা নাই। ছেলেটা হারা গেরাম ঘুইরা বেড়ায়। কফালে যে কী আছে…!

ময়না, শিফা, লাবলু, লায়লা সবাইকে ছেড়ে দিতে হলো। বাড়িতে সকালে বকুলের নানিদের বহর, বিকালে শহরালীরা। একটাই বয়ান- গেরামে ভাইরাস ডুইক্কা পড়লে আমরার বাচন ক্যামনে। এইডার ত ওষুধ নাই।

বাজারের লোকজন বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কথার তুবড়ি ছোটায়- ওই হালা ইতালির লোকগুলা আইসা সব্বনাশটা করছে, চীন অইছে আসল বদমাইশ। ট্রেরাম্পের খবর আছে… চিন্তা করচাইন এই গেড়াকলের মইদ্যে চুরেরা কিন্তু মাতা ঠাণ্ডা কইরা কাম করতাছে… আল্লা কিন্তু কেউরে ছাড়তো না…

আমাগো কাজেম কাকার অবস্থা কিন্তু বারডা বাজছে। ঢাহা যাইতো পারতাছে না। বাড়ির পুঞ্জি পাট্টা শ্যাষ।

আমরা ত কচুর মুতা খায়া দিন পার করবাম।

গ্রামের ধানগুলো নুয়ে পড়া শুরু করেছে। কঁচি নালিতার শাক তুলছে গ্রামের মানুষ। শসা ক্ষেতের ওপর-নিচ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে আলিমুদ্দিন। পোস্টাপিস কবে খুলবে কে জানে? কয়ডা টেহা জমা আছিলো।

কমলাটে রঙের পোকাটা মারে কাঠি দিয়ে। ভালো ফলনের জন্য এই পোকাগুলো মারা দরকার।

কাজেম কাকার ডাক শুনে পেছন ফিরলো। হাতে দুইজোড়া গøাভস। কিছু সাবান, স্যানিটাইজার, মাস্ক।

-এইগুলা দিয়া কী অইব? গেরামে ত হাজার হাজার মানুষ। যেই ঘরে ছিলো ছয়জন হেই ঘরে ছাব্বিশ জন।

-অন্তত তোমার শসার ক্ষেত বাঁচনের আগে তোমাকে তো নিরাপদে থাকতে হবে। কামলা লাগলে বলবা। আমি হেল্প করব। ভাবছি সিটিতে আর যাবো না। আসো আগে পোকাগুলা মারন দরকার।

:: পাফোস নং ১২৩৩১,

শ্যামগঞ্জ, ময়মনসিংহ

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj